দীর্ঘদিন ধরে চলা ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, সামরিক সংঘাত এবং বিশ্ব অর্থনৈতিক অস্থিরতার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে আলোর মুখ দেখছে ইরান ও আমেরিকার মধ্যকার ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তি।
২০২৬ সালের জুন মাসে পাকিস্তান ও কাতারের যৌথ মধ্যস্থতায় দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশের মধ্যে একটি দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) চূড়ান্ত হয়েছে। গত ফেব্রুয়ারি মাস থেকে শুরু হওয়া ভয়াবহ ‘ইরান যুদ্ধ’ এবং এর ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে এই চুক্তিটিকে একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রধান কূটনৈতিক ব্রেকথ্রু হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
গত ১৯ জুন সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় এটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা রয়েছে। এই চুক্তিটি কেবল দুটি দেশের সামরিক সংঘাতেরই অবসান ঘটাচ্ছে না, বরং এর পেছনে রয়েছে চীনের সাথে আমেরিকার সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং বিশ্ব অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণের এক জটিল সমীকরণ।
চুক্তির মূল রূপরেখা ও প্রধান শর্তাবলি
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এই সমঝোতা চুক্তির মূল লক্ষ্য হলো, অবিলম্বে রক্তক্ষয়ী সংঘাত বন্ধ করা এবং বিশ্ব বাণিজ্যের প্রধান রুটগুলোকে নিরাপদ করা। চুক্তির প্রধান পয়েন্টগুলো নিচে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করা হলো:
সামরিক সংঘাতের অবসান ও স্থায়ী যুদ্ধবিরতি: চুক্তির প্রথম শর্ত অনুযায়ী, সমস্ত ফ্রন্টে অবিলম্বে এবং স্থায়ীভাবে সব ধরনের সামরিক ও যুদ্ধাভিযান বন্ধ করা হবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে তারা ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কোনো হস্তক্ষেপ করবে না এবং দেশটির সার্বভৌমত্বের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা বজায় রাখবে।
নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার ও হরমুজ প্রণালী উন্মুক্তকরণ: চুক্তি স্বাক্ষরের ৩০ দিনের মধ্যে আমেরিকা ইরানের বন্দর এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর চাপানো সমস্ত নৌ-অবরোধ সম্পূর্ণ তুলে নেবে। এর বিনিময়ে ইরান অবিলম্বে এবং কোনো শর্ত ছাড়াই আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করার জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালী’ খুলে দেবে এবং জাহাজ চলাচল যুদ্ধের আগের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হবে।
৬০ দিনের কূটনৈতিক উইন্ডো: চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকে পরবর্তী ৬০ দিন উভয় পক্ষ একটি নিবিড় কারিগরি ও কূটনৈতিক আলোচনায় বসবে। এই সময়কালীন আমেরিকা অঞ্চলে নতুন করে কোনো অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করতে পারবে না এবং ইরানের ওপর কোনো নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারবে না।
পারমাণবিক কর্মসূচির সীমাবদ্ধতা: ইরান পুনরায় পরমাণু অস্ত্র অসংযুক্তি চুক্তির (এনপিটি) আওতায় তার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে যে, তারা কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না। ইরানের কাছে থাকা ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামকে কীভাবে বেসামরিক কাজের উপযোগী মাত্রায় (৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ) নামিয়ে আনা যায়, তা এই ৬০ দিনের টেকনিক্যাল টকের মূল এজেন্ডা হবে। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার আগের কঠোর অবস্থান থেকে কিছুটা সরে এসে ইরানের সমস্ত ইউরেনিয়াম স্টকহোল্ড বিদেশে পাচার করার শর্তটি শিথিল করতে রাজি হয়েছে।
অর্থনৈতিক প্রণোদনা ও ফ্রিজড অ্যাসেট অবমুক্তকরণ: যুদ্ধবিরতির ৬০ দিন ইরানের তেল, পেট্রোকেমিক্যাল এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য পণ্য রপ্তানির ওপর সাময়িক ছাড় দেওয়া হবে। একই সাথে, বিদেশে আটকে থাকা ইরানের ফ্রিজড অ্যাসেট বা স্থাবর সম্পদের একটি বড় অংশ (প্রায় ১২ থেকে ২৪ বিলিয়ন ডলার) কোনো শর্ত ছাড়াই অবমুক্ত করার পথ তৈরি করা হচ্ছে। এছাড়া দীর্ঘমেয়াদে ইরানের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার আঞ্চলিক সহযোগীরা মিলে সর্বনিম্ন ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি আন্তর্জাতিক পুনর্গঠন তহবিল গঠন করবে।
লাভ-ক্ষতির সমীকরণ: কোন পক্ষ লাভবান হলো?
আপাতদৃষ্টিতে এই চুক্তিটিকে একটি “উভয় পক্ষের ছাড়” মনে হলেও, গভীরভাবে দেখলে দুই পক্ষই নিজ নিজ জায়গায় কৌশলগত কিছু সুবিধা আদায় করতে পেরেছে।
ইরানের কৌশলগত জয়: কোনো ধরনের শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন বা নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ ছাড়াই ইরান এই যুদ্ধ থেকে সম্মানজনকভাবে বের হয়ে আসতে পেরেছে। ভঙ্গুর অর্থনীতি সচল করতে বিলিয়ন ডলারের তহবিল ও তেল বিক্রির সুযোগ পাওয়া তেহরানের জন্য একটি বড় অর্জন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—ইসরায়েলের তীব্র আপত্তি থাকা সত্ত্বেও ইরান তার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক প্রক্সি অক্ষকে (যেমন হিজবুল্লাহ) এই চুক্তির আওতার বাইরে রাখতে পেরেছে।
আমেরিকার রাজনীতি ও অর্থনৈতিক স্বস্তি: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের জন্য এটি একটি বড় রাজনৈতিক মাইলেজ। তিনি প্রমাণ করতে পেরেছেন যে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে জড়ানো ছাড়াই তিনি ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার প্রতিশ্রুতিতে ধরে রাখতে পেরেছে। সবচেয়ে বড় লাভ হয়েছে বিশ্ব অর্থনীতিতে; চুক্তি ঘোষণার সাথে সাথে অপরিশোধিত তেলের দাম এক ধাক্কায় প্রায় ৫ শতাংশ কমে গেছে, যা মার্কিন তথা বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি কমাতে বড় ভূমিকা রাখছে।
সফরের ব্যর্থতা এবং আমেরিকার কৌশলগত বাধ্যবাধকতা (চীন)
এই শান্তিচুক্তির টাইমিং বা সময়কাল লক্ষ্য করলে একটি গভীর ভূরাজনৈতিক সত্য উন্মোচিত হয়। মে ১৪-১৬, ২০২৬-এ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চীন সফর আশানুরূপ সফল না হওয়াটাই ওয়াশিংটনকে ইরানের সাথে চুক্তিতে বসতে বাধ্য করেছে। আমেরিকার মূল লক্ষ্য ছিল চীনকে রাজি করানো যেন তারা ইরান থেকে তেল কেনা বন্ধ করে তেহরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। কিন্তু চীন তাদের নিজস্ব জ্বালানি নিরাপত্তা এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন একক আধিপত্য ঠেকাতে আমেরিকার এই দাবিতে সায় দেয়নি।
চীন সফরে এই কূটনৈতিক ব্যর্থতার অর্থ ছিল আমেরিকা যদি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী করে, তবে ইরানকে পেছন থেকে অর্থনৈতিক ও পরোক্ষ সামরিক ব্যাকআপ দেওয়ার জন্য চীন ও রাশিয়া প্রস্তুত। এটা ছিল চীন-রাশিয়ার যৌথ ব্রিকস স্বার্থের অবস্থান থেকে একটা স্ট্র্যাটেজি।
একই সাথে, মার্কিন সামরিক থিংক ট্যাংকগুলোর একটি চিরন্তন নীতি হলো, তারা একই সাথে দুটি বড় বৈশ্বিক শক্তির সাথে সরাসরি সংঘাতে জড়াবে না।
ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের অর্থনৈতিক ও সামরিক উত্থান ঠেকাতে আমেরিকাকে বিশাল শক্তি ও মনোযোগ দিতে হচ্ছে। মে মাসে চীন সফরে বেইজিংয়ের কঠোর মনোভাব দেখার পর ওয়াশিংটন বুঝতে পারে যে, তারা যদি মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সাথে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে জড়িয়ে থাকে, তবে এশিয়ায় চীন তার প্রভাব আরও বাড়িয়ে নেবে। তাই চীনকে কাউন্টার করার জন্য মধ্যপ্রাচ্যের ফ্রন্টটি দ্রুত বন্ধ করা আমেরিকার জন্য জরুরি হয়ে পড়েছিল।
ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ ও আঞ্চলিক অসন্তোষ
এই চুক্তিটি যুদ্ধ থামানোর ক্ষেত্রে বড় সাফল্য হলেও এর স্থায়িত্ব নিয়ে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা কিছুটা সংশয়ে আছেন। এই চুক্তিতে সবচেয়ে বড় অসন্তুষ্ট পক্ষ হলো ইসরায়েল। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই চুক্তির তীব্র বিরোধিতা করে একে ঐতিহাসিক ভুল বলে আখ্যা দিয়েছেন। ইসরায়েলের মতে, এই চুক্তি ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করবে, যা ইরান পরবর্তীতে হিজবুল্লাহ বা হামাসের মতো প্রক্সি গ্রুপগুলোকে অর্থায়নে ব্যবহার করতে পারে। এছাড়া ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে কোনো লাগাম না টানায় ইসরায়েল নিজেদেরকে অনিরাপদ মনে করছে।
২০২৬ সালের ইরান-মার্কিন শান্তিচুক্তিটি কোনো চিরস্থায়ী শান্তির দলিল নয়, বরং এটি একটি অত্যন্ত বাস্তবমুখী ও কৌশলগত যুদ্ধবিরতি। চীন সফরে আমেরিকার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জিত না হওয়াটাই ওয়াশিংটনকে বাস্তবমুখী হতে এবং ইরানের সাথে একটি সম্মানজনক এক্সিট রুট বেছে নিতে বাধ্য করেছে। অন্যদিকে ইরানও বুঝতে পেরেছে যে সম্পূর্ণ ধ্বংসযজ্ঞ এড়াতে অর্থনীতির চাকা সচল করা প্রয়োজন।
এই চুক্তি সাময়িকভাবে বিশ্ব অর্থনীতি ও তেলের বাজারকে স্বস্তি দিলেও, মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘমেয়াদী ভবিষ্যৎ এবং ইসরায়েল-ইরান দ্বিমুখী উত্তেজনা আগামী দিনগুলোতে এই চুক্তির স্থায়িত্বকে বড় পরীক্ষার মুখে ফেলবে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







