শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে উত্তাল ফ্রান্স, গ্রেপ্তার ৫ হাজারের বেশি

ছবি: সংগৃহীত
শিক্ষায় আরও বিনিয়োগের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ঘিরে মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) ফ্রান্সজুড়ে বড় ধরনের বিক্ষোভের প্রস্তুতি চলছে। গত এক সপ্তাহের বিক্ষোভে দেশটির শত শত স্কুল অবরুদ্ধ হয়েছে। এ সময় অন্তত ১৯০ শিক্ষার্থী আহত এবং ৫ হাজারের বেশি মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছেন।
সংবাদমাধ্যম বিবিসি এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
সোমবার (৫ অক্টোবর) উত্তরাঞ্চলীয় শহর লসের একটি স্কুলের কাছে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় ১৫ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থীর হাত বিস্ফোরণে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তাকে কাছের একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তার আঘাত জীবনহানির মতো গুরুতর নয়।
এর আগে গত সপ্তাহে সা-তুয়া-লো-মোন শহরে ১৪ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী টিয়ার গ্যাসের গ্রেনেডের আঘাতে গুরুতর আহত হয়। তার আইনজীবীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তার চোয়ালের দুটি হাড় ভেঙে যায় এবং বড় ধরনের অস্ত্রোপচার করতে হয়।
সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে ওই শিক্ষার্থীর মা বলেন, ঘটনায় তার হৃদয় ভেঙে গেছে। ফরাসি সংবাদমাধ্যম বিএফএমটিভির প্রতিবেদনে তার বক্তব্য তুলে ধরে বলা হয়, ‘এটি লজ্জাজনক, ভয়াবহ, সহিংস এবং আতঙ্কজনক। শিশুদের সঙ্গে এমন হওয়া উচিত নয়। তারা পড়াশোনার জন্য আরও ভালো পরিবেশ চাইছে।’
বিক্ষোভের অন্যতম আয়োজক ইউনিয়ন সিন্দিকাল লিসেয়েন (ইউএসএল) মঙ্গলবার দেশব্যাপী কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। সংগঠনটি বলেছে, সরকার শিক্ষার্থীদের দাবির বিষয়ে কিছুই বাস্তবভাবে দেয়নি।
অন্যদিকে ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়া লেকর্নো জানিয়েছেন, মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষা কর্মীদের সমস্যার সমাধানে সরকার বেশ কিছু পদক্ষেপ ঘোষণা করেছে। স্কুলগুলোতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন তিনি।
তবে সহিংসতার বিষয়ে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না বলে সতর্ক করেছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, হামলার শিকার শিক্ষার্থী ও শিক্ষা কর্মীদের পাশাপাশি আহত পুলিশ ও জেন্ডারমদের প্রতিও সরকার সমর্থন জানায়।
আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে শিক্ষক ইউনিয়ন এসএনইএস-এফএসইউ তাদের সদস্যদের মঙ্গলবারের বিক্ষোভে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
ফ্রান্সের বিচার মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, আন্দোলন শুরুর পর এখন পর্যন্ত ৫ হাজার ৬০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৮৭ শতাংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং ১৩ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক।
এ ছাড়া ১৪ জনকে বিচার-পূর্ব হেফাজতে রাখা হয়েছে। আরও ১ হাজার ৮০২ জনের বিরুদ্ধে মামলা চলছে। তাদের মধ্যে ৩১৯ জন প্রাপ্তবয়স্ক এবং ১ হাজার ৪৮৩ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক।
বিক্ষোভে শুধু স্কুল অবরোধ নয়, বিভিন্ন এলাকায় ময়লার পাত্রেও আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ফ্রান্সের শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার জেফ্রে জানিয়েছেন, আন্দোলন শুরুর পর ২৪টি স্কুল পুড়িয়ে দেওয়া ও তছনছ করা হয়েছে।
বিক্ষোভের আয়োজক ইউএসএল পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ করেছে। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরা নুনেজ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ‘অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ’ পদ্ধতি অনুসরণ করেছে।
শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন এখন রাজনৈতিক বিতর্কেরও কেন্দ্রে চলে এসেছে। বামপন্থী দল লা ফ্রস ইনসুমিজের (এলএফআই) নেতা জ্য-লুক মেলশো আন্দোলনকে ১৯৬৮ সালের পর ফ্রান্সের সবচেয়ে শক্তিশালী উচ্চবিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের আন্দোলন হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
তিনি পুলিশের ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ তুলে তরুণদের বিক্ষোভ রক্ষায় মানুষকে রাস্তায় নামার আহ্বান জানিয়েছেন।
অন্যদিকে ডানপন্থী ন্যাশনাল র্যালির নেতা মেরিন ল্য পেন বিক্ষোভকে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন না বলে পেশাদারদের সংগঠিত দাঙ্গা হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি এলএফআইয়ের আইনপ্রণেতাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন উসকে দেওয়ার অভিযোগ তুলে নতুন দাঙ্গাবিরোধী আইন পাসের দাবি জানিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী লেকর্নোও এলএফআইকে আন্দোলন আরও ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানানোর জন্য দায়িত্বজ্ঞানহীন বলে সমালোচনা করেছেন।
এদিকে মার্সেই শহরের বামপন্থী মেয়র বেনোয়া পায়া শহরে সংঘটিত অগ্রহণযোগ্য সহিংসতার নিন্দা জানিয়েছেন। তরুণদের ভবিষ্যৎ ও সরকারি সেবা নিয়ে উদ্বেগকে যৌক্তিক উল্লেখ করে তিনি শান্তিপূর্ণভাবে নিজেদের মত প্রকাশের আহ্বান জানান।






