বাংলাদেশ

সাত কিলোমিটার হেঁটে জিয়ার স্মৃতি ফেরালেন তারেক রহমান

সাত কিলোমিটার হেঁটে জিয়ার স্মৃতি ফেরালেন তারেক রহমান

বাংলাদেশের রাজনীতিতে হাঁটা কখনো শুধু পথ পাড়ি দেওয়া নয়; কখনো তা মানুষের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা, কখনো জনসংযোগ, আবার কখনো অতীতের রাজনৈতিক ঐতিহ্যকে নতুন করে সামনে আনার উপলক্ষ। তারেক রহমানের সাত কিলোমিটার হাঁটার ঘটনা মনে করিয়ে দিচ্ছে তার বাবা, স্বাধীনতার ঘোষক শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের গ্রামমুখী রাজনীতি, খাল খনন কর্মসূচি এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের ইতিহাস।

সময় বদলেছে, বদলেছে রাজনৈতিক বাস্তবতা। কিন্তু বাবা ও ছেলের দুই সময়ের পদযাত্রার মধ্যে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি তাৎপর্যপূর্ণ যোগসূত্র।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জিয়াউর রহমানের নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে গ্রামবাংলার মেঠোপথ, কৃষকের মাঠ, খাল খনন আর স্বনির্ভরতার ডাক। রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে প্রত্যন্ত জনপদে যাওয়ার যে রাজনৈতিক কর্মপদ্ধতি তিনি গ্রহণ করেছিলেন, তার অন্যতম দৃশ্যমান দিক ছিল গ্রামে গ্রামে সফর এবং স্থানীয় উন্নয়নকাজে মানুষের অংশগ্রহণের আহ্বান।

কয়েক দশক পর তারেক রহমানের সাত কিলোমিটার হাঁটার ঘটনা সেই ইতিহাসকে আবার আলোচনায় এনেছে। এই পদযাত্রার সঙ্গে জিয়াউর রহমানের গ্রামমুখী কর্মকাণ্ডের মিল খুঁজছেন অনেকে।

খাল খনন থেকে স্বনির্ভরতার রাজনীতি

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের অর্থনীতি ছিল প্রধানত কৃষিনির্ভর। খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি, সেচব্যবস্থার উন্নয়ন, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং গ্রামীণ অবকাঠামো গড়ে তোলা ছিল রাষ্ট্রের বড় চ্যালেঞ্জ।

সত্তরের দশকের শেষভাগে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে খাল খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচি বিশেষ গুরুত্ব পায়। স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে পানিপ্রবাহ ও সেচব্যবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতিকে গতিশীল করার লক্ষ্য ছিল এই উদ্যোগের।

খাল খননকে ঘিরে গড়ে ওঠে জনসম্পৃক্ততার এক বিশেষ রাজনৈতিক ভাষা। রাষ্ট্রপতি নিজে বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে কাজ পরিদর্শন করতেন, স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথা বলতেন এবং উন্নয়নকাজে অংশগ্রহণের আহ্বান জানাতেন।

জিয়াউর রহমানের এই কর্মকাণ্ড তার রাজনৈতিক পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। বিএনপির রাজনৈতিক বয়ানে খাল খনন কর্মসূচি আজও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার প্রচেষ্টার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপিত হয়।

গ্রামে গ্রামে হাঁটা, মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ

জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের আরেকটি আলোচিত বৈশিষ্ট্য ছিল প্রত্যন্ত অঞ্চলে সফর। কখনো কৃষকের সঙ্গে কথা বলা, কখনো স্থানীয় উন্নয়ন প্রকল্প পরিদর্শন, কখনো গ্রামীণ মানুষের সমস্যার কথা শোনা; এসব ছিল তার জনসংযোগের অংশ। এই সফরগুলোর রাজনৈতিক গুরুত্বও ছিল।

রাজধানীকেন্দ্রিক রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি গ্রামকে দৃশ্যমানভাবে গুরুত্ব দেওয়া এবং সরাসরি জনগণের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়েছিল।

জিয়াউর রহমানের সময়েই ১৯৭৭ সালে ১৯ দফা কর্মসূচি সামনে আসে। কৃষি উৎপাদন, গ্রামীণ উন্নয়ন, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার মতো বিষয় এতে গুরুত্ব পায়।

১৯৭৮ সালে বিএনপি প্রতিষ্ঠার পর গ্রামমুখী উন্নয়নের এই ধারণা দলটির রাজনৈতিক পরিচয় নির্মাণেও ভূমিকা রাখে। রাষ্ট্রপতির গ্রাম সফর তাই কেবল প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড ছিল না; এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল একটি রাজনৈতিক দর্শন প্রচারের প্রচেষ্টাও।

উলাশীর খাল: যে ইতিহাসের বয়স পঞ্চাশ বছর

জিয়াউর রহমানের খাল খনন কর্মসূচির ইতিহাসে বিশেষ স্থান দখল করে আছে যশোরের শার্শা উপজেলার উলাশী-যদুনাথপুর প্রকল্প। ১৯৭৬ সালের ১ নভেম্বর প্রায় চার কিলোমিটার দীর্ঘ এই খালের খননকাজের উদ্বোধন করেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। স্থানীয় মানুষের স্বেচ্ছাশ্রমে বাস্তবায়িত প্রকল্পটি পরবর্তী সময়ে ‘উলাশী মডেল’ নামে পরিচিতি পায়।

উদ্দেশ্য ছিল কৃষিজমিতে সেচের পানি পৌঁছে দেওয়া, জলাবদ্ধতা কমানো এবং স্থানীয় মানুষকে উন্নয়নকাজে সম্পৃক্ত করা।

উলাশীর সেই উদ্যোগের বয়স এখন পঞ্চাশ বছর। এই দীর্ঘ সময়ে খাল খনন কর্মসূচি শুধু উন্নয়ন ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকেনি, জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গেও যুক্ত হয়েছে।

১৯৭৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর ব্রিটিশ সংবাদপত্র দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত পিটার নিসওয়ান্ডের একটি প্রতিবেদনে মানিকগঞ্জে খাল খনন কর্মসূচিতে মানুষের অংশগ্রহণের চিত্র উঠে আসে। সেই প্রতিবেদনে জিয়াউর রহমান খাল খননকে নিজেদের বিপ্লব হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।

৭ নভেম্বরে রাজপথে তারেক রহমান

পঞ্চাশ বছর পর ২০২৬ সালের ৭ নভেম্বর। দৃশ্যপট এবার রাজধানী ঢাকা। জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে শুরু হয় শোভাযাত্রা। সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

কাকরাইল, হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল, বাংলামোটর ও ফার্মগেট হয়ে শোভাযাত্রা পৌঁছায় মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে। দীর্ঘ পথ তিনি নেতাকর্মীদের সঙ্গে পায়ে হেঁটেই অতিক্রম করেছেন।

রাজপথের দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের শুভেচ্ছার জবাব দিয়েছেন তিনি। তার সঙ্গে ছিলেন মন্ত্রিসভার সদস্য এবং বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারা।

খাল খননে বাবার পদাঙ্ক অনুসরণের উদ্যোগ

তারেক রহমানের সঙ্গে জিয়াউর রহমানের উন্নয়নভাবনার যোগসূত্র শুধু ৭ নভেম্বরের পদযাত্রায় সীমাবদ্ধ নয়। ২০২৬ সালের ২৭ এপ্রিল যশোরের শার্শায় উলাশী খালের পুনঃখনন কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন তারেক রহমান। যে খালের খননকাজ পঞ্চাশ বছর আগে শুরু করেছিলেন তার বাবা, সেই খাল পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নেন ছেলে।

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ঘোষিত পরিকল্পনায় আগামী পাঁচ বছরে দেশব্যাপী ২০ হাজার কিলোমিটার খাল, নদী, নালা ও জলাধার খনন বা পুনঃখননের লক্ষ্য রয়েছে।

এই উদ্যোগের ঐতিহাসিক তাৎপর্য যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে বাস্তব চ্যালেঞ্জ। দেশের বহু খাল দখল, দূষণ ও ভরাটের কারণে কার্যকারিতা হারিয়েছে। ফলে পুনঃখননের পাশাপাশি নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করা এবং স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ।

ভিন্ন সময়, ভিন্ন বাস্তবতা মনে হলেও এসব উদ্যোগ মূলত সরাসরি মানুষের কাছে পৌঁছানোর দৃশ্যমান প্রচেষ্টা।

হাঁটার ইতিহাস, রাজনীতির উত্তরাধিকার

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ৭ নভেম্বর একটি বহুল আলোচিত ঐতিহাসিক দিন। সেই দিবসেই তারেক রহমানের দীর্ঘ পদযাত্রা তাই একটি বিশেষ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট পেয়েছে। জিয়াউর রহমানের খাল খনন কর্মসূচি এবং তারেক রহমানের সাম্প্রতিক পদযাত্রাকে পাশাপাশি রাখলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে জনসম্পৃক্ততার ধারণার পরিবর্তনও চোখে পড়ে।

সত্তরের দশকে গ্রামীণ উন্নয়নকে কেন্দ্র করে যে জনসংযোগের চর্চা গড়ে উঠেছিল, পাঁচ দশক পর তা নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তুলনার বিষয় হয়ে উঠেছে। তবে ইতিহাসের উত্তরাধিকার শুধু প্রতীকী কর্মকাণ্ডে নয়, নীতি ও কাজের ফলাফলেও মূল্যায়িত হয়।

৭ নভেম্বরের রাজপথে তারেক রহমানের দীর্ঘ হাঁটা তাই শুধু একটি শোভাযাত্রার দৃশ্য হয়ে থাকছে না। এর সঙ্গে ফিরে এসেছে পঞ্চাশ বছর আগের উলাশীর খাল, মেঠোপথে জিয়াউর রহমানের গ্রাম সফর এবং বাংলাদেশের উন্নয়ন ও রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অধ্যায়।

বিষয়:খাল খনন গ্রাম জিয়া জিয়াউর রহমান তারেক রহমান বিপ্লব ও সংহতি দিবস

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…