খাদ্য ব্যবসায় কবে থেকে কাদের জন্য নিবন্ধন? কেন এ নিবন্ধন?
পথের ধারের খাবারের দোকান থেকে বড় আমদানিকারক; সবাই আসছে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের নজরদারিতে

ছবি: সংগৃহীত
পথের ধারের খাবারের দোকান থেকে বড় আমদানিকারক; সবাই আসছে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের নজরদারিতে
দেশের খাদ্য ব্যবসায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং ভোক্তাদের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে খাদ্য খাতের সব ধরনের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে নতুন নিবন্ধন ও লাইসেন্স ব্যবস্থার আওতায় আনা হচ্ছে। আগামী ১ নভেম্বর থেকে এই ব্যবস্থা বাধ্যতামূলকভাবে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।
এর আওতায় রাস্তার পাশের ছোট খাবারের দোকান, ভ্রাম্যমাণ খাবার বিক্রেতা, চায়ের দোকান, রেস্তোরা, বেকারি, মিষ্টির দোকান থেকে শুরু করে খাদ্য উৎপাদনকারী, প্রক্রিয়াজাতকারী, সরবরাহকারী ও আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিবন্ধন অথবা প্রযোজ্য ক্ষেত্রে লাইসেন্স নিতে হবে।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) নতুন ‘নিরাপদ খাদ্য (রেজিস্ট্রেশন ও লাইসেন্স) প্রবিধানমালা, ২০২৬’ এর আওতায় এ ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে। গত জুলাইয়ে প্রকাশিত নতুন বিধিমালার মূল উদ্দেশ্য খাদ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন, বাজারজাতকরণ ও বিক্রয় পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে সরকারি নজরদারি জোরদার করা।
নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, খাদ্য ব্যবসাকে মূলত নিবন্ধন ও লাইসেন্স; এই দুই শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। সাধারণ ও ক্ষুদ্র খাদ্য ব্যবসার ক্ষেত্রে নিবন্ধন গ্রহণ করতে হবে। অন্যদিকে বিশেষায়িত খাদ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ ও সংশ্লিষ্ট কিছু কার্যক্রমের জন্য লাইসেন্সের প্রয়োজন হবে।
পথের ধারে ফুচকা, চটপটি, পিঠা, পুরি, পেঁয়াজু কিংবা অন্যান্য তৈরি খাবার বিক্রেতারাও নতুন ব্যবস্থার আওতায় পড়বেন। একইভাবে চা-কফির দোকান, ফলের রস বিক্রেতা, আইসক্রিমের দোকান, খাবারের হোটেল, রেস্তোরাঁ, বেকারি, ক্যাটারিং প্রতিষ্ঠান এবং অনলাইনে খাবার বিক্রির ব্যবসাও নিবন্ধনের আওতায় আসবে।
শুধু খুচরা বিক্রেতা নয়, খাদ্য আমদানিকারক, পাইকারি বিক্রেতা, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য উৎপাদনকারী ও বড় খাদ্য বিপণন প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে নতুন বিধান। তবে ব্যবসার ধরন অনুযায়ী নিবন্ধন ও লাইসেন্সের শর্ত আলাদা হবে।
বিধিমালা অনুযায়ী, সাধারণভাবে নিবন্ধন ও লাইসেন্সের মেয়াদ হবে তিন বছর। মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নির্ধারিত নিয়মে তা নবায়ন করতে হবে।
নিবন্ধনের প্রাথমিক ফি এক হাজার টাকা এবং নবায়ন ফি ৫০০ টাকা হিসেবে জানানো হয়েছে। তবে প্রতিষ্ঠানের আয়তন, ব্যবসার প্রকৃতি এবং খাদ্য সংরক্ষণাগারের আকার অনুযায়ী লাইসেন্স ফি ভিন্ন হতে পারে। বড় খাদ্য গুদামের ক্ষেত্রে লাইসেন্স ফি ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত নির্ধারণের বিধানও রয়েছে।
খাদ্য ব্যবসায়ীদের নিবন্ধন ও লাইসেন্স প্রক্রিয়া সহজ করতে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ অনলাইনভিত্তিক ব্যবস্থা চালু করেছে। এর মাধ্যমে ব্যবসায়ীরা প্রয়োজনীয় তথ্য প্রদান, নিবন্ধনের আবেদন, লাইসেন্সের আবেদন এবং নবায়ন-সংক্রান্ত কার্যক্রম সম্পন্ন করতে পারবেন।
কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের পরিচয়, ঠিকানা এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য দিয়ে আবেদন করার ব্যবস্থা রয়েছে।
দেশে খাদ্যে ভেজাল, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবার তৈরি, অনিরাপদ সংরক্ষণ এবং মানহীন খাদ্য বাজারজাতকরণ দীর্ঘদিনের উদ্বেগের বিষয়। নতুন নিবন্ধন ব্যবস্থার মাধ্যমে খাদ্য ব্যবসার একটি সমন্বিত তথ্যভান্ডার গড়ে তোলা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এতে কোন এলাকায় কতটি খাদ্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে, তারা কী ধরনের খাবার উৎপাদন বা বিক্রি করছে এবং কোন প্রতিষ্ঠান কোন পর্যায়ের খাদ্য সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত; এসব তথ্য পর্যবেক্ষণ করা সহজ হবে। পাশাপাশি খাদ্য নিরাপত্তা বিধান বাস্তবায়নে পরিদর্শন ও তদারকি কার্যক্রম আরও কার্যকর করার সুযোগ তৈরি হবে।
তবে ছোট ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, বিশেষ করে ফুটপাতের খাবার বিক্রেতা, ভ্রাম্যমাণ দোকানি এবং ছোট ব্যবসায়ীদের অনেকের জন্য নিবন্ধন প্রক্রিয়া, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ ও নির্ধারিত ফি পরিশোধ বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।
বড় খাদ্য উৎপাদনকারী ও আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেও নতুন বিধিমালা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের বক্তব্য অনুযায়ী, খাদ্য ব্যবসা পরিচালনায় আগে থেকেই একাধিক সরকারি সংস্থার অনুমোদন ও লাইসেন্স নিতে হয়। নতুন ব্যবস্থা কার্যকর হলে প্রশাসনিক জটিলতা এবং ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় বাড়তে পারে।
নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের নতুন উদ্যোগ খাদ্য খাতে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কেবল নিবন্ধন ও লাইসেন্স প্রদান করলেই নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত হবে না। নিয়মিত পরিদর্শন, খাদ্যের মান পরীক্ষা, আইন প্রয়োগ এবং ব্যবসায়ীদের সচেতনতা বৃদ্ধিও সমানভাবে প্রয়োজন।
তারা বলেছেন, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জীবিকা ও বড় প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক সক্ষমতার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে।






