আন্তর্জাতিক

ফেসবুক মন্তব্যে সৌদিতে মৃত্যুদণ্ড, ছেলেকে মুক্তি দিতে মায়ের আকুতি

ফেসবুক মন্তব্যে সৌদিতে মৃত্যুদণ্ড, ছেলেকে মুক্তি দিতে মায়ের আকুতি

ছবি: সংগৃহীত

ফেসবুকে ইসলাম ও মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্যের অভিযোগে সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শ্রীলঙ্কার নাগরিক আনোজন শিবরাশাকে ক্ষমা করে দেশে ফিরিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তার মা।

বিবিসি এ তথ্য জানিয়েছে।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে ২৪ বছর বয়সী ছেলের জীবন রক্ষার আবেদন জানিয়ে রাসামানিক্কাম যোগালক্ষ্মী বলেন, ‘আমার ছেলের করা ভুলের জন্য আমি ক্ষমা চাইছি। দয়া করে তাকে ক্ষমা করে আমাদের কাছে ফিরিয়ে দিন।’

ফেসবুকে করা একটি মন্তব্যের জেরে আনোজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়। সৌদি আরবের একটি আপিল আদালত ইসলাম ও মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর অবমাননার অভিযোগে তাকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেন।

ঘটনাটি নিয়ে শ্রীলঙ্কায় ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দেশটির বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ ও সরকারি সংস্থা আনোজনকে ক্ষমা করে দেওয়ার জন্য কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়েছে। শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তাকে সহায়তার জন্য সম্ভাব্য সব ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

তবে ২৮ সেপ্টেম্বরের পর থেকে আনোজনের পরিবারের সঙ্গে তার কোনো যোগাযোগ নেই। কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যে শ্রীলঙ্কা সরকার পরিবারকে এ বিষয়ে আর কোনো বক্তব্য না দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।

সৌদি কর্তৃপক্ষ এখনো আনোজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কোনো তারিখ জানায়নি। তবে সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে পরিবার বা বিদেশি দূতাবাসকে সবসময় জানানো হয় না। অনেক ক্ষেত্রে সাজা কার্যকরের পর স্বজনদের বিষয়টি জানানো হয়।

ঘটনার সূত্রপাত শ্রীলঙ্কায় একটি হিন্দু তীর্থযাত্রাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও নিয়ে বিতর্ক থেকে। জুনের শেষ দিকে হিন্দু তীর্থযাত্রীদের সঙ্গে থাকা একটি কুকুরকে এক মুসলিম তরুণ লাথি মারছেন, এমন একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে অনলাইনে ধর্মীয় বিতর্ক শুরু হয়।

একপর্যায়ে এক ব্যবহারকারী হিন্দু ধর্মের একটি দেবতাকে নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করেন। এর জবাবে আনোজন তামিল ভাষায় মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করেন। পরে তিনি মন্তব্যটি মুছে দিয়ে একটি ভিডিওতে ক্ষমা চান। তবে এরই মধ্যে মন্তব্যটির স্ক্রিনশট ছড়িয়ে পড়ে এবং তা আনোজনের কর্মস্থল ও সৌদি কর্তৃপক্ষের নজরে আসে।

এরপর জুলাইয়ে আনোজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। সৌদি কর্তৃপক্ষ তার ব্যক্তিগত ডিভাইস জব্দ করে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টগুলোও মুছে দেয়।

আনোজনের ভাই হামসিদান শিবরাশা বলেন, ‘সৌদি আরবের মানুষ এ বিষয়ে কিছুই জানত না। শ্রীলঙ্কার কিছু ব্যক্তি আমার ভাই যে কোম্পানিতে কাজ করত সেখানে ই-মেইল পাঠিয়েছিলেন।’

আল-আহসা ক্রিমিনাল কোর্ট প্রথমে আনোজনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও ৩০ লাখ সৌদি রিয়াল জরিমানা করেন। তার পক্ষে সাজা কমানোর আবেদন করা হলেও তা নাকচ হয় বলে জানিয়েছেন শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিজিথা হেরাথ।

পরে ১৭ সেপ্টেম্বর মামলায় বড় পরিবর্তন আসে। সৌদি কৌসুলিরা সাইবার অপরাধ আইনের পরিবর্তে শরিয়াহ আইনে আনোজনের বিচার চেয়ে আপিল করেন। আদালত সেই আবেদন মঞ্জুর করে তার সাজা মৃত্যুদণ্ডে উন্নীত করেন।

২১ সেপ্টেম্বর আনোজনের পরিবার শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট অনুরা কুমারা দিসানায়েকের সঙ্গে দেখা করে। প্রেসিডেন্ট তাঁদের আশ্বস্ত করেন, আনোজনকে সাধারণ ক্ষমার আওতায় আনতে সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে। এ জন্য সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়ানোর নির্দেশও দেওয়া হয়।

আনোজনের মুক্তির দাবিতে বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের নেতারাও একত্র হয়েছেন। বৌদ্ধ ও হিন্দু ধর্মীয় নেতারা প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ে স্মারকলিপি দিয়ে দ্রুত রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন।

এ ছাড়া চার সদস্যের একটি শ্রীলঙ্কান আইনি প্রতিনিধি দল চলতি সপ্তাহে সৌদি আরব যাচ্ছে। তারা আনোজনের স্থানীয় আইনজীবীদের সঙ্গে দেখা করে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করবে।

আনোজনের ভাই হামসিদান ২৮ সেপ্টেম্বর জানান, দুই দিন ধরে তিনি তার ভাইয়ের কোনো ফোন পাননি। দূতাবাসকে বিষয়টি জানিয়ে আনোজনের খোঁজ নিতে অনুরোধ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। সৌদি কারাগারে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিদের সাধারণত ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন ব্যবহারের সুযোগ থাকে না। কারা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তাদের ফোনে কথা বলার ব্যবস্থা করা হয়।

মানবাধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবে অনলাইনে মতপ্রকাশের ঘটনায় কঠোর সাজা দেওয়ার বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়ে আসছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জুলাইয়ে সৌদি আরবের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মোহাম্মদ আল-গামদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে করা মন্তব্যের জন্য মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। পরে তার সাজা বাতিল করে ৩০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয় বলে জানিয়েছে সৌদি মানবাধিকার সংগঠন এএলকিউএসটি।

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবে ১ কোটির বেশি বিদেশি কর্মী রয়েছেন। অধিকারকর্মীদের মতে, ভাষাগত সমস্যা ও পর্যাপ্ত আইনি সহায়তার অভাবে স্বল্প মজুরির অভিবাসী শ্রমিকরা দেশটির আইনি ব্যবস্থায় বিশেষ ঝুঁকির মুখ

বিষয়:ফেসবুক পোস্ট মৃত্যুদণ্ড সৌদি আরব

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…