রাজনীতি

রাজনৈতিক সুর বদলালেও জুলাই নিয়ে আগের অবস্থানেই শেখ হাসিনা

রাজনৈতিক সুর বদলালেও জুলাই নিয়ে আগের অবস্থানেই শেখ হাসিনা

ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ক্ষমতাচ্যুতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ থেকে সরে এসে ’গণতন্ত্রের জন্য’ ওয়াশিংটনের সহযোগিতা চাওয়া, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে প্রতিশোধের পরিবর্তে সমঝোতার কথা বলা এবং নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগেরও নিরপেক্ষ বিচারপ্রক্রিয়ার কথা স্বীকার করা; সাম্প্রতিক দুটি বক্তব্যে নতুন রাজনৈতিক অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়েছেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা।

গত ১৯ অক্টোবর ওয়াশিংটনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলন এবং ২৮ অক্টোবর সাংবাদিক সুলতানা রহমানকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তার বক্তব্যের মূল সুর ছিল দেশে ফেরা, রাজনৈতিক পুনর্মিলন ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন। তবে এসব বক্তব্যকে পুরোনো অবস্থান থেকে পুরোপুরি সরে আসা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাপ্রবাহ, গণহারে মানুষ হত্যায় নিজের সরকারের দায় এবং বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির মূল্যায়নে আগের অবস্থান অনেকাংশেই বজায় রেখেছেন তিনি।

ওয়াশিংটনের ন্যাশনাল প্রেস ক্লাবে ১৯ অক্টোবর আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ভারত থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হন শেখ হাসিনা। সেখানে তিনি বলেন, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র কোনো পক্ষ নিক, তা তিনি চান না। বরং অবাধ নির্বাচন, সাংবিধানিক শাসন, আইনের শাসন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক বহুত্ববাদের মতো গণতান্ত্রিক নীতির পক্ষে দেশটির অবস্থান প্রত্যাশা করেন তিনি।

এই বক্তব্য বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ তার অতীতের যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী অবস্থানের কারণে। ক্ষমতায় থাকাকালে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, ভিসানীতি এবং বাংলাদেশের নির্বাচন ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে ওয়াশিংটনের সমালোচনার কঠোর জবাব দিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। ২০২৩ সালে সেন্ট মার্টিন দ্বীপের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কথিত আগ্রহের প্রসঙ্গ তুলে ক্ষমতায় থাকার সঙ্গে বিদেশি চাপের সম্পর্কের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরও মার্কিন সংশ্লিষ্টতার অভিযোগসংবলিত বক্তব্য তার নামে গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।

পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মার্কিন সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে সিদ্ধান্তমূলক প্রমাণ না থাকার কথা বলেন শেখ হাসিনা। গত বছরের নভেম্বরেই তার বক্তব্যের এই পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। ফলে এবারের ওয়াশিংটন সংবাদ সম্মেলনকে একেবারে নতুন অবস্থান বলা না গেলেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের বার্তা স্পষ্ট হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতা বাড়ানোর কথাও বলেছেন। মার্কিন বিনিয়োগ, বাণিজ্য, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা খাতে সম্পর্ক জোরদারের প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে বাংলাদেশ যাতে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, চীন কিংবা অন্য কোনো শক্তির প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র হয়ে না ওঠে, সে বিষয়েও গুরুত্ব দিয়েছেন।

রাজনৈতিক অবস্থানের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে প্রতিশোধের পরিবর্তে পুনর্মিলনের আহ্বান। ওয়াশিংটনের বক্তব্যে শেখ হাসিনা বলেছেন, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রতিশোধের ওপর নয়, পুনর্মিলনের ভিত্তিতে গড়ে উঠতে হবে। রাজনৈতিক বিরোধীদের অধিকার স্বীকার, সংলাপ এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিযোগিতার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।

এর আগে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন বক্তব্যে ২০২৪ সালের আন্দোলন, দলটির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তার এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ভূমিকা নিয়ে কঠোর অবস্থান প্রকাশ পেয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে পুনর্মিলনের আহ্বান রাজনৈতিক ভাষার গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে সমঝোতার জন্য আওয়ামী লীগ কী ধরনের ছাড় দিতে প্রস্তুত, বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সঙ্গে আলোচনা কীভাবে হতে পারে কিংবা অতীতের ঘটনাগুলোর দায় কীভাবে নির্ধারিত হবে; সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট রূপরেখা দেননি শেখ হাসিনা।

ওয়াশিংটনের বক্তব্যে নিজের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের ক্ষেত্রেও ন্যায়সংগত বিচারপ্রক্রিয়ার কথা বলেছেন তিনি। এমনকি নিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ আইনি প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন। ২০২৪ সালের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে প্রস্তুত থাকার কথাও জানান।

এই বক্তব্যে আইনি প্রক্রিয়ার প্রতি আনুষ্ঠানিক সম্মতি প্রকাশ পেলেও তা অভিযোগ স্বীকারের সমতুল্য নয়। শেখ হাসিনা তার সরকারের বিরুদ্ধে উত্থাপিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের দায় গ্রহণ করেননি। বরং তার বক্তব্যে বিচারপ্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিচার পরিচালনার অভিযোগই গুরুত্ব পেয়েছে।

সাংবাদিক সুলতানা রহমানকে দেওয়া সাক্ষাৎকারেও একই ধরনের অবস্থান প্রকাশ করেছেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন দেশের বাইরে থাকতে চান না। দেশে ফেরার পর কোথায় থাকবেন, তা নিশ্চিত নয় বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তবে এ ধরনের বক্তব্যকে ক্ষমতার রাজনীতি থেকে স্থায়ীভাবে সরে যাওয়ার ঘোষণা হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।

সবচেয়ে বেশি আলোচনা তৈরি হয়েছে তার ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার ঘোষণায়। ওয়াশিংটনের সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা জানান, ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশে ফিরতে চান। তবে তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় জানিয়েছেন, দেশে ফেরার সুনির্দিষ্ট দিন এখনো ঠিক হয়নি।

বাংলাদেশ সরকার অবশ্য শেখ হাসিনার এই ঘোষণাকে নিশ্চিত প্রত্যাবর্তনের প্রস্তুতি হিসেবে দেখছে না। গত ২৭ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেছেন, শেখ হাসিনা দেশে ফিরতে চাইলে সরকার বাধা দেবে না। তবে ফিরলে তাকে আইনগত বিচারপ্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে। একই সঙ্গে ডিসেম্বরের প্রত্যাবর্তন নিয়ে সরকার কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য পায়নি বলেও জানান তিনি।

ওয়াশিংটনে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পাওয়া নিয়েও সরকারের আপত্তি বহাল রয়েছে। তথ্য উপদেষ্টা জানিয়েছেন, বিদেশ থেকে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক তৎপরতা নিয়ে বাংলাদেশের আগের অবস্থানের পরিবর্তন হয়নি।

সার্বিকভাবে ওয়াশিংটনের সংবাদ সম্মেলন ও সুলতানা রহমানের সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনার বক্তব্যে তিনটি পরিবর্তনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগের পরিবর্তে দেশটির সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের আগ্রহ। দ্বিতীয়ত, প্রতিপক্ষকে মোকাবিলার রাজনৈতিক ভাষার পাশাপাশি সমঝোতা ও পুনর্মিলনের আহ্বান। তৃতীয়ত, দেশে ফেরার ঘোষণা এবং নিজের বিরুদ্ধে অভিযোগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ আইনি প্রক্রিয়ার কথা বলা।

তবে এই তিন ক্ষেত্রেই পরিবর্তন মূলত বক্তব্য ও রাজনৈতিক উপস্থাপনায় সীমাবদ্ধ। ২০২৪ সালের আন্দোলন ও ক্ষমতাচ্যুতির কারণ সম্পর্কে তার পূর্ববর্তী মূল্যায়ন, নিজের সরকারের ভূমিকা এবং আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে অবস্থানে মৌলিক পরিবর্তনের সুস্পষ্ট ঘোষণা পাওয়া যায়নি।

ফলে এখনই বলা যাচ্ছে না, শেখ হাসিনা পুরোনো রাজনৈতিক অবস্থান ছেড়ে নতুন কোনো সমঝোতার পথে এগোচ্ছেন, নাকি দেশে ফেরার লক্ষ্য সামনে রেখে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভিন্ন ভাষায় নিজের অবস্থান তুলে ধরছেন।

সেই প্রশ্নের উত্তর ভবিষ্যতে মিলবে। আপাতত স্পষ্ট, শেখ হাসিনার বক্তব্যের ভাষা বদলাচ্ছে।

বিষয়:আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাংবাদিক সুলতানা রহমান

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…