‘কালচারালি জিয়াউর রহমানের সবচেয়ে সিগনিফিক্যান্ট ভূমিকা বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’
জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসে মোস্তফা সরয়ার ফারুকী

জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা আলোচনা, স্মৃতিচারণ ও প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। এর মধ্যে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা ও চলচ্চিত্র নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর একটি দীর্ঘ ফেসবুক পোস্ট নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহ, জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক ভূমিকা, বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্ন এবং সাংস্কৃতিক পরিসরে ইতিহাসের উপস্থাপন নিয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরেছেন তিনি।
পোস্টের শুরুতেই জিয়াউর রহমানের জানাজায় মানুষের ব্যাপক উপস্থিতির প্রসঙ্গ টেনে ফারুকী লিখেছেন, রাষ্ট্র পরিচালনাকারীদের জনপ্রিয়তা বা গ্রহণযোগ্যতা নানা উপায়ে পরিমাপ করা যায়। তার মতে, জিয়াউর রহমানের গ্রহণযোগ্যতার একটি বড় প্রমাণ তার জানাজায় মানুষের ঢল।
ফারুকী ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্যে একটি মৌলিক মিলও খুঁজে পেয়েছেন। তার ভাষায়, দুটি ঘটনার মধ্যেই রয়েছে ‘এই মাটি কারো দাস হবে না’ এমন একটি চেতনা। ঘটনা দুটির চরিত্র, আত্মত্যাগ ও ব্যাপ্তি আলাদা হলেও দাসত্ব প্রতিরোধের প্রশ্নে তিনি এই মিল দেখছেন। একই সঙ্গে তার দাবি, দুটি ঘটনাই সমাজের একটি ক্ষুদ্র শ্রেণির মানুষের কাছে অস্বস্তির কারণ।
তারপরই পোস্টে একটি প্রশ্ন তুলেছেন তিনি, ৭ নভেম্বরের মধ্য দিয়ে যদি বাংলাদেশ দাসত্ব থেকে মুক্ত হয়ে থাকে, তাহলে ২০০৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশ আবার কীভাবে সেই অবস্থায় ফিরে গেল? এর ব্যাখ্যায় ফারুকী দায়ী করেছেন ‘কালচারাল ব্রেইনওয়াশ’ বা সাংস্কৃতিক মগজধোলাইকে।
নিজের বক্তব্যের পক্ষে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও জিয়াউর রহমানের ঐতিহাসিক ভূমিকার প্রসঙ্গ এনেছেন। ফারুকীর মতে, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে শেখ মুজিবুর রহমানের অবদান স্বীকার করার পাশাপাশি রাষ্ট্র বিনির্মাণ, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতির ভিত্তি স্থাপনে জিয়াউর রহমানের ভূমিকাও স্বীকার করতে হবে। শিক্ষা, নারী অগ্রগতি ও অর্থনীতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ভিত্তি তৈরি হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি।
জিয়াউর রহমানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক অবদান হিসেবে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের কথা উল্লেখ করেছেন এই নির্মাতা। তিনি বলেন,“কালচারালি জিয়াউর রহমানের সবচেয়ে সিগনিফিক্যান্ট ভূমিকা বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ। দেশের সব জাতিগোষ্ঠী এবং ধর্মের মানুষের জন্য উনি এক জায়গায় দাঁড়ানোর একটা বড় ছাতা তৈরি করে দিয়েছিলেন। শুধু মাত্র এথনিক বা রিলিজিয়াস পরিচয়কে ভিত্তি করে উনি কোনো টক্সিক ন্যাশন বানাইতে চান নাই। আবার রিলিজিয়াস বা এথনিক পরিচয় নিয়া কোনো হীনমন্যতায় জাতি ভুগতে থাকুক- এটাও উনি চান নাই। বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ এই সব প্রশ্নের বাইরে গিয়ে একটা ইনক্লুসিভ এবং আত্মমর্যাদা সম্পন্ন পরিচয় অফার করে। এটা একই সাথে বাঙালি জাতীয়তাবাদের টক্সিক ও পরাশ্রয়ী চরিত্র থেকে জাতিকে বের করে নিয়ে আসতে কাজ করেছিল।”
তবে ফারুকীর অভিযোগ, বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গন ও সাংস্কৃতিক পণ্যগুলোতে জিয়াউর রহমানকে বেশির ভাগ সময় নেতিবাচক চরিত্র হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। বিপরীতে শেখ মুজিবুর রহমানকে অনেক ক্ষেত্রে দেবতুল্য চরিত্র হিসেবে আঁকা হয়েছে।
তার মতে, নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ের পর থেকে এই সাংস্কৃতিক বয়ান জোরালো হতে থাকে। এর মধ্য দিয়ে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বয়ান প্রতিষ্ঠা এবং পরবর্তী সময়ে ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদের পক্ষে বুদ্ধিবৃত্তিক সম্মতি তৈরির ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর সেই সাংস্কৃতিক মগজধোলাইয়ের প্রভাব আগের মতো সহজে কাজ করবে না বলেও মনে করেন ফারুকী। এর কারণ হিসেবে তিনি জুলাইয়ের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে তৈরি বিভিন্ন প্রামাণ্যচিত্রের কথা উল্লেখ করেছেন। তার দাবি, এসব প্রামাণ্যচিত্রের সম্মিলিত ভিউ ২০ কোটির বেশি। মানুষের মুঠোফোনে ছড়িয়ে আছে জুলাইয়ের স্মৃতি। পাশাপাশি জুলাই জাদুঘরে ১৬ বছরের শাসনামল এবং ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের ঘটনাপ্রবাহও তুলে ধরা হচ্ছে।
তবে এখানেই থেমে থাকার সুযোগ নেই বলে মনে করেন সাবেক এই সংস্কৃতি উপদেষ্টা। তার মতে, সময়ের সঙ্গে মানুষের স্মৃতি ফিকে হয়ে আসার আগেই ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোকে সমষ্টিগত স্মৃতিতে স্থায়ীভাবে জায়গা করে দিতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন সুপরিকল্পিত সাংস্কৃতিক রোডম্যাপ বাস্তবায়ন। বাংলাদেশের আগামী দিনের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ অনেকটাই এর ওপর নির্ভর করবে বলে মনে করেন তিনি।
পোস্টের শেষ দিকে ফারুকী প্রশ্ন রেখেছেন, সেই সুপরিকল্পিত সাংস্কৃতিক রোডম্যাপ বাস্তবায়নে বাংলাদেশ কি আদৌ কাজ করছে?





