অতিরিক্ত শর্ট ভিডিও দেখা কি সংসার ভাঙার কারণ হতে পারে?

ছবি: সংগৃহীত
একই ঘরে বসে আছেন স্বামী-স্ত্রী। দুজনের হাতেই স্মার্টফোন। একজন দেখছেন ফেসবুক রিলস, অন্যজন ইউটিউব শর্টস। কথা বলার সময় নেই, একসঙ্গে সময় কাটানোর আগ্রহও যেন কমে গেছে। দিনের পর দিন এমন চলতে থাকলে সম্পর্কের মধ্যে তৈরি হতে পারে অদৃশ্য দূরত্ব। একসময় ছোটখাটো বিষয় নিয়েও শুরু হয় মনোমালিন্য, অভিযোগ আর অভিমান।
প্রশ্ন হলো, অতিরিক্ত শর্ট ভিডিও দেখা কি সত্যিই সংসার ভাঙার কারণ হতে পারে?
মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, শর্ট ভিডিও দেখা নিজে দাম্পত্য সম্পর্ক ভাঙার সরাসরি কারণ নয়। তবে ফোন ব্যবহারের অভ্যাস যদি সঙ্গীর প্রতি মনোযোগ, যোগাযোগ ও আবেগের আদান-প্রদান কমিয়ে দেয়, তাহলে তা সম্পর্কের সন্তুষ্টি ও ঘনিষ্ঠতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
কেন বারবার শর্ট ভিডিও দেখতে ইচ্ছা করে?
শর্ট ভিডিওর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, অল্প সময়ের মধ্যে একের পর এক নতুন বিষয় দেখার সুযোগ। কখনো হাসির ভিডিও, কখনো আবেগপূর্ণ গল্প, আবার কখনো চমকে দেওয়ার মতো কোনো ঘটনা। একটি ভিডিও শেষ হতেই সামনে আসে আরেকটি। ফলে অনেক সময় মানুষ বুঝতে পারেন না, কখন কয়েক মিনিট থেকে এক ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে।
এর সঙ্গে জড়িত মস্তিষ্কের পুরস্কার-প্রত্যাশার প্রক্রিয়া। নতুন ও আকর্ষণীয় কিছু পাওয়ার সম্ভাবনা মানুষকে পরবর্তী ভিডিও দেখার আগ্রহ জোগায়। এভাবে বারবার স্ক্রল করার অভ্যাস তৈরি হতে পারে। তবে সবার ক্ষেত্রে এর প্রভাব এক নয়। সমস্যা তখনই গুরুতর হয়, যখন কেউ চাইলেও ব্যবহার কমাতে পারেন না এবং এর ফলে দৈনন্দিন দায়িত্ব কিংবা ব্যক্তিগত সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সঙ্গীকে উপেক্ষা করার মানসিক প্রভাব
মনোবিজ্ঞানে সামনাসামনি থাকা কাউকে উপেক্ষা করে ফোনে মনোযোগ দেওয়ার আচরণকে বলা হয় ‘ফাবিং’। শব্দটি এসেছে ‘ফোন’ ও ‘স্নাবিং’ থেকে। দাম্পত্য সম্পর্কে এমন আচরণ নিয়মিত ঘটলে একজন সঙ্গী নিজেকে অবহেলিত মনে করতে পারেন।
ধরা যাক, স্ত্রী সারাদিনের অভিজ্ঞতা স্বামীকে বলতে চাইছেন। কিন্তু স্বামী ফোনে ভিডিও দেখতে ব্যস্ত। আবার স্বামী কথা বলতে চাইলে স্ত্রীও হয়তো ফোন থেকে চোখ তুলছেন না। এমন ঘটনা বারবার ঘটলে দুজনের মধ্যে যোগাযোগ কমতে পারে। একজনের মনে হতে পারে, তাঁর কথা বা অনুভূতির কোনো গুরুত্ব নেই।
২০২১ সালে কম্পিউটার্স ইন হিউম্যান বিহেভিয়ার, সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণায় সঙ্গীর ফোনে মনোযোগ দেওয়ার আচরণের সঙ্গে সম্পর্কের সন্তুষ্টির নেতিবাচক যোগসূত্র পাওয়া গেছে। অর্থাৎ, ফোনের ব্যবহার যখন সঙ্গীর সঙ্গে সময় কাটানো ও পারস্পরিক মনোযোগের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তখন সম্পর্কের ওপর তার প্রভাব পড়তে পারে।
অন্যের সম্পর্ক দেখে নিজের সংসারে অসন্তুষ্টি
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই দেখা যায়, কেউ সঙ্গীকে দামি উপহার দিচ্ছেন, কেউ জন্মদিনে বিশেষ আয়োজন করছেন, আবার কেউ ভালোবাসার মুহূর্ত তুলে ধরছেন। এসব ভিডিও দেখতে দেখতে কেউ কেউ নিজের সম্পর্কের সঙ্গে অন্যের সম্পর্কের তুলনা করতে শুরু করেন।
মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয় ‘সামাজিক তুলনা’ বা সোশ্যাল কম্প্যারিসন। অন্যের জীবনের নির্বাচিত সুন্দর মুহূর্তগুলো দেখে নিজের সম্পর্ককে অসম্পূর্ণ মনে হতে পারে। তখন প্রশ্ন জাগে, অন্যদের সংসারে এত আনন্দ, অথচ আমার জীবনে কেন নেই?
কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাধারণত মানুষের জীবনের সুন্দর মুহূর্তগুলোই বেশি দেখা যায়। সেখানে প্রতিদিনের দায়িত্ব, মতবিরোধ, আর্থিক চাপ কিংবা সম্পর্কের জটিলতা সব সময় উঠে আসে না। তাই অনলাইনে দেখা সম্পর্কের সঙ্গে নিজের বাস্তব জীবনের তুলনা করলে অপ্রয়োজনীয় অসন্তুষ্টি তৈরি হতে পারে। অবশ্য শর্ট ভিডিও দেখলেই এমন হবে, তা নয়, ব্যক্তির মানসিক অবস্থা ও সম্পর্কের বাস্তব পরিস্থিতিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
ফোন নিয়ে ঝগড়া থেকে বাড়ে দূরত্ব
একজন সঙ্গী যদি মনে করেন, অন্যজন তাঁকে যথেষ্ট সময় দিচ্ছেন না, তাহলে এ নিয়ে অভিযোগ তৈরি হতে পারে। একজন বলছেন, ‘তুমি আমাকে সময় দাও না।’ অন্যজনের উত্তর, ‘সারাদিন কাজের পর একটু ভিডিও দেখলেও সমস্যা?’
এভাবে একই বিষয় নিয়ে বারবার তর্ক হলে মূল সমস্যাটি আড়ালে থেকে যায়। হয়তো একজন সঙ্গী আরও বেশি মনোযোগ ও ভালোবাসা চান, অন্যজন কাজের চাপ থেকে মুক্তি পেতে ফোন ব্যবহার করেন। কিন্তু দুজনের প্রয়োজন নিয়ে খোলামেলা আলোচনা না হলে ভুল বোঝাবুঝি বাড়তে পারে।
এখানে মনে রাখা দরকার, ফোন ব্যবহার নিয়ে ঝগড়া হলেই সংসার ভেঙে যাবে, এমন নয়। তবে দীর্ঘদিনের অবহেলা, যোগাযোগের ঘাটতি ও অসম্মানের সঙ্গে এই সমস্যা যুক্ত হলে সম্পর্ক আরও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
কীভাবে এই অভ্যাস সামলাবেন?
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কয়েকটি অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে। যেমন, প্রতিদিন কিছু সময় ফোন দূরে রেখে একে অন্যের সঙ্গে কথা বলা, একসঙ্গে খাওয়ার সময় ভিডিও না দেখা এবং ঘুমানোর আগে স্ক্রল করার সময় কমানো। পাশাপাশি অভিযোগের পরিবর্তে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করা জরুরি।
‘তুমি সব সময় ফোন দেখো’ বলার পরিবর্তে বলা যেতে পারে, ‘তুমি যখন আমার কথা বলার সময় ফোনে ব্যস্ত থাকো, তখন আমার একা লাগে।’ এতে দোষারোপের পরিবর্তে নিজের অনুভূতি বোঝানোর সুযোগ তৈরি হয়।
ফোন ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে, বারবার চেষ্টা করেও কমানো না গেলে কিংবা এ নিয়ে নিয়মিত ঝগড়া হলে কাউন্সেলরের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।
সম্পর্কের চেয়ে কি ফোন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে?
সংসার সাধারণত একটি মাত্র কারণে ভাঙে না। বিশ্বাসের সংকট,অসম্মান,দীর্ঘদিনের অবহেলা,যোগাযোগের অভাব কিংবা নির্যাতনের মতো নানা বিষয় সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। শর্ট ভিডিওকে তাই দাম্পত্য ভাঙনের একমাত্র কারণ বলা ঠিক নয়।
তবে প্রযুক্তি যখন মানুষের মনোযোগের বড় অংশ দখল করে নেয়,তখন কাছের মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষার জন্য সচেতন হওয়া প্রয়োজন। কারণ সম্পর্ক টিকে থাকে শুধু একই ছাদের নিচে থাকার মাধ্যমে নয়, টিকে থাকে একে অন্যের কথা শোনা, অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া এবং কঠিন সময়েও পাশে থাকার মধ্য দিয়ে।
দিনের শেষে প্রশ্নটি শুধু কতক্ষণ ভিডিও দেখছেন, তা নয়। বরং ভিডিও দেখতে গিয়ে আপনার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষটির জন্য কতটা সময়, মনোযোগ ও আন্তরিকতা অবশিষ্ট থাকছে?





