যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যকার চলমান সংঘাতের আর্থিক ব্যয় নিয়ে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন সম্প্রতি জানিয়েছে যে, এই যুদ্ধের ব্যয় ইতিমধ্যে প্রায় ২৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। তবে স্বাধীন বিশ্লেষক এবং অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এবং পরোক্ষ খরচ হিসাব করলে এই সংঘাতের প্রকৃত ব্যয় ২০০ বিলিয়ন ডলার, এমনকি তার চেয়েও অনেক বেশি হতে পারে।
মঙ্গলবার (১২ মে) ক্যাপিটল হিলে কংগ্রেসের একটি শুনানিতে পেন্টাগনের ভারপ্রাপ্ত কম্পট্রোলার (শীর্ষ বাজেট কর্মকর্তা) জে হার্স্ট (জুলস হার্স্ট III) এই নতুন তথ্য প্রকাশ করেন। সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এ তথ্য জানিয়েছে।
তিনি জানান, মাত্র দুই সপ্তাহ আগে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ যুদ্ধের যে ২৫ বিলিয়ন ডলারের প্রাক্কলন দিয়েছিলেন, তা বর্তমানে বেড়ে ২৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এই আকস্মিক বৃদ্ধির কারণ হিসেবে হার্স্ট জানান, সামরিক সরঞ্জামের মেরামত ও প্রতিস্থাপন, যুদ্ধাস্ত্রের ব্যবহার এবং সামগ্রিক পরিচালন ব্যয় ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামের এই সামরিক অভিযানে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা মার্কিন বাহিনীর জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হচ্ছে।
হার্স্ট আরও জানান যে, এই ২৯ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলারই খরচ হচ্ছে শুধুমাত্র ক্ষতিগ্রস্ত সামরিক সরঞ্জাম মেরামত এবং নতুন সরঞ্জাম কেনার পেছনে।
পেন্টাগন ২৯ বিলিয়ন ডলারের কথা বললেও, বেশ কয়েকটি স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং অর্থনীতিবিদদের মতে পেন্টাগনের এই হিসাব খুবই সামান্য। তাদের মতে, যুদ্ধের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রভাব ২০০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি হতে পারে। এর পেছনে প্রধান কয়েকটি কারণ রয়েছে-
প্রথমত, পেন্টাগনের ২৯ বিলিয়ন ডলারের হিসাবে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর মেরামতের বিশাল খরচ অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
দ্বিতীয়ত, সংঘাতের কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের বাজারে যে ব্যাঘাত ঘটেছে, তার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে মার্কিন ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে। এছাড়া দীর্ঘমেয়াদে এই যুদ্ধের পরোক্ষ খরচও অনেক বেশি।
হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের যুদ্ধ-বাজেট বিশেষজ্ঞ লিন্ডা বিলমেসের মতে, আহত সেনাদের স্বাস্থ্যসেবা এবং অর্থনীতির ওপর চাপ বিবেচনা করলে মোট ব্যয় ১ ট্রিলিয়ন ডলারও ছুঁতে পারে। তাদের মতে, পেন্টাগনের বর্তমান হিসাবটি “হিমশৈলের চূড়া” মাত্র।
এই বিপুল ব্যয়ের খবর এমন একটি সময়ে সামনে এল, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন যুদ্ধ নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে রয়েছে। একদিকে যেমন যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যত ভেস্তে যাওয়ার পথে, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্যস্ফীতি এবং গ্যাসের দাম বাড়ায় সাধারণ মার্কিন ভোক্তারা অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়েছেন।
ট্রাম্প সম্প্রতি জানিয়েছেন, তেহরানের সর্বশেষ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার পর বর্তমান যুদ্ধবিরতি পরিস্থিতি “লাইফ সাপোর্টে” রয়েছে।
কংগ্রেসের অনেক সদস্য করদাতাদের এত বিপুল পরিমাণ অর্থ যুদ্ধে ব্যয় করার তীব্র সমালোচনা করছেন। তাদের মতে, এই বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার দেশের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা বা অন্যান্য জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যবহার করা যেত, যা এখন এমন একটি যুদ্ধে ব্যয় হচ্ছে যার বিরোধিতা করছে বহু সাধারণ মার্কিন নাগরিক।
পেন্টাগন জানিয়েছে, সংঘাতের সামগ্রিক ব্যয়ের একটি পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন শেষ হওয়ার পর কংগ্রেসের কাছে একটি সম্পূরক বাজেট প্রস্তাব পেশ করা হতে পারে। তবে যুদ্ধ যদি দীর্ঘায়িত হয় এবং জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা অব্যাহত থাকে, তবে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের প্রকৃত মূল্য ২৯ বিলিয়ন ডলারের গণ্ডি পেরিয়ে ২০০ বিলিয়ন ডলার বা তারও বেশি অংকে গিয়ে দাঁড়াবে বলে মনে করেন সামরিক বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদরা।








