১৫ দিন পর জানা যাবে ইনানীর গ্যাসের গতিপ্রকৃতি, এখনও জ্বলছে আগুন

কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে নলকূপ স্থাপনের সময় ভূগর্ভ থেকে বের হওয়া গ্যাসে লাগা আগুন পঞ্চম দিনেও নিয়ন্ত্রণে আসেনি। শনিবার (৩১ অক্টোবর) পরিস্থিতি পর্যালোচনায় ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স) ও বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) উচ্চপর্যায়ের একটি দল। প্রাথমিকভাবে ওই এলাকায় অগভীর গ্যাসের মজুত থাকার সম্ভাবনা বিবেচনা করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে গ্যাসের প্রকৃতি, মজুতের পরিমাণ এবং বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য কি না, তা এখনো নিশ্চিত হয়নি।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আপাতত ১৫ দিন গ্যাসের প্রবাহ ও আগুনের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হবে। এ সময়ে গ্যাসের প্রবাহ কমে এলে তা স্বাভাবিকভাবে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। অন্যথায় বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে গ্যাস নির্গমন নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জোর করে আগুন নেভানো বা গ্যাসের প্রবাহপথে বাধা সৃষ্টি করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন তারা।
জননিরাপত্তার স্বার্থে আগুনের উৎসস্থলের চারপাশের ২০০ মিটার ব্যাসার্ধে ১৪৪ ধারা জারি করেছেন উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পান্না আক্তার। ওই এলাকায় সাধারণ মানুষের প্রবেশ ও অবস্থান নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আগুন জ্বালানো, ধূমপান, দিয়াশলাই ও লাইটার ব্যবহারসহ স্ফুলিঙ্গ সৃষ্টি করতে পারে এমন কর্মকাণ্ডেও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবে নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে প্রতিদিন ঘটনাস্থলে উৎসুক মানুষের ভিড় জমছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন ও মাইনস) প্রকৌশলী মো. শোয়েব জানান, বাপেক্স ও পেট্রোবাংলার বর্তমান কর্মকর্তাদের পাশাপাশি অবসরপ্রাপ্ত ভূতাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞদের নিয়ে জরুরি বৈঠকে বিষয়টি পর্যালোচনা করা হয়েছে। প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, নির্গত গ্যাসটি থার্মোজেনিক বা বায়োজেনিক প্রকৃতির হতে পারে। আগুনের শিখার রং দেখে গ্যাসের সঙ্গে তরল তেল বা কনডেনসেট মিশ্রিত থাকার সম্ভাবনাও বিবেচনা করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, দেশে সাধারণত মাটির দেড় থেকে পাঁচ কিলোমিটার গভীরে গ্যাসের মজুত পাওয়া যায়। তবে ইনানীর ক্ষেত্রে অগভীর কোনো গ্যাসের মজুত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রকৃত উৎস ও মজুত সম্পর্কে ধারণা পেতে আগামী ১৫ দিন আগুনের শিখার উচ্চতা ও গ্যাসের চাপ পর্যবেক্ষণ করা হবে।
এ সময়ে আগুনের তীব্রতা অপরিবর্তিত থাকলে বা বেড়ে গেলে সাইড ট্র্যাকিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে ‘রিলিফ কূপ’ খননের মাধ্যমে গ্যাস নির্গমন বন্ধের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। আর গ্যাসের প্রবাহ স্বাভাবিকভাবে কমে বা বন্ধ হয়ে গেলে পরিস্থিতি অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনের কারণে আশপাশের কয়েকটি স্তর থেকেও গ্যাস নির্গত হয়ে জ্বলতে দেখা যাচ্ছে বলে জানান পেট্রোবাংলার এই কর্মকর্তা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে ওই অঞ্চলে ত্রিমাত্রিক (থ্রিডি) ভূকম্পন জরিপ চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে বাপেক্সের। জরিপে বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মজুত পাওয়া গেলে পূর্ণাঙ্গ কূপ খননের বিষয়টিও বিবেচনা করা হবে।
বাপেক্সের ভূতাত্ত্বিক বিভাগের মহাব্যবস্থাপক শামসিয়া মুকতাদির বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাপেক্সের অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতা রয়েছে। নিজস্ব ব্যবস্থাপনাতেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। তবে সম্ভাব্য বড় দুর্ঘটনা এড়াতে সতর্কতার সঙ্গে প্রতিটি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
ইনানীতে নির্গত গ্যাসের প্রকৃতি সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। কিছু নমুনা সংগ্রহ করা গেলেও গ্যাসের প্রবাহ বিভিন্ন স্থান দিয়ে ছড়িয়ে পড়ায় পুরোপুরি নমুনা সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছেন বাপেক্সের ভূতাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞরা। ফলে গ্যাসটি থার্মোজেনিক, বায়োজেনিক নাকি দুই ধরনের গ্যাসের মিশ্রণ, তা পরীক্ষার আগে নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
গ্যাসের রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য, মিথেনসহ বিভিন্ন হাইড্রোকার্বনের উপস্থিতি এবং সম্ভাব্য তরল হাইড্রোকার্বন বা কনডেনসেটের পরিমাণ নির্ধারণে পরীক্ষাগারভিত্তিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিলা ও পানির নমুনা বিশ্লেষণের মাধ্যমেও ভূগর্ভস্থ স্তর সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেতে পারে। এসব পরীক্ষার ফল এবং পরবর্তী ভূতাত্ত্বিক জরিপের মাধ্যমে গ্যাসের উৎস ও সম্ভাব্য মজুত সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।
উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পান্না আক্তার জননিরাপত্তার স্বার্থে আগুনের উৎসস্থলের ২০০ মিটার ব্যাসার্ধে ১৪৪ ধারা জারি করেছেন। পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত এ নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকবে।

নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং, কাঁটাতারের বেষ্টনী ও লাল নিশানা টাঙানো হয়েছে। মেরিন ড্রাইভ থেকে ঘটনাস্থলে সংযোগকারী দুটি সড়কে যান চলাচল বন্ধ রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ব্যারিকেড দিয়েছে। নিষেধাজ্ঞা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ারও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
এর আগে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে আশপাশের এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছিল। পরে বিকল্প উপায়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে প্রতিদিন বিকেলে পর্যটকসহ দূরদূরান্ত থেকে শত শত মানুষ ঘটনাস্থলে ভিড় করছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। এতে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
গত মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সকাল সাতটার দিকে উখিয়ার জালিয়াপালং ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ইনানী ছোট খাল ব্রিজসংলগ্ন একটি বাড়ির আঙিনায় নলকূপ স্থাপনের কাজ চলছিল। পাইপ প্রায় এক হাজার ফুট গভীরে পৌঁছালে তীব্র বেগে গ্যাস বের হতে শুরু করে। একপর্যায়ে সেই গ্যাসে আগুন ধরে যায়।
খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের একাধিক ইউনিট, সেনাবাহিনী ও পুলিশ আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালায়। কিন্তু ভূগর্ভ থেকে অব্যাহতভাবে গ্যাস বের হতে থাকায় আগুন নেভানো সম্ভব হয়নি। পরে বাপেক্সের কারিগরি দল ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে।
পরিস্থিতি মোকাবিলা ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেই সিদ্ধান্তের আলোকে ঘটনাস্থলের চারপাশে নিরাপত্তাবলয় গড়ে তোলা হয়।
ইনানীতে বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মজুত পাওয়া গেলে কক্সবাজার ও দক্ষিণ চট্টগ্রামের অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তবে ভূগর্ভে গ্যাসের উপস্থিতি, মজুত শনাক্ত হওয়া এবং বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার এক বিষয় নয়। এ জন্য গ্যাসের প্রকৃতি, মজুতের পরিমাণ, উত্তোলন ব্যয় এবং অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা যাচাই জরুরি।
পর্যাপ্ত গ্যাসের মজুত নিশ্চিত হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা স্থাপন, কর্মসংস্থান এবং অবকাঠামো উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হতে পারে। খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, সার, সিরামিক, হিমাগার ও অন্যান্য উৎপাদনশিল্পে বিনিয়োগের সম্ভাবনাও বাড়তে পারে।
গ্যাস উত্তোলন ও পরিবহনের জন্য পাইপলাইনসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণে বিনিয়োগ আসতে পারে। এতে প্রকৌশলী, কারিগরি কর্মী, পরিবহন শ্রমিক, নিরাপত্তাকর্মী ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পর্যাপ্ত দেশীয় গ্যাস উৎপাদন সম্ভব হলে আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর চাপ কমাতেও তা ভূমিকা রাখতে পারে।
ইনানীতে বাণিজ্যিক গ্যাসের মজুত নিশ্চিত হলে এবং ভবিষ্যতে পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহের সুযোগ তৈরি হলে কক্সবাজার অঞ্চলে শিল্পায়নের সম্ভাবনা বাড়তে পারে। বিশেষ করে মাছ, শুঁটকি, লবণ ও কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিং, বরফকল, হিমাগার, পরিবহন এবং পর্যটন অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হলেই কক্সবাজারের সব উপজেলায় সরাসরি গ্যাস সংযোগ দেওয়া সম্ভব হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। এ জন্য পাইপলাইন নির্মাণ, সরকারি অনুমোদন, উৎপাদন সক্ষমতা, বিতরণব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা বিবেচনা করতে হবে। পাশাপাশি পর্যটননির্ভর এলাকার পরিবেশ ও প্রতিবেশ সুরক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
গ্যাসের মজুত ছোট হলে বাণিজ্যিক উৎপাদন লাভজনক নাও হতে পারে। মাঝারি মজুত পাওয়া গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও স্থানীয় শিল্পে ব্যবহারের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। আর বড় বাণিজ্যিক গ্যাসক্ষেত্র নিশ্চিত হলে জাতীয় গ্যাস সরবরাহ, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও রাজস্ব বৃদ্ধিতে অবদান রাখার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে ইনানীতে গ্যাসের মজুতের পরিমাণ এখনো নির্ধারিত হয়নি।
ভূগর্ভে গ্যাসের উপস্থিতি শনাক্ত হওয়া মানেই বাণিজ্যিক গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার নয়। প্রথমে ভূতাত্ত্বিক ও ত্রিমাত্রিক ভূকম্পন জরিপের মাধ্যমে সম্ভাবনাময় স্তর চিহ্নিত করতে হবে। এরপর অনুসন্ধানী কূপ খনন, গ্যাসের প্রবাহ ও চাপ পরীক্ষা, মজুত নিরূপণ এবং উত্তোলন ব্যয়ের অর্থনৈতিক মূল্যায়ন প্রয়োজন।
এসব পরীক্ষায় পর্যাপ্ত ও লাভজনক গ্যাসের মজুত নিশ্চিত হলেই উৎপাদন কূপ খনন এবং পাইপলাইনসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব। ফলে ইনানীতে গ্যাসের সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নিতে হলে কয়েকটি কারিগরি ও অর্থনৈতিক ধাপ অতিক্রম করতে হবে।
আগামী ১৫ দিনের পর্যবেক্ষণে গ্যাসের প্রবাহ, আগুনের শিখার উচ্চতা ও তীব্রতার পরিবর্তন সম্পর্কে পাওয়া তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। গ্যাসের উৎস ও প্রকৃতি নির্ধারণের পাশাপাশি সম্ভাব্য মজুত সম্পর্কে ধারণা পেতে পরবর্তী ভূতাত্ত্বিক জরিপের ফলও অপেক্ষার বিষয়।






