বাংলাদেশে ঢুকছে নতুন মাদক ‘কুশ’: কতটা বিপজ্জনক এই মাদক?

বাংলাদেশে ‘কুশ’ নামের বিপজ্জনক মাদক পাচারের চেষ্টার অভিযোগে এক ভারতীয় নাগরিককে আটক করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তার ট্রলি থেকে ভারতীয় শাড়ির নিচে লুকানো ৪ কেজি ২৮০ গ্রাম কুশ উদ্ধার করা হয়েছে। ডিএনসির দাবি, একটি আন্তর্জাতিক পাচারচক্র বাংলাদেশে এই মাদকের বাজার তৈরির চেষ্টা করছে।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) দুপুরে বিমানবন্দরের আগমনী হলের গ্রিন চ্যানেলে অভিযান চালিয়ে অভিজিৎ দাস (৪০) নামের ওই ব্যক্তিকে আটক করা হয়। তিনি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বাসিন্দা।
ডিএনসি জানায়, ব্যাংকক থেকে থাই এয়ারওয়েজের টিজি ৩২১ ফ্লাইটে আসা অভিজিৎকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা হয়। পরে তার ট্রলি তল্লাশি করে কাপড়ের নিচে লুকানো মাদক উদ্ধার করা হয়। এ সময় তিনটি ভারতীয় শাড়ি, একটি ভারতীয় পাসপোর্ট, মুদ্রা, স্মার্টফোন ও বোর্ডিং কার্ড জব্দ করা হয়।
ডিএনসির ঢাকা মেট্রো (উত্তর) কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. রাজিউর রহমান জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অভিজিৎ নিজেকে ভারতের বনগাঁও রেলওয়ে স্টেশনের কুলি বলে পরিচয় দিয়েছেন। তার দাবি, একটি আন্তর্জাতিক ও ত্রিদেশীয় পাচারচক্র ভারতের নিম্নআয়ের মানুষদের ব্যবহার করে কলকাতা থেকে ব্যাংককে নিয়ে যায়। পরে শাড়িসহ বিভিন্ন পণ্যের আড়ালে তাদের মাধ্যমে বাংলাদেশে মাদক পাঠানো হয়।

ডিএনসির ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে দুই থেকে তিন দিন অবস্থান করে মাদকের একটি অংশ হস্তান্তরের পর বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ভারতে ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল অভিজিতের। তবে পাচারচক্রের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা এবং তার দেওয়া বক্তব্য তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা হবে।
কী এই কুশ, কী উপাদান থাকে এতে?
কুশ (Kush) নামে পরিচিত মাদক সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই নাম দিয়ে সব ক্ষেত্রে একই উপাদানের মাদক বোঝানো হয় না। কিছু অঞ্চলে কুশ বলতে গাঁজার একটি ধরন বোঝানো হলেও, কিছু জায়গায় এই নামে বিক্রি হয় ক্ষতিকর রাসায়নিক মেশানো মাদক। বিশেষ করে ‘ব্ল্যাক মাম্বা’ বা এ ধরনের কিছু পণ্যে সিন্থেটিক ক্যানাবিনয়েড থাকতে পারে। এগুলো শরীরের ক্যানাবিনয়েড রিসেপ্টরে প্রভাব ফেলে এবং প্রাকৃতিক গাঁজার প্রধান নেশাসৃষ্টিকারী উপাদান টিএইচসির তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী বা অনির্দেশ্য প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে।
কিছু কুশজাতীয় মাদকে সিন্থেটিক ওপিওড বা অন্য রাসায়নিক মেশানোর ঝুঁকির কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তবে সব কুশে এসব উপাদান থাকে না। শাহজালাল বিমানবন্দরে উদ্ধার করা মাদকের রাসায়নিক পরীক্ষা না হওয়া পর্যন্ত এতে ঠিক কী কী উপাদান রয়েছে, তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।
সেবনে যেসব বিপদ হতে পারে
কুশে কী ধরনের রাসায়নিক রয়েছে এবং কতটা মাত্রায় তা গ্রহণ করা হয়েছে, তার ওপর নির্ভর করে এর প্রভাব। সিন্থেটিক ক্যানাবিনয়েডযুক্ত মাদক সেবনে দেখা দিতে পারে:
- মানসিক ও স্নায়বিক সমস্যা: তীব্র উদ্বেগ, আতঙ্ক, বিভ্রান্তি, হ্যালুসিনেশন, অস্বাভাবিক আচরণ, খিঁচুনি ও অজ্ঞান হয়ে যাওয়া।
- হৃদ্যন্ত্রের জটিলতা: হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া বা অনিয়মিত হওয়া এবং রক্তচাপের বিপজ্জনক পরিবর্তন।
- শ্বাসপ্রশ্বাসের সমস্যা: মাদকে ওপিওডজাতীয় পদার্থ থাকলে শ্বাস ধীর হয়ে যাওয়া, শ্বাসকষ্ট ও অচেতন হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
- দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি: বারবার সেবনে নির্ভরশীলতা তৈরি হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে স্মৃতি, মনোযোগ ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে।
- মৃত্যুর ঝুঁকি: অতিরিক্ত মাত্রা, অজানা রাসায়নিকের মিশ্রণ বা একাধিক মাদক একসঙ্গে গ্রহণের ফলে প্রাণঘাতী পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাসায়নিক উপাদান ও মাত্রা অজানা থাকায় এ ধরনের মাদকের প্রতিক্রিয়া আগে থেকে অনুমান করা কঠিন। সেবনের পর শ্বাসকষ্ট, খিঁচুনি বা অচেতনতার মতো লক্ষণ দেখা দিলে তা জরুরি চিকিৎসার বিষয়।

ডিএনসি জানিয়েছে, এ ঘটনায় অভিজিৎ দাসের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ (সংশোধিত ২০২৬)-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় বিমানবন্দর থানায় মামলা করা হয়েছে। তাকে আদালতে সোপর্দ করার আইনি প্রক্রিয়া চলছে।



