মতামত

শালীনতা বাহিনী

শালীনতা বাহিনী

রাষ্ট্রের আইন আছে। সেই আইন প্রয়োগের জন্য আছে পুলিশ, প্রশাসন, আদালত ও নানা ধরনের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান। প্রত্যেকেরই নির্দিষ্ট এখতিয়ার আছে, নির্দিষ্ট দায়িত্ব আছে। কিন্তু কোনো কোনো সময় মনে হয়, আমাদের রাষ্ট্রে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি আরেকটি অদৃশ্য বাহিনীও সক্রিয় হয়ে উঠেছে ‘শালীনতা বাহিনী’। তাদের হাতে কোনো সরকারি প্রজ্ঞাপন নেই, কোনো বিধিমালা নেই, কোনো সাংবিধানিক ক্ষমতা নেই; কিন্তু তারা ঠিক করে দিতে চান কে কী পোশাক পরবেন, কে কার সঙ্গে চলবেন, কে কোথায় যাবেন এবং কোন আচরণ ‘শালীন’ আর কোনটি ‘অশালীন’।

সাম্প্রতিক দুটি ঘটনা এই প্রবণতাকে নতুন করে সামনে এনেছে। তিন নারী বিদেশে যাওয়ার জন্য বিমানবন্দরে গিয়েছিলেন। তাদের পাসপোর্ট আছে, ভিসা আছে, টিকিট আছে। অর্থাৎ ভ্রমণের জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র তাদের হাতে ছিল। কিন্তু সঙ্গে কোনো পুরুষ না থাকায় তাদের বিদেশযাত্রায় বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। একইভাবে মেট্রোরেলে একজন যুবককে পোশাকের কারণে প্রবেশে বাধা দেওয়ার ঘটনাও আলোচনায় এসেছে।

প্রশ্ন হচ্ছে রাষ্ট্রের কোন আইন বা বিধি একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারীকে পুরুষ অভিভাবক বা সঙ্গী ছাড়া বিদেশ যেতে নিষেধ করেছে? কিংবা কোন আইনে বলা হয়েছে, নির্দিষ্ট ধরনের প্যান্ট না পরলে একজন যাত্রী গণপরিবহনে উঠতে পারবেন না? রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মচারীর ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা এক জিনিস নয়। কোনো পোশাক তার ব্যক্তিগত রুচির সঙ্গে না মিলতে পারে, কোনো আচরণ তার কাছে অশালীন মনে হতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের সময় প্রশ্নটি হওয়া উচিত আইন কী বলছে?

এখানেই বিপদ। কারণ আইন যেখানে শেষ, ব্যক্তিগত নৈতিকতার পাহারা যদি সেখান থেকে শুরু হয়, তাহলে নাগরিকের স্বাধীনতার জায়গাটি দ্রুত সংকুচিত হতে থাকে। একজন পুলিশ সদস্যের কাজ অপরাধ প্রতিরোধ করা, অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা, নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন কর্মকর্তার কাজ ভ্রমণসংক্রান্ত আইন ও বিধি প্রয়োগ করা। মেট্রোরেলের নিরাপত্তাকর্মীর কাজ যাত্রী ও স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তারা কেউই সমাজের পোশাকবিধির স্বঘোষিত বিচারক নন।

রাষ্ট্রের কর্মচারী যখন নিজের ব্যক্তিগত নৈতিক বোধকে আইনের ওপরে স্থান দেন, তখন সমস্যাটি আর ব্যক্তিগত থাকে না। তখন সেটি হয়ে যায় ক্ষমতার অপব্যবহারের প্রশ্ন। আমাদের সমাজে ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রভাব আছে এটি অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই। ধর্ম মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে নৈতিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার প্রশ্নে ধর্মীয় অনুশাসন, ব্যক্তিগত বিশ্বাস এবং রাষ্ট্রীয় আইন এই তিনটি বিষয়কে এক করে ফেললে বিপদ তৈরি হয়। একটি বহুত্ববাদী রাষ্ট্রে নাগরিকের অধিকার নির্ধারিত হবে সংবিধান ও আইনের মাধ্যমে; কোনো কর্মকর্তা বা সাধারণ নাগরিকের ব্যক্তিগত ধর্মীয় ব্যাখ্যার মাধ্যমে নয়।

আর এই জায়গাটিতেই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার দিকে তাকানো দরকার। শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু পরীক্ষায় পাস করানো নয়। শিক্ষা মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায়, যুক্তি দিয়ে বিচার করতে শেখায়, ভিন্নমত সহ্য করতে শেখায়, নিজের বিশ্বাসের পাশাপাশি অন্যের অধিকারকেও সম্মান করতে শেখায়। কিন্তু শিক্ষা যদি জ্ঞান, বিজ্ঞান, ইতিহাস ও যুক্তিবোধের বদলে কেবল মুখস্থ বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে যায়, তাহলে সমাজে যুক্তির জায়গা দখল করে নেয় পূর্বধারণা। তখন একজন নারীকে একা দেখলে প্রশ্ন ওঠে ‘তার সঙ্গে পুরুষ নেই কেন?’ একজন যুবককে হাফপ্যান্ট পরা অবস্থায় দেখলে প্রশ্ন ওঠে ‘এভাবে বাইরে বেরিয়েছে কেন?’ কিন্তু একই সমাজে একজন ছিনতাইকারী অস্ত্র হাতে রাস্তায় ঘুরলে সেই প্রশ্নটি অনেক সময় ততটা জোরালো হয় না। এখানেই আমাদের অগ্রাধিকারের ভয়াবহ সংকট।

পুলিশের সামনে বড় প্রশ্ন হওয়া উচিত কে ছিনতাই করছে? কে অস্ত্র বহন করছে? কে মাদক ব্যবসা করছে? কে কিশোর গ্যাং পরিচালনা করছে? কারা মানুষকে অপহরণ করছে? কারা নিখোঁজ মানুষদের সন্ধান দিতে ব্যর্থ হচ্ছে? কারা সংঘবদ্ধভাবে হামলা, ভাঙচুর ও হত্যাকাণ্ড ঘটাচ্ছে? কোথায় মব তৈরি হচ্ছে? কোথায় মানুষের জানমাল নিরাপত্তাহীন? এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

কিন্তু যদি রাষ্ট্রীয় কর্মচারীর সময় এবং ক্ষমতার একটি অংশ ব্যয় হয় একজন নারীর পোশাক, একজন যুবকের প্যান্ট কিংবা একজন প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক কার সঙ্গে বিদেশ ভ্রমণ করছেন এসব তদারকিতে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে: রাষ্ট্র কি তার মূল দায়িত্ব থেকে সরে যাচ্ছে? কারণ অপরাধের সঙ্গে পোশাকের কোনো সরল সম্পর্ক নেই। একজন মানুষ কী পোশাক পরেছেন, সেটি দেখে তার অপরাধী হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায় না। একজন নারী একা বিদেশ ভ্রমণ করছেন এটিও কোনো অপরাধের লক্ষণ নয়। বরং প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের চলাফেরা ও ভ্রমণের স্বাধীনতা একটি নাগরিক অধিকারের প্রশ্ন।

আমাদের সমাজে অদ্ভুত এক বৈপরীত্য তৈরি হয়েছে। একদিকে কেউ কেউ ব্যক্তিজীবনে বিপুল সম্পদ, বিলাসিতা ও ক্ষমতার প্রদর্শনে মগ্ন। রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয়, দুর্নীতি, অর্থপাচার কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ নিয়ে জনমনে দীর্ঘদিনের প্রশ্ন রয়েছে। অন্যদিকে রাস্তায় সাধারণ মানুষের পোশাক, চলাফেরা কিংবা ব্যক্তিগত আচরণ নিয়ে নৈতিকতার পাহারা বসানোর প্রবণতা দেখা যায়। অথচ রাষ্ট্রের চোখ সবচেয়ে বেশি খোলা থাকার কথা যেখানে, সেখানেই যদি চোখ আধবোজা থাকে, তাহলে পোশাকের দৈর্ঘ্য মাপা কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা হতে পারে না।

শিশু নিখোঁজ হচ্ছে, পরিচয়হীন মরদেহের খবর আসছে, কিশোর গ্যাং নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে, ছিনতাইয়ের আতঙ্কে সাধারণ মানুষ ভুগছে, মব সহিংসতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে এসবের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে দৃশ্যমানভাবে কঠোর ও কার্যকর হতে হবে। মানুষের ঘর, পথ, কর্মস্থল ও গণপরিবহনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই পুলিশের প্রধান দায়িত্ব। কে কী পরলেন, কে কার হাত ধরলেন, কে পুরুষসঙ্গী ছাড়া বিদেশ গেলেন এসব ব্যক্তিগত জীবনের বিষয়কে অপরাধ দমনের বিকল্প বানানো যায় না।

একটি সভ্য রাষ্ট্রের সৌন্দর্য এই নয় যে সেখানে সবাই একই রকম পোশাক পরবে, একইভাবে চলবে বা একই নৈতিক বিশ্বাস ধারণ করবে। বরং সভ্য রাষ্ট্রের শক্তি হলো মানুষের ভিন্নতা সত্ত্বেও আইন সবার জন্য সমান থাকবে। ধর্ম থাকবে মানুষের বিশ্বাসে, নৈতিকতা থাকবে মানুষের বিবেকে, আর রাষ্ট্র চলবে সংবিধান ও আইনের ভিত্তিতে।

রাষ্ট্রীয় কর্মচারী যদি আইন প্রয়োগের বদলে ব্যক্তিগত নৈতিকতার পাহারাদার হয়ে ওঠেন, তাহলে একদিন দেখা যাবে পুলিশ অপরাধী খুঁজছে না, খুঁজছে কে ‘শালীন’; ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা যাত্রীর কাগজ দেখছেন না, দেখছেন সঙ্গে কে আছে; আর নিরাপত্তাকর্মী নিরাপত্তা দেখছেন না, দেখছেন কে কী পোশাক পরেছে।
তখন রাষ্ট্রে পুলিশের প্রয়োজনীয়তা গৌণ হয়ে পড়বে, মুখ্য হয়ে জন্ম নেবে আরও বড় এক বাহিনী, যার নাম হবে-শালীনতা বাহিনী।

আর যে রাষ্ট্রে আইনরক্ষকের হাতে আইন নয়, ব্যক্তিগত নৈতিকতার মাপকাঠি চলে আসে, সেখানে বিপদটা পোশাকের নয় বিপদটা রাষ্ট্রের চরিত্রে।

(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই–এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

বিষয়:ইতিহাস ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা জ্ঞান বিজ্ঞান রাষ্ট্রের কর্মচারী শালীনতা বাহিনী

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…