নদী ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মাণ এবং রাষ্ট্র, বিশেষজ্ঞ, গবেষক ও নাগরিক সমাজের যৌথ দায়বদ্ধতা প্রতিষ্ঠার আহ্বানের মধ্য দিয়ে ‘জনসম্পৃক্ত নদী ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা: টেকসই ভবিষ্যৎ ও যৌথ দায়বদ্ধতা’ শীর্ষক সেমিনার ও মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) সকাল ১০টা ৩০ মিনিটে জাতীয় প্রেসক্লাবের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া মিলনায়তনে নোঙর ট্রাস্ট আয়োজিত সেমিনার ও মতবিনিময় সভায় পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা, নদী রক্ষা, নৌপরিবহন, জলবায়ু পরিবর্তন, নদী গবেষণা এবং জনসম্পৃক্ত নদী ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিশেষজ্ঞ, গবেষক, পরিবেশকর্মী, নীতিনির্ধারক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা মতামত তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ এমপি বলেন, নদী ও পানিসম্পদ বাংলাদেশের অর্থনীতি, পরিবেশ, কৃষি, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। নদী রক্ষায় শুধু সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; জনগণকে সম্পৃক্ত করে সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, নাব্যতা, দখল ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং পানিসম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহারে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মাদারীপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য আনিসুর রহমান খোকন তালুকদার নদী ও জলাশয় রক্ষায় স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি বলেন, নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা জনপদ ও মানুষের জীবন-জীবিকা রক্ষায় স্থানীয় পর্যায়ে জনসম্পৃক্ত ব্যবস্থাপনা জোরদার করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী রওনাকুল ইসলাম টিপু বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় নদী, জলাভূমি ও পানিসম্পদকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করতে হবে। জলবায়ু অভিযোজন ও নদী ব্যবস্থাপনার প্রকল্পগুলোতে স্থানীয় জনগণের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
আমন্ত্রিত বিশেষ অতিথি বীর মুক্তিযোদ্ধা, লেখক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব আবু সাঈদ খান বলেন, নদী শুধু পানি প্রবাহের পথ নয়; নদী বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও মানুষের অস্তিত্বের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। নদী রক্ষাকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে জনসচেতনতা ও সামাজিক আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।
সভাপতির বক্তব্যে নোঙর ট্রাস্টের চেয়ারম্যান সুমন শামস বলেন, নদীকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের মানুষের যে জীবন, সংস্কৃতি ও অর্থনীতি গড়ে উঠেছে, নদী বিপন্ন হলে সেই জীবনব্যবস্থাও বিপন্ন হবে। নদী ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। নদী রক্ষায় সরকারের বিভিন্ন সংস্থা, গবেষক, বিশেষজ্ঞ, স্থানীয় জনগোষ্ঠী এবং নাগরিক সমাজকে একই প্ল্যাটফর্মে এনে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
তিনি নদীর দখল, দূষণ ও নাব্যতা সংকট নিরসনের পাশাপাশি নদীকেন্দ্রিক নৌপরিবহন ও পর্যটনের সম্ভাবনাকে টেকসইভাবে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এবং নদী রক্ষায় নাগরিক সমাজের দীর্ঘদিনের আন্দোলন ও অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে জনসম্পৃক্ত নদী ব্যবস্থাপনার জন্য কার্যকর সামাজিক কাঠামো গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
সেমিনারে বক্তারা বলেন, বাংলাদেশের নদী ও পানিসম্পদ রক্ষায় বিচ্ছিন্ন প্রকল্প বা শুধু অবকাঠামোভিত্তিক উদ্যোগের পরিবর্তে অববাহিকাভিত্তিক, পরিবেশসম্মত, বিজ্ঞানভিত্তিক ও জনসম্পৃক্ত ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নদীর দখল ও দূষণ বন্ধ, নদীর প্রবাহ ও নাব্যতা ফিরিয়ে আনা, খাল-বিল ও জলাভূমি সংরক্ষণ, নদীভিত্তিক নৌপরিবহন সম্প্রসারণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বক্তারা আরও বলেন, নদী রক্ষার দায়িত্ব কেবল কোন একটি মন্ত্রণালয় বা সরকারি প্রতিষ্ঠানের নয়। স্থানীয় প্রশাসন, পানি ও পরিবেশ সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, স্থানীয় জনগোষ্ঠী, গণমাধ্যম, বেসরকারি সংস্থা ও নাগরিক সমাজকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। নদীর ওপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর মতামত ও স্থানীয় জ্ঞানকে নদী ব্যবস্থাপনার সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বানও জানানো হয়।
সেমিনারে আরও বক্তব্য রাখেন পানি উন্নয়ন পরিকল্পনা সংস্থার মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলমগীর হোসেন, নদী গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক ড. মোহাম্মদ আলাউদ্দীন হোসেন, সিজিইডি, বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী ড. মো. আবদুল ওয়াহাব, নদী গবেষক ও নৌপরিবহণ বিশেষজ্ঞ তোফায়েল আহমেদ, নৌস্থপতি ও পানি বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী শামসুল আলম, তিস্তা নদী রক্ষা কমিটির সভাপতি ফরিদুল ইসলাম ফরিদ, নদী গবেষক ও লেখক মাহবুব সিদ্দিকী, নদী গবেষক ও গণমাধ্যমকর্মী আইরিন সুলতানা, ইব্রাহিম আহমেদ রিপন, প্রফেসর ড. মাহমুদুল ইসলাম, শাহ ইশরাত আজমেরী।
সেমিনারে জনসম্পৃক্ত নদী ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা, নদী ও জলাশয়ের দখল-দূষণ প্রতিরোধ, নৌপরিবহন ও নদী পর্যটনের সম্ভাবনা কাজে লাগানো এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ ও টেকসই পানিসম্পদ নিশ্চিত করার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন নোঙর ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদক আবদুর রাহিম।










