বাংলাদেশ

জাপানে এক লাখ কর্মী পাঠানোর খবরে বিভ্রান্তি যেভাবে, আসলে কী?

জাপানের বক্তব্যে বাংলাদেশের জন্য কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা বন্ধ হয়ে যায়নি; বরং সম্ভাবনা ও নিশ্চিত প্রতিশ্রুতির পার্থক্য স্পষ্ট হয়েছে।

জাপানে এক লাখ কর্মী পাঠানোর খবরে বিভ্রান্তি যেভাবে, আসলে কী?

ছবি: সংগৃহীত

জাপানে বছরে এক লাখ বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর বিষয়টির ব্যাখ্যা দিয়েছে টোকিও। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরের পর বাংলাদেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন খবর ছড়িয়ে পড়লেও জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে এর অর্থ এই নয় যে, বাংলাদেশ থেকে জাপানে কর্মী নেওয়ার উদ্যোগই নেই।

মূলত বাংলাদেশের কর্মী পাঠানোর লক্ষ্য, জাপানের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের আগের পরিকল্পনা এবং দুই সরকারের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তকে এক করে উপস্থাপন করায় বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে।

বিভ্রান্তির সূত্রপাত খুঁজতে ফিরে যেতে হয় ২০২৫ সালের মে মাসে। ওই সময় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের জাপান সফরকালে টোকিওতে বাংলাদেশি জনশক্তি নিয়ে একটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে জাপানের ন্যাশনাল বিজনেস সাপোর্ট কম্বাইন্ড কো-অপারেটিভসের (এনবিসিসি) চেয়ারম্যান মিকিও কেসাগায়ামা আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশ থেকে অন্তত এক লাখ দক্ষ কর্মী নেওয়ার প্রস্তুতির কথা জানান। একই অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) এবং জাপানসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে দুটি সমঝোতা স্মারক সই হয়।

সেই সময়ের ঘোষণা অনুযায়ী, পাঁচ বছরে এক লাখ কর্মী নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। অর্থাৎ গড়ে বছরে ২০ হাজার কর্মীর সমপরিমাণ একটি লক্ষ্য। সেটিও ছিল জাপানের সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিকল্পনা, জাপান সরকারের পক্ষ থেকে প্রতি বছর নির্দিষ্টসংখ্যক বাংলাদেশিকে ভিসা দেওয়ার নিশ্চয়তা নয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে এক লাখ কর্মী নেওয়ার এই পুরোনো ঘোষণার সঙ্গে নতুন করে বছরে এক লাখ কর্মী পাঠানোর লক্ষ্য মিলেমিশে যায়।

বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর জাপান সফরকে কেন্দ্র করে। সফরের আগে বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জাপানের শ্রমবাজারে বছরে এক লাখ কর্মী পাঠানোর পরিকল্পনার কথা সংবাদমাধ্যমে আসে। এতে কারিগরি প্রশিক্ষণার্থী, নির্দিষ্ট দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী এবং বিভিন্ন খাতের পেশাজীবীদের সুযোগ তৈরির বিষয়টি গুরুত্ব পায়।

সমস্যা তৈরি হয় বাংলাদেশের এই পরিকল্পনাকে জাপানের সম্মতি হিসেবে প্রচার করার মধ্য দিয়ে। কোনো দেশ বছরে এক লাখ কর্মী পাঠানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করতেই পারে। কিন্তু সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য গন্তব্য দেশের সরকার ও নিয়োগদাতাদের সম্মতি, প্রয়োজনীয় কর্মসংস্থান, ভিসা এবং অন্যান্য শর্ত পূরণ করতে হয়। বাংলাদেশের পরিকল্পনা এবং জাপানের নিশ্চিত নিয়োগের সিদ্ধান্ত যে এক নয়, সংবাদ প্রচারের সময় সেই পার্থক্য অনেক ক্ষেত্রেই স্পষ্ট করা হয়নি।

এরই মধ্যে ১৭ অক্টোবর বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নসংক্রান্ত আরেকটি সহযোগিতা স্মারক সই হয়। এর আওতায় ২০২৭ সালের ১ এপ্রিল থেকে নতুন কাঠামোয় বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ শুরুর কথা রয়েছে। পাঁচ বছর মেয়াদি এই ব্যবস্থায় দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মী নিয়োগ এবং কর্মীদের সুরক্ষার বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে এই স্মারকেও বছরে এক লাখ বাংলাদেশি কর্মী নেওয়ার বাধ্যতামূলক কোনো কোটা নির্ধারণ করা হয়নি।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরকালে ২৭ অক্টোবর জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ, আঞ্চলিক যোগাযোগ এবং নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন বিষয় গুরুত্ব পায়। জাপানের সরকারি বিবরণ অনুযায়ী, আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে জাপানি বেসরকারি খাতের প্রায় এক ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগের সম্ভাবনার কথা জানানো হয়। এর মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রায় দুই লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রত্যাশাও তুলে ধরা হয়।

এখানেও সংখ্যাগত বিভ্রান্তির আরেকটি সুযোগ তৈরি হয়। বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগের মাধ্যমে দুই লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রত্যাশা এবং বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়ে জাপানে চাকরি দেওয়ার বিষয় সম্পূর্ণ আলাদা। প্রথমটি বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা, দ্বিতীয়টি জাপানের শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের প্রবেশের বিষয়। জাপানের প্রকাশিত শীর্ষ বৈঠকের বিবরণে বছরে এক লাখ বাংলাদেশি কর্মী নেওয়ার কোনো সিদ্ধান্তের উল্লেখ নেই।

বিষয়টি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে জাপানিদের মধ্যেও বিভ্রান্তি দেখা যায়।

বিভ্রান্তি বাড়তে থাকায় ২৯ অক্টোবর বিষয়টি নিয়ে বক্তব্য দেন জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রেস সেক্রেটারি কিতামুরা তোশিহিরো। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া বার্তায় তিনি জানান, জাপান সরকার বাংলাদেশ থেকে এক লাখ কর্মী নিতে সম্মত হয়েছে বলে যে কথা, তার কোনো ভিত্তি নেই। ২৭ অক্টোবরের শীর্ষ বৈঠকেও এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে স্পষ্ট করেন তিনি। প্রকৃত তথ্য জানতে জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত শীর্ষ বৈঠকের বিবরণ দেখার পরামর্শ দেন এই কর্মকর্তা।

জাপানের এই আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের পর পরিষ্কার হয়েছে, বছরে এক লাখ বাংলাদেশি কর্মী নেওয়ার বিষয়ে দেশটির সরকারের নতুন কোনো প্রতিশ্রুতি বা চুক্তি হয়নি। তবে বাংলাদেশ থেকে দক্ষ কর্মী নেওয়ার বিদ্যমান সুযোগ এবং দুই দেশের সহযোগিতামূলক উদ্যোগ বহাল রয়েছে

বাস্তবে জাপানে বাংলাদেশি কর্মীদের প্রবেশের সুযোগ রয়েছে মূলত স্পেসিফায়েড স্কিলড ওয়ার্কার বা এসএসডব্লিউ এবং কারিগরি প্রশিক্ষণভিত্তিক কর্মসূচির মাধ্যমে। ২০১৯ সালে এ বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা স্মারক সই হয়েছিল। কিন্তু জাপানি ভাষায় দক্ষতা, নির্দিষ্ট পেশাগত যোগ্যতা এবং নিয়োগদাতাদের চাহিদা পূরণ না করলে শুধু সরকারি উদ্যোগের ভিত্তিতে বিপুলসংখ্যক কর্মী পাঠানো সম্ভব নয়।

বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জও এখানেই। বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, ২০০৪ সাল থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত অনুমোদিত নিয়োগকারী সংস্থার মাধ্যমে জাপানে গেছেন মাত্র ৫ হাজার ১৪ জন বাংলাদেশি। অন্যদিকে, ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে আইএম জাপার কর্মসূচির আওতায় গেছেন আরও ৭০২ জন। যদিও এসব হিসাব জাপানে যাওয়া সব শ্রেণির বাংলাদেশির পূর্ণ চিত্র নয়, তবু কর্মী পাঠানোর বর্তমান সক্ষমতা এবং বছরে এক লাখ কর্মী পাঠানোর উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যের মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাপানে জনসংখ্যার বার্ধক্য এবং কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমে যাওয়ায় বিদেশি কর্মীদের চাহিদা বাড়ছে। এই সুযোগ কাজে লাগাতে বাংলাদেশকে জাপানি ভাষা শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, দক্ষতা পরীক্ষা এবং নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে জাপানি নিয়োগদাতাদের প্রকৃত চাহিদার সঙ্গে বাংলাদেশের প্রশিক্ষণব্যবস্থার সমন্বয় প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে জাপানে এক লাখ বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর বিতর্কে তিনটি আলাদা বিষয় সামনে এসেছে। প্রথমত, ২০২৫ সালে জাপানের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর পাঁচ বছরে অন্তত এক লাখ কর্মী নেওয়ার পরিকল্পনা। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বছরে এক লাখ কর্মী পাঠানোর লক্ষ্য। তৃতীয়ত, ২০২৬ সালের অক্টোবরে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর শীর্ষ বৈঠক, যেখানে ওই সংখ্যক কর্মী নেওয়ার কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এই তিনটি বিষয়কে এক করে প্রচার করাই বিভ্রান্তির প্রধান কারণ।

জাপানের বক্তব্যে বাংলাদেশের জন্য কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা বন্ধ হয়ে যায়নি; বরং সম্ভাবনা ও নিশ্চিত প্রতিশ্রুতির পার্থক্য স্পষ্ট হয়েছে। এখন বাংলাদেশের সামনে মূল কাজ হলো কতজন কর্মী পাঠানোর লক্ষ্য ঘোষণা করা হয়েছে, তার চেয়ে কতজন প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও যোগ্যতা অর্জন করে জাপানের নিয়োগদাতাদের কাছ থেকে প্রকৃত চাকরির সুযোগ পাচ্ছেন, সেই বাস্তব অগ্রগতি নিশ্চিত করা।

বিষয়:এনবিসিসি জাপানে এক লাখ কর্মী পাঠানো জাপানে কর্মী পাঠানোর খবরে বিভ্রান্তি তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…