৮৫ হাজার দর্শকের ভালোবাসায়, যেভাবে কাটল মেসির বিদায়ের শেষ মুহূর্ত

একটি ম্যাচ, অথচ আবেগের গভীরতা যেন হাজার ম্যাচের সমান। আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের জার্সিতে লিওনেল মেসির শেষ ম্যাচের প্রতিটি মুহূর্তই যেন হয়ে উঠেছে স্মৃতির অংশ। মাঠে বল গড়ানোর আগেই শুরু হয়ে গেছে কিংবদন্তির বিদায়।
বুয়েন্স আয়ার্সের ঐতিহাসিক মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে বেনিনের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার হয়ে শেষ ম্যাচটি খেলতে নেমেছেন লিওনেল মেসি। প্রিয় কিংবদন্তিকে শেষবারের মতো মাঠে দেখতে স্টেডিয়ামে জড়ো হয়েছেন প্রায় ৮৫ হাজার দর্শক।
লিওনেল মেসির আলবিসেলেস্তে অধ্যায়ের শেষ বিদায়ের শুরুটা হয়েছে চোখের জলে। ইজেইজা ট্রেনিং কমপ্লেক্স থেকে মনুমেন্টালের উদ্দেশে দলের বাস ছাড়ার সময় সেখানে ভিড় করেছিলেন অসংখ্য সমর্থক। প্রিয় দল ও প্রিয় খেলোয়াড়দের বিদায় জানাতে তাদের কণ্ঠে ছিল স্লোগান, হাতে ছিল পতাকা। সেই ভালোবাসার ঢেউ বাসের ভেতর থেকেও অনুভব করেছেন মেসি।
সমর্থকদের উচ্ছ্বাস আর ভালোবাসায় আবেগ ধরে রাখতে পারেননি আর্জেন্টাইন মহাতারকা। বাসের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে তার চোখে দেখা যায় জল।
সতীর্থ এমিলিয়ানো মার্টিনেজও সেই মুহূর্তের সাক্ষী। বাসের ভেতর থেকে সমর্থকদের বিপুল উপস্থিতির ছবি ও ভিডিও নিজের ইনস্টাগ্রাম স্টোরিতে প্রকাশ করেন তিনি।
এক ঘণ্টারও বেশি সময়ের যাত্রা শেষে দল পৌঁছে যায় রিভার প্লেটের ঐতিহাসিক মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে। একে একে বাস থেকে নামেন আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়েরা। মেসি নামেন শেষের দিকের একজন হিসেবে। মুখে তখন বড় হাসি, কিন্তু চোখেমুখে স্পষ্ট ছিল বিদায়ের আবেগ।
এরপর ড্রেসিংরুমে প্রবেশ করেন মেসি। কিছুক্ষণ পর আসে সেই প্রতীক্ষিত মুহূর্ত-মাঠে নামার সময়।
মাঠে পা রাখার আগে রিভার প্লেটের কোচ লুইস মার্টিনকে উষ্ণ আলিঙ্গন করেন মেসি। এরপর সতীর্থদের সঙ্গে শুরু করেন ওয়ার্ম-আপ। আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের খেলোয়াড় হিসেবে শেষবারের মতো অনুশীলনে নামেন তিনি।
ম্যাচ শুরুর আগে মেসিকে বিশেষ সম্মানে স্মরণ করে রিভার প্লেট। আর্জেন্টিনার সর্বোচ্চ গোলদাতার হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে ক্লাবটির সম্মানসূচক সদস্যপদের কার্ড। রিভার প্লেটের সভাপতি স্টেফানো ডি কার্লো নিজ হাতে মেসির হাতে তুলে দেন সম্মানসূচক সদস্যপদ কার্ড। সঙ্গে ছিল একটি স্মারক ক্রেস্ট এবং মেসির নাম খোদাই করা ক্লাবটির ঐতিহ্যবাহী ‘মানতো সাগ্রাদো’-পবিত্র জার্সি।
স্থানীয় সময় রাত ৮টায় খেলা শুরুর কথা থাকলেও ১৫ মিনিট পেছানো হয়। কিক-অফের আগে মাঠের কর্মীরা আর্জেন্টিনার একটি সুবিশাল ১০ নম্বর জার্সি মাঠে বিছিয়ে দেন। সেই জার্সিতে মেসির নামের জায়গায় লেখা রয়েছে ‘গ্রেসিয়াস’, যার অর্থ ধন্যবাদ।
পরিবারের সদস্যরা স্টেডিয়ামে উপস্থিত থাকলেও তিন ছেলে থিয়াগো, মাতেও ও সিরোকে নিয়ে মাঠে নামেন মেসি। মেসি মাঠে নামার সময় ছিল আতশবাজির ঝলকানি। গ্যালারির দর্শকেরা সুর মিলিয়ে গাইতে থাকেন- ‘এসো, এসো… আমার সাথে গাও… তুমি একজন বন্ধু পাবে… হাতে হাত রেখে… লিও মেসির সাথে… আমরা সবাই জয়ের আনন্দ উদযাপন করতে যাচ্ছি।’
এরপরই মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনার জাতীয় সংগীত পরিবেশন করেন ফাবিও সান্তানা। এ সময় মেসিকেও আবেগাপ্লুত দেখা যায়। অশ্রু দেখা কোচ লিওনেল স্কালোনির চোখেও।
জাতীয় সঙ্গীত শেষে কিক অফের ঠিক আগে মেসিকে সম্মান জানায় প্রতিপক্ষ বেনিন। দেশটির পক্ষ থেকে মেসির একটি ভাস্কর্য ও বেনিনের জার্সি মেসির হাতে তুলে দেয়া হয়।
খেলা শুরুর দশম মিনিটে মেসির সম্মানে খেলা থামিয়ে দেন রেফারি। এ সময় দর্শকর দুই মিনিট ধরে দাঁড়িয়ে হাততালি আর ‘ওলে ওলে মেসি’ স্লোগানে কিংবদন্তিকে অভিবাদন জানান। মাঠে থাকা খেলোয়াড়েরাও মেসির সঙ্গে হাত মিলিয়ে তাকে শুভেচ্ছা জানান। আর স্টেডিয়ামজুড়ে আরেক দফা দেখা যায় আতশবাজির ঝলকানি।
বেনিনের বিপক্ষে প্রথমার্ধে বেশকিছু আক্রমণ করেছে আর্জেন্টিনা। মেসিও সুযোগ তৈরি করেছেন। তবে গোলের দেখা মেলেনি। তাতে প্রথমার্ধ শেষ হয় গোল শূন্য সমতায়।
এভাবেই রচিত হল কিংবদন্তি অধ্যায়ের যবনিকা। এক পাশে ৮৫ হাজার মানুষের উচ্ছ্বাস, অন্য পাশে চোখের জল। সঙ্গে কোটি কোটি মানুষের ভালোবাসা আর দুই দশকেরও বেশি সময়ের অসংখ্য স্মৃতি।






