বাংলাদেশের নগর সভ্যতার বিকাশে অটোরিকশা একদিকে যেমন কর্মসংস্থানের বড় উৎস, অন্যদিকে তেমনি নগরজীবনের অন্যতম দুর্ভোগের নাম। বিশেষত ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার দ্রুত বিস্তার দেশের প্রায় সব শহরে পরিবহন ব্যবস্থার চরিত্র পাল্টে দিয়েছে। ঢাকার বাইরে বিভাগীয় শহর, জেলা শহর এমনকি উপজেলা সদরেও আজ অটোরিকশা প্রধান স্বল্পদূরত্বের বাহন। কিন্তু নিয়ন্ত্রণহীন সম্প্রসারণ, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং পরিকল্পনাহীন নগরায়ণের ফলে এই বাহন বহু ক্ষেত্রে জনজীবনের স্বস্তি কেড়ে নিয়েছে। অটোরিকশার দৌরাত্ম্য কেবল যানজটের সমস্যা নয়; এটি নগর শাসন, পরিবহন নীতি, কর্মসংস্থান, জ্বালানি ব্যবহার, শব্দদূষণ এবং নাগরিক অধিকারের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত একটি সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রশ্ন।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশে নগর জনসংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। ২০২২ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩৯ শতাংশ শহরাঞ্চলে বাস করে এবং ঢাকা মহানগরী একাই প্রায় আড়াই কোটির কাছাকাছি মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র। নগর জনসংখ্যা বাড়লেও সেই অনুপাতে গণপরিবহন বাড়েনি। এই শূন্যস্থান পূরণ করেছে রিকশা ও অটোরিকশা। বিভিন্ন গবেষণা ও নগর পরিবহন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ঢাকায় প্রতিদিন কয়েক কোটি স্বল্পদূরত্বের যাতায়াতের বড় অংশ অপ্রাতিষ্ঠানিক পরিবহন দ্বারা সম্পন্ন হয়। ঢাকার বাইরে খুলনা, রাজশাহী, বরিশাল, রংপুর ও ময়মনসিংহে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সংখ্যা গত এক দশকে কয়েক গুণ বেড়েছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন সিটি করপোরেশনের অনুমান অনুযায়ী অনেক শহরে নিবন্ধিত সংখ্যার চেয়ে বাস্তবে চলাচলকারী অটোরিকশা অনেক বেশি।
এই বাহনের দ্রুত বিস্তারের পেছনে অর্থনৈতিক যুক্তি রয়েছে। একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালিয়ে একজন চালক দৈনিক কয়েকশ থেকে এক হাজার টাকার বেশি আয় করতে পারেন, যা স্বল্পশিক্ষিত মানুষের জন্য তুলনামূলক আকর্ষণীয়। আবার যাত্রীর জন্যও এটি দরজায়-দরজায় সেবা দেয়। কিন্তু সুবিধার এই চিত্র দ্রুতই বিশৃঙ্খলায় রূপ নেয় যখন একই সড়কে পরিকল্পনা ছাড়া হাজার হাজার অটোরিকশা নেমে পড়ে।
নগরবাসীর সবচেয়ে বড় অভিযোগ যানজট। অটোরিকশা চালকদের একটি অংশ যাত্রী পাওয়ার আশায় রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে পড়ে, হঠাৎ ঘুরে যায়, উল্টো পথে চলে কিংবা মোড়ে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করে। ফলে সড়কের কার্যকর প্রস্থ কমে যায়। ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, প্রধান সড়কে অনিয়ন্ত্রিত থামা-চলার কারণে যানবাহনের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। বিশ্বব্যাংকের একাধিক নগর পরিবহন বিশ্লেষণে ঢাকাকে বিশ্বের ধীরগতির শহরগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে; কর্মদিবসে গড় গতি অনেক ক্ষেত্রে ঘণ্টায় ৭–১০ কিলোমিটারের মধ্যে নেমে আসে। এই ধীরগতির পেছনে বহুমাত্রিক কারণ থাকলেও অপ্রাতিষ্ঠানিক ক্ষুদ্র যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত উপস্থিতি একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
শুধু যানজট নয়, সড়ক নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও অটোরিকশা বড় উদ্বেগ। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি ও সড়ক নিরাপত্তা পর্যবেক্ষকদের প্রতিবেদনে নিয়মিত দেখা যায়, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা দুর্ঘটনায় আহত ও নিহতের সংখ্যা উদ্বেগজনক। অধিকাংশ চালকের আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ নেই; অনেকের বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্সও থাকে না। সিগন্যাল অমান্য, অতিরিক্ত যাত্রী বহন, অপ্রাপ্তবয়স্ক চালক, রাতের বেলায় অপর্যাপ্ত আলো ব্যবহার—এসব অনিয়ম দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। পথচারী, স্কুলগামী শিশু ও বয়স্ক মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন।
অর্থনৈতিক ভোগান্তিও কম নয়। ভাড়া নির্ধারণে স্বচ্ছতা না থাকায় একই দূরত্বে ভিন্ন ভিন্ন ভাড়া নেওয়া হয়। বৃষ্টি, যানজট বা রাতের সময় ভাড়া কয়েক গুণ বেড়ে যায়। যাত্রীদের সঙ্গে চালকদের তর্ক-বিতর্ক এখন শহুরে জীবনের পরিচিত দৃশ্য। পরিবহন অর্থনীতিবিদদের মতে, নগর পরিবহনে অনানুষ্ঠানিক দরকষাকষি পদ্ধতি যাত্রীর সময় ও মানসিক শক্তির অপচয় ঘটায়, যার আর্থিক মূল্যও কম নয়।
শব্দদূষণ এবং ফুটপাত দখল সমস্যাকে আরও তীব্র করেছে। বাজার, হাসপাতাল, স্কুল ও বাসস্ট্যান্ডের সামনে অস্থায়ী অটোরিকশা স্ট্যান্ড গড়ে ওঠে। ফলে পথচারীরা ফুটপাত ছেড়ে সড়কে হাঁটতে বাধ্য হন। নগর পরিকল্পনাবিদরা বহুদিন ধরে বলে আসছেন যে, ফুটপাত হারানো মানে নগরের মানবিক চরিত্র হারানো।
বাংলাদেশে অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণের ইতিহাস বেশ পুরোনো। ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে পেট্রোলচালিত থ্রি-হুইলার বা সিএনজি অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণের জন্য বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। ২০০২ সালে ঢাকায় দুই-স্ট্রোক ইঞ্জিনচালিত অটোরিকশা নিষিদ্ধ করা হয় বায়ুদূষণ কমানোর লক্ষ্যে। এই সিদ্ধান্তকে পরিবেশ নীতির বড় সফলতা হিসেবে ধরা হয়। নিষেধাজ্ঞার পর বায়ুর সিসা ও ধোঁয়ার মাত্রা কমতে শুরু করে এবং সিএনজি চালিত চার-স্ট্রোক অটোরিকশা চালু হয়। এটি ছিল সরকারের অন্যতম সফল হস্তক্ষেপ, কারণ পরিবেশগত সুফল দ্রুত দৃশ্যমান হয়েছিল।
কিন্তু সেই সফলতার পর নতুন সমস্যা দেখা দেয়। ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ২০১০-এর পর থেকে প্রায় সব জেলা শহরে এদের সংখ্যা বিস্ফোরণমূলকভাবে বাড়ে। সরকার বিভিন্ন সময়ে মহাসড়কে চলাচল নিষিদ্ধ করেছে, জেলা প্রশাসন অভিযান চালিয়েছে, সিটি করপোরেশন নির্দিষ্ট রুট নির্ধারণ করেছে। ঢাকার বাইরে খুলনা, রাজশাহী ও বরিশালে একাধিকবার ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে অভিযান পরিচালিত হয়েছে। কিছু শহরে নির্দিষ্ট রঙের নম্বরপ্লেট, লাইসেন্স ও স্ট্যান্ড ব্যবস্থা চালুর চেষ্টা করা হয়।
এই ব্যবস্থাগুলোর আংশিক সফলতা ছিল। অনেক শহরে প্রধান সড়ক থেকে অটোরিকশা সাময়িকভাবে সরানো গেলে যানজট কমেছে, দুর্ঘটনাও কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। রাজশাহীতে নির্দিষ্ট রুটভিত্তিক চলাচল চালুর পর কিছু এলাকায় ট্রাফিক শৃঙ্খলা উন্নত হয়েছিল বলে স্থানীয় প্রশাসন দাবি করেছিল। খুলনায় নিবন্ধন কার্যক্রমের মাধ্যমে রাজস্ব আদায়ও বেড়েছিল।
তবে সামগ্রিকভাবে নিয়ন্ত্রণ নীতি দীর্ঘমেয়াদে সফল হয়নি। কারণ সমস্যার মূল উৎস—বিকল্প গণপরিবহনের অভাব—অপরিবর্তিত রয়ে গেছে। যখনই অভিযান চালিয়ে অটোরিকশা সরানো হয়েছে, যাত্রীরা দ্রুত পরিবহন সংকটে পড়েছেন। চালকদের জীবিকা হুমকির মুখে পড়েছে, ফলে সামাজিক ও রাজনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে অভিযান কয়েক সপ্তাহ পর শিথিল হয়ে গেছে এবং আগের অবস্থাই ফিরে এসেছে। প্রশাসনিক দুর্বলতা, দুর্নীতি, রাজনৈতিক প্রভাব এবং সমন্বয়হীনতার কারণে নিবন্ধন ব্যবস্থা কার্যকর হয়নি। অনেক শহরে লাইসেন্সধারী যানবাহনের তুলনায় অনিবন্ধিত যানবাহন বেশি চলাচল করে।
বিদ্যুৎ ব্যবহার নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চার্জ করতে বিপুল বিদ্যুৎ লাগে। বিদ্যুৎ বিভাগ একাধিকবার উদ্বেগ জানিয়েছে যে অনিয়ন্ত্রিত চার্জিং গ্রিডের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে, বিশেষ করে সন্ধ্যাকালে। তবে গবেষকেরা দেখিয়েছেন, সঠিক চার্জিং অবকাঠামো ও দক্ষ ব্যাটারি ব্যবস্থাপনা থাকলে এই চাপ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বাংলাদেশকে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। ভারতের দিল্লি ও কলকাতায় ই-রিকশা নিবন্ধন, চালক প্রশিক্ষণ, নির্দিষ্ট রুট এবং ডিজিটাল পরিচিতি ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। প্রথমদিকে বিশৃঙ্খলা থাকলেও ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রিত কাঠামো গড়ে উঠেছে। নেপালের কাঠমান্ডুতেও বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলারকে পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থার অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এসব উদাহরণ দেখায়, সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা নয়; বরং নিয়ন্ত্রিত একীভূতকরণ অধিক কার্যকর হতে পারে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সমস্যার সমাধান কেবল আইন প্রয়োগে সীমাবদ্ধ নয়। নগর পরিবহনকে সমন্বিতভাবে ভাবতে হবে। গণপরিবহন উন্নয়ন, ফিডার সার্ভিস হিসেবে অটোরিকশাকে অন্তর্ভুক্ত করা, ডিজিটাল ভাড়া ব্যবস্থা, বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ, জিপিএসভিত্তিক নিবন্ধন, নির্দিষ্ট স্ট্যান্ড এবং ফুটপাত পুনরুদ্ধার—এসব পদক্ষেপ একসঙ্গে নিতে হবে। একই সঙ্গে চালকদের সামাজিক নিরাপত্তা ও বিকল্প কর্মসংস্থানের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে।
নগর শহরে অটোরিকশার দৌরাত্ম্য আসলে বৃহত্তর নগর ব্যবস্থাপনার সংকটের প্রতিচ্ছবি। যে শহরে পর্যাপ্ত বাস নেই, নিরাপদ ফুটপাত নেই, কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নেই, সেখানে অটোরিকশাকে এককভাবে দায়ী করা সহজ হলেও সমাধান আসে না। দুই-স্ট্রোক অটোরিকশা নিষিদ্ধ করে বাংলাদেশ একসময় পরিবেশগত সফলতার নজির স্থাপন করেছিল; কিন্তু ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারেনি। ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ হলো—জীবিকা, পরিবেশ, জ্বালানি ও নাগরিক স্বাচ্ছন্দ্যের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা। পরিকল্পিত নীতি ও ধারাবাহিক বাস্তবায়ন ছাড়া নগরবাসীর ভোগান্তি কমবে না; বরং দ্রুত নগরায়ণের সঙ্গে সঙ্গে এই সংকট আরও গভীর হবে।
এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।








