চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

সংখ্যালঘু পীড়ন আর কত? বিষয়টার বিহিত হোক

সংবাদপত্রগুলির পৃষ্ঠা খুলুন-যদি নিরপেক্ষ চোখ থাকে, অবশ্যই দেখবেন-১৬ বা ২০ পৃষ্ঠার, এমন কি ১২ পৃষ্ঠার কলেবর নিয়ে প্রকাশিত সংবাদপত্র সমূহের কোন না কোন পৃষ্ঠায়, ছোট বা বড় শিরোনামে দেশের কোন না কোন প্রান্তে সংঘটিত সংখ্যালঘু পীড়নের খবর।

বড় ধরণের কোন ঘটনা ঘটলে ঘটনাস্থলে পুলিশের আনাগোনা দেখা যায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সমূহের কল্যাণে নানা জাতীয় পোষ্টের মধ্যে কোথা থেকে কারা যেন কোন এক তরুণের (অবশ্যই হিন্দু) বিষয় লিখে দিয়ে তা এলাকার বাসিন্দাদেরকে মসজিদের মাইক যোগে সম্পূর্ণ বিনা পয়সায় জানানো হয় যে সংশ্লিষ্ট হিন্দু তরুণটি ইসলাম ধর্মের বা নবী মোহাম্মদের অবমাননা করেছে।

Reneta June

এই কথা কয়টি মুখ থেকে বেরোনোপর ফুরসৎ নেই যেন-নিমেষেই এলাকাটি লোকে লোকারণ্য। সকলেই উত্তেজিত। কারও হাতে লাঠি বা অন্য কোন অস্ত্রও দেখা যায়। হিন্দু পল্লী এমন জমায়েতের সাথে অত্যন্ত পরিচিত। তারা সবাই আতংকে শিউরে ওঠেন। আতংকিত বোধ করেন কারণ তারা তাঁদের জীবনের অভিজ্ঞতায় পাকিস্তান আমল থেকে শুরু করে আজতক, স্বাধীনোত্তর যুগে বিগত একটি যুগ ধরে দেখছেন ঐ শত শত মানুষ অতঃপর গ্রাম আক্রমণ করবে, বাড়িতে বাড়িতে আগুন দেবে, লুঠপাট করবে এবং নারী নির্যাতন ও চালাবে আল্লাহ্’র নামে শ্লোগান দিয়ে। কিন্তু তখন হাজার ডাকলেও পুলিশ আসবেন না, প্রশাসনের কেও আসবেন না, এম.পি. না, চেয়ারম্যান না-কেউ না। অসহায়ভাবে সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসীদের একতরফা হামলার শিকার হতে হবে।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু এই দেশেই তো জন্ম তাদেরও। এই একই দেশের সম অধিকারের সাংবিধানীক স্বীকৃতি সম্পন্ন নাগরিক তো তারাও। বরং তারা অনেক বেশী পুরাতন বাসিন্দা। তারা তো বেশী কিছু চাইছেন না। চাইছেন শুধুই সংবিধান সকল নাগরিকের যে অধিকার দিয়েছে সেটুকুই।

সংবিধান তো বলে নি হিন্দুরা এক ধরণের অধিকার ভোগ করবে মুসলিমরা তার চাইতে বেশি অধিকার ভোগ করবেন। খৃষ্টানরা মুসলিমদের চাইতে কম অধিকার ভোগ করবেন-বৌদ্ধেরাও তাই। না, এমন কোন বিধান-এমন কোন ধর্মীয় বৈষম্যমূলক বিধির অস্তিত্ব নেই আমাদের সংবিধানে। তবু রাষ্ট্র কেন বৈষম্যমূলক আচরণ করেই চলেছে।

যেমন: এক. ইসলাম বা নবী হরজরতের প্রতি সামান্য কটাক্ষ করলে তৎক্ষণাৎ তারা বাড়িঘর, তার পাড়াও গ্রাম ব্যাপক ভাংচুর, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও নারী নির্য্যাতনের শিকার হয়। অভিযোগ আনা হয় ইসলাম অবমাননার; দুই. শত শত মন্দির, গীর্জা প্রতি বছর বাংলাদেশে আক্রান্ত হচ্ছে দেব-দেবীর মূর্তি ভাংচুর করা হচ্ছে, মন্দিরে ও প্রতিগ্রামে আগুন দেওয়া হচ্ছে-তারপরও ধর্ম অবমাননার অভিযোগে কোন মোকর্দমা হয় না-কাউকে গ্রেফতার করা হয় না-কারও বিন্দুমাত্র শাস্তি দেওয়া হয় না?

আবার দেখা যায়, একটি মুসলিম বাড়ি যদি আক্রান্ত হয় সেই আক্রমণকারীকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে গ্রেপ্তার করা হয় এবং হিন্দুদের গ্রামকে গ্রাম আক্রমণ, ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের শিকার হলেও কোন মামলা ওই হামলাকারীদের বিরুদ্ধে হয় না। এই বৈষম্য সৃষ্টি করে চলেছে আমাদের রাষ্ট্র, আমাদের সরকার ক্ষমতায় অসীন হলেও লংঘন করে। এই সংবিধান লংঘন ও আমাদের দেশে নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপারে পরিণত।

কিছুদিন পর পরই তো দেখা যাচ্ছে নানা অজুহাতে সংখ্যালঘুদেগর উপর হামলা হয়। তাদের বাড়িঘর, উপাসনালয়ে হামলা হয়, ভাংচুর, লুটপাট, অগ্নি সংযোগ অবাধে ঘটে, অনেক সময় হতাহতের ঘটনাও ঘটে, সংখ্যা লঘুর ঘরের নারীর সম্ভ্রমহানির খবরও কম নয়। বিশ্লেষণকদের মতে, এসব হামলা ঘটনা পর্য্যালোচনা করে একটি প্যাটার্ন পাওয়া যাচ্ছে-প্রায় প্রতিটি হামলাই হচ্ছে ইসলাম ধর্মের অবমাননার গুজব রটিয়ে। পরবর্তী সময়ে যার পিছনে চিহ্নিত সাম্প্রদায়িক অপশক্তির রিকল্পিত ইন্ধনের প্রমান মিলছে। সম্পত্তি দখল বা স্থানীয় ইস্যু নিয়েও এ জাতীয় ঘটনা ঘটানো হয়ে থাকে। ঘটনা ঘটার পর আলোচনা সমালোচনার ঝড় ওঠে কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই ইস্যু চাপা পড়ে যায়। অপরাধীরাও বীরদর্পে ঘুরে বেড়ায়।

ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, বাংলাদেশের জন্মের শুরু থেকেই সংখ্যালঘুরা ছিল অপশক্তিগুলির টার্গেট। একাত্তরে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী বেছে বেছে হিন্দুদের উপর হামলা চালিয়েছে লক্ষ্য, হিন্দু জনগোষ্ঠিকে উৎখাত করা। পাকিস্তাীদের হাত থেকে বাংলাদেশ মুক্ত হলেও স্বাধীনতার ৫০ বছরেও হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর আক্রমণ যাবে নি। ধর্ম অবমাননা, জাতীয় বা স্থানীয় নির্বাচন কিংবা তুচ্ছ অন্য কোন ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা হরহামেশাই ঘটছে।

২০০১ সালের নির্বাচনের পর একটি বিশেষ ভোটব্যাংকের তকমা নিয়ে সংখ্যালঘুদের উপরে যে হামলা চালানো হয় তা ১৯৪৭, ১৯৫০, ১৯৬৪, ১৯৯০, ১৯৯২ সালের সংখ্যালঘু নির্য্যাতনের ধারাবাহিকতাই ঘটেছে। পরবর্তীতে ২০১৩ম ২০১৪ ও ২০১৮ সালে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা বিচ্ছিন্ন কোন ঘটনা নয়। এ ছাড়া ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতন যেন নতুন মাত্রা হিসেবে দেখা দিয়েছে। এই নির্যাতনের ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশে ক্রমান্বয়ে সংখ্যালঘুদের সংখ্যা কমছে। নিরাপত্তা এবং পরবর্তী বংশধরদের কথা ভেবেই দেশ ছাড়ছেন অনেকে। বাংলাদেশের আদমশুমারী পর্য্যালোচনায়ও সেই তথ্য মিলে।

মানবাধিকার কর্মী ও সংখ্যালঘু নেতারা বলছেন, স্বাধীন বাংলাদেশে প্রতিটি নির্বাচনের আগে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত গ্রাম আক্রান্ত হয়। বিশেষ করে ১৯৭৫ পরবর্তী কোন জাতীয় নির্বাচন সংখ্যা লঘুদের জন্য সুফল বয়ে আনে নি। নির্বাচনের আগে ও পরে। দুর্গোৎসবে সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিষয়টি এখন যেন নির্ধারিত হয়ে গেছে। বসতবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, এমন কি দেবালয়ও এসব হামলার অক্ষ্যবস্তু। এসব ঘটনার নেপথ্যে যারা থাকেন সেই তালিকায় পরাজিত ও জয়ী সংসদ সদস্য, মন্ত্রী ও দলীয় প্রভাবশালী নেতা-কর্মীরাও রয়েছেন। অধিকাংশক্ষেত্রে প্রশাসন, রাজনৈতিক দল ও রাষ্ট্রের ক্ষমতাধর ব্যক্তিরা সংখ্যালঘু অজুহাতে নির্যাতনের সময় নিরব ভূমিকা পালন করেন। অতীতের রেকর্ডসহ নড়াইলে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক ঘটনা সেই প্রমাণই দেয়।

বারবার হামলা:টার্গেট সংখ্যালঘু
দেশে ধর্মের নামে উগ্রবাদ অসহিষ্ণুতা চরম পর্য্যায়ে পোঁছেছে। মৌলবাদী গোষ্ঠী ও নানা বর্ণের তাদের পৃষ্ঠপোষকরা বা তাদের লালিত গৌষ্ঠীসমূহ যে কোন ছুঁতোয় হামলে পড়ছে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ির উপর। ফেসবুকে অপপ্রচার ও শুক্রবারের ব্যবহার করা হয়েছিল। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসলে কে কি লিখছে, তা এখনও নিশ্চিত করতে পারে নি কোন পক্ষ। কিন্তু উগ্রবাদীরা এগিয়েছে তাদের পরিকল্পনা মতই।

শুক্রবার যেন আতংকের দিন
ফেসবুকে মিথ্যা অপপ্রচার চালানোর পাশাপাশি শুক্রবার জুমার নামাজের সময়টিকে সংগঠিত মাইকে মিথ্যা অভিযোগে ধর্ম অবমাননার হিন্দু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে। সংগঠিত হয়ে হিন্দু পাড়ায় চালানো হয় বর্বর আক্রমণ। বাড়িঘর, দোকান-পাট, মন্দির ভাংচুর করা হয়। একটি বাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। জ্বলতে থাকা বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে মালিক অসহায় বৃদ্ধের কান্না দেখে বিবেকবান মানুষেরা লজ্জায় মুখ ঘুরিয়ে নেন।

এর আগে লড়াইলেই গত ১৮ জুন মির্জাপুর ইউনাইটেড ডিগ্রী কলেজে পুলিশের সামনেই প্রবীন শিক্ষক স্বপন কুমার বিশ্বাসকে চরম অপদস্থ করা হয়। তার গলায় বর্বরেরা জুতার মালা পরিয়ে দেয়-প্রশাসনও নীরব দর্শকের ভূমিকায় ছিল। এমন দৃশ্যও দেখতে হলো মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশে এগুলি আকস্মিক নয়-সিরিজের অংশ মাত্র।

খোদ রাজধানীতেও
এই দুই ঘটনার মাঝামাঝি সময়ে খোদ রাজধানীতে একই স্টাইলে হামলার ঘটনা ঘটায় উগ্রবাদী সন্ত্রাসীরা। ঢাকা মহানগরীর উত্তরায় অধ্যাপক, নাট্যগুরু ও সংস্কৃতি অঙ্গনের বিশিষ্টজন রতন সিদ্দিকির বাসায় হামলা চালানো হয়। ঘটনার বিবরণে জানা যায়, এই দিনটিও ছিল শুক্রবার। নামাজ এর আগে উগ্রবাদীরা রতন সিদ্দিকির বাসার সামনে মোটর সাইকেল ইত্যাদি রেখে বাধার সৃষ্টি করে। প্রতিবাদ করায় নামাজ শেষে সংগঠিত হয়ে একদল লোক রতন সিদ্দিকীর বাসা আক্রমণ করে। উদাহরণের অভাব নেই। তেমনি আবার এই ঘটনা যারা ঘটিয়ে যাচ্ছে বছরের পর বছর ধরে-কখনও প্রকাশ্য দিবালোকে-আবার কখনও রাতের অন্ধকারে-কোন ঘটনা প্রতিরোধেই পুলিশকে এগিয়ে আসতে দেখা যায় নি। ভিকটিমরা মামলা দিলে হয়তো তা রেকর্ড করা হয় কিন্তু পুলিশী তদন্ত কিছুতেই এগায় না যদি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হুংকার ছাড়তে, “অপরাধীদের কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।” কন্তি বাস্তবে যা ঘটে তা হলো “অপরাধীদের কাউকেই শাস্তি দেওয়া হবে না”।

উল্টো গ্রেপ্তার হন ফেসবুকে পোষ্টদাতা বলে অভিযুক্ত যুবকেরা তারা দির্দোষ হওয়া সত্বেও। বহু ঘটনায় এটা প্রমাণিত।

হিন্দুরা দেশ ছাড়বে না
এসব ঘটনার পেছনে হিন্দুদের এ দেশ থেকে তাড়িয়ে দিয়ে তাদের পরিত্যক্ত সম্পত্তি দখলের উদ্দেশ্যে কাজ করে। এমন উদ্দেশ্য বহু ক্ষেত্রে সফলও হয়েছে। যথেষ্ট সংখ্যক হিন্দু ১৯৪৭ বা তারও আগে থেকে দেশ ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে নারী শিশুদের নিরাপত্তা ও আস্থাহীনতার কারণে। তবু যে দেড় কোটি আজও আছে-তারা চান তাদের মাতৃভূমিতেই থাকতে-তবে আতংক নিয়ে নয়, অধিকারহীনতা নিয়েও নয়। পরিপূর্ণ নাগরিক অধিকার এবং ধর্মীয় বৈষম্য মুক্ত হয়ে।

সে পরিবেশ যারা গড়বেন-তাদের আজ ঐক্যবদ্ধ হয়ে দৃঢ়তার সাথে রাস্তায় নামা প্রয়োজন।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)