বাংলাদেশ

জনপ্রতিনিধি নাকি অ্যাকশন ছবির নায়ক? পিস্তলকাণ্ডে জয় থেকে ইশরাক

জনপ্রতিনিধি নাকি অ্যাকশন ছবির নায়ক? পিস্তলকাণ্ডে জয় থেকে ইশরাক

ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের রাজনীতিতে বক্তৃতা আছে, মিছিল আছে, স্লোগান আছে, আছে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার হাজারো বাগ্‌যুদ্ধ। তবে মাঝেমধ্যে এমন কিছু রাজনীতিকের আবির্ভাব ঘটে, যাদের কাছে মনে হয়, রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি কোমরে একটি পিস্তল থাকাও বিশেষ জরুরি। জনসেবার শপথ নেওয়ার পর কেউ কেউ যেন ভুলে যান, জনগণের প্রতিনিধি হওয়া আর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য হওয়া এক কথা নয়। তখন রাজনীতির মঞ্চে বক্তৃতার মাইক্রোফোনের পাশে জায়গা করে নেয় আগ্নেয়াস্ত্র। জনতার প্রশ্ন, জনপ্রতিনিধির হাতে ক্ষমতা থাকলেই কি পিস্তল দেখানোর ক্ষমতাও এসে যায়?

এই ধারাবাহিকতার সর্বশেষ আলোচিত চরিত্র মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। গত ১৭ অক্টোবর রাজধানীর গেন্ডারিয়ার দয়াগঞ্জ রেলগেট এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে তার অংশ নেওয়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে দেখা যায়, এক হাতে হ্যান্ডমাইকের মাউথপিস, অন্য হাতে পিস্তল নিয়ে কয়েকজনকে ধাওয়া করছেন তিনি। তার মুখে দাঁড়ানোর নির্দেশ, হাতে আগ্নেয়াস্ত্র। দৃশ্যটি দেখে প্রশ্ন জাগতে পারে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব জনপ্রতিনিধি নিজেই তুলে নিয়েছেন?

অবশ্য ইশরাকের নিজের ব্যাখ্যা ভিন্ন। তার দাবি, মাদকবিরোধী সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে গিয়ে সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় আত্মরক্ষার জন্য সতর্কতার সঙ্গে অস্ত্র প্রদর্শন করেছেন তিনি। কিন্তু আত্মরক্ষার যুক্তি আর প্রকাশ্যে অস্ত্র তাক করার আইনি গ্রহণযোগ্যতা এক বিষয় নয়। ঢাকা মহানগর পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনায় আইনের ব্যত্যয় ঘটেছে কি না, তা তদন্ত করা হচ্ছে। তবে পিস্তলকাণ্ডে শেষ পর্যন্ত মন্ত্রিত্বই হারালেন ইশরাক হোসেন।

ইশরাকের ঘটনাকে অবশ্য বাংলাদেশের রাজনীতিতে একেবারে নতুন আবিষ্কার বলা যাবে না। জনপ্রতিনিধির হাতে পিস্তল দেখার অভিজ্ঞতা এ দেশের মানুষের আগেও হয়েছে। কখনো ফুটবল মাঠে, কখনো রাজনৈতিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে, কখনো নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতার উত্তাপে।

যেমন সাবেক যুব ও ক্রীড়া উপমন্ত্রী আরিফ খান জয়। একসময় জাতীয় ফুটবল দলের অধিনায়ক ছিলেন। মাঠে তার কাজ ছিল বল সামলানো, আক্রমণ ঠেকানো, গোলের সুযোগ তৈরি করা। পরে রাজনীতিতে এসে উপমন্ত্রী হওয়ার পর তার বিরুদ্ধে খেলার মাঠে পিস্তল নিয়ে ঢুকে রেফারিকে শাসানোর অভিযোগ ওঠে। প্রথম আলোর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে তার বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগের সঙ্গে এই ঘটনাও উঠে আসে। ভাবা যায়, যে দেশের ফুটবল রেফারিদের এমনিতেই দর্শক, খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাদের অসন্তোষ সামলাতে হয়, সেখানে একজন সাবেক ফুটবলারের বিরুদ্ধেই পিস্তল নিয়ে রেফারিকে শাসানোর অভিযোগ! ফুটবলের নিয়মবইয়ে হলুদ কার্ড, লাল কার্ড আছে; পিস্তলের জন্য কোনো কার্ড বরাদ্দ নেই।

আরিফ খান জয়

জয়ের বিরুদ্ধে অবশ্য অভিযোগ শুধু ফুটবল মাঠেই সীমাবদ্ধ ছিল না। মন্ত্রণালয়ে ভাঙচুর, পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে অসদাচরণসহ নানা ঘটনায় তার নাম এসেছিল সংবাদমাধ্যমে। আশুলিয়ায় এক পুলিশ কর্মকর্তাকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে সাধারণ ডায়েরিও হয়েছিল। ফলে ফুটবল মাঠ থেকে রাজনীতির মাঠে এসে তার ক্যারিয়ারে বিতর্কের কমতি হয়নি। মাঠে খেলোয়াড় থাকাকালে রেফারির সিদ্ধান্ত মানতে হতো, কিন্তু ক্ষমতার মাঠে এসে রেফারিকেই শাসানোর অভিযোগ উঠেছিল তার বিরুদ্ধে।

আর পিস্তলের রাজনীতির ইতিহাসে ক্যাপ্টেন (অব.) গিয়াস উদ্দিন আহমেদের নাম তো রীতিমতো আলাদা অধ্যায়ের দাবি রাখে। ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ের সাবেক এই আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্য একসময় ‘পিস্তল এমপি’ হিসেবেই পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন। ২০১২ সালের মে মাসে গফরগাঁওয়ের কান্দিপাড়া বাজারে তার গাড়িকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি হয়। অভিযোগ ওঠে, ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি নিজের আগ্নেয়াস্ত্র থেকে গুলি ছোড়েন। তবে গিয়াসের দাবি ছিল, একদল সশস্ত্র লোক তার গাড়িতে হামলা চালালে জীবন বাঁচাতে তিনি ফাঁকা গুলি ছুড়েছিলেন। অর্থাৎ ঘটনার ব্যাখ্যা ছিল আত্মরক্ষা, কিন্তু রাজনৈতিক পরিচিতি হয়ে গেল ‘পিস্তল এমপি’। এমন উপাধি নির্বাচনের পোস্টারে লেখা না থাকলেও মানুষের মুখে মুখে ছড়াতে বেশি সময় লাগে না।

গিয়াসের ঘটনা আর ইশরাকের সাম্প্রতিক ঘটনা পাশাপাশি রাখলে একটি চমৎকার রাজনৈতিক মিল পাওয়া যায়। দুজনের ঘটনাতেই আত্মরক্ষার যুক্তি সামনে এসেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, জনপ্রতিনিধির নিরাপত্তার জন্য রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা থাকার পরও কেন জনসমক্ষে অস্ত্র ব্যবহার বা প্রদর্শনের প্রয়োজন পড়ে? আর যদি এমন পরিস্থিতি সত্যিই তৈরি হয়, তবে সেই পরিস্থিতির আইনি মূল্যায়ন করবে কে? সংশ্লিষ্ট রাজনীতিক নিজে, নাকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী? বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে প্রশ্নটি পুরোনো, কিন্তু উত্তর যেন বারবার নতুন করে খুঁজতে হয়।

তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্ত্রকাণ্ডের সবচেয়ে গুরুতর অধ্যায়গুলোর একটি জড়িয়ে আছে সাবেক আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্য ডা. এইচবিএম ইকবালের নামের সঙ্গে। ২০০১ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর মালিবাগে বিএনপির মিছিলে গুলির ঘটনায় চারজন নিহত হন। পরদিন সংবাদপত্রে মিছিলের ভেতর থেকে পিস্তল দিয়ে গুলি করার ছবি প্রকাশিত হয়েছিল। ওই মামলায় ইকবালসহ ২৪ জনের বিরুদ্ধে ২০০২ সালে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর ২০২৪ সালের নভেম্বরে হাইকোর্ট ইকবাল ও আরও ১৪ জনকে অব্যাহতি দেওয়ার আদেশ স্থগিত করে বিচারিক আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেন।


ইকবালের ঘটনা মনে করিয়ে দেয়, রাজনৈতিক পিস্তলকাণ্ড সব সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের হাসিঠাট্টায় শেষ হয় না। কখনো তার পরিণতি হয় প্রাণহানি, মামলা, বিচার এবং বছরের পর বছর ধরে চলা আইনি লড়াই। ইশরাকের ভিডিও বা জয়ের বিরুদ্ধে মাঠে পিস্তল দেখানোর অভিযোগ নিয়ে রসিকতা করা গেলেও মালিবাগের ঘটনাটি সেই সুযোগ দেয় না। কারণ সেখানে পিস্তল আর রাজনৈতিক দাপটের আলোচনার আড়ালে রয়েছে চারটি প্রাণ হারানোর ইতিহাস।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে অবশ্য অস্ত্রের সঙ্গে ক্ষমতার সম্পর্ক নতুন নয়। স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক সহিংসতা, দলীয় কোন্দল, নির্বাচনী সংঘাত এবং প্রভাব বিস্তারের ঘটনায় আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার আলোচনায় এসেছে। সর্বশেষ জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের সময় রক্তগঙ্গা বইয়ে দেওয়ার সময় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে জনপ্রতিনিধিদেরও দেখা গেছে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সভায় প্রায়ই নেতাদের বলতে শোনা যায়, জনগণই তাদের শক্তির উৎস। কিন্তু কিছু ঘটনায় মনে হয়, সেই শক্তির উৎসের পাশাপাশি ব্যক্তিগত আগ্নেয়াস্ত্রের ওপরও বিশেষ আস্থা রাখা হচ্ছে। জনগণের ভালোবাসা, দলীয় কর্মীদের সমর্থন, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা; সবকিছু থাকার পরও পিস্তল কেন এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, সেটিই প্রশ্ন।

ইশরাকের সাম্প্রতিক ঘটনায় আবার সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে। তিনি যে উদ্দেশ্যেই গেন্ডারিয়ায় গিয়ে থাকুন, প্রকাশ্যে অস্ত্র হাতে তার উপস্থিতি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। মাদক প্রতিরোধ নিঃসন্দেহে জরুরি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনের পদ্ধতিও আইনের মধ্যে থাকতে হবে। জনপ্রতিনিধি যদি নিজেই অভিযান পরিচালনা করেন, অস্ত্র প্রদর্শন করেন এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ধাওয়া করেন, তাহলে পুলিশ ও জনপ্রতিনিধির দায়িত্বের সীমানা কোথায়; এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

জয় থেকে গিয়াস, আর সর্বশেষ ইশরাক; সব ঘটনাকে একই মাত্রায় বিচার করা যায় না। কোথাও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত অভিযোগ, কোথাও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির স্বীকার করা গুলি ছোড়ার ঘটনা, কোথাও কথিত অডিওকে ঘিরে বিতর্ক, কোথাও প্রাণহানির মামলা, আবার কোথাও ভাইরাল ভিডিও। প্রত্যেকটির আইনি অবস্থান ও প্রমাণের মাত্রা আলাদা। কিন্তু সবগুলোর মধ্যে একটি সাধারণ সূত্র আছে: রাজনীতিতে আগ্নেয়াস্ত্রের উপস্থিতি এবং তা ঘিরে ক্ষমতার প্রদর্শন ও জবাবদিহির প্রশ্ন।

গণতান্ত্রিক রাজনীতির সৌন্দর্য হওয়ার কথা যুক্তিতে, বিতর্কে, জনগণের আস্থায়। পিস্তল সেই সৌন্দর্যের অলংকার হতে পারে না। লাইসেন্স থাকা মানে যেমন প্রকাশ্যে অস্ত্র দিয়ে ভয় দেখানোর অবাধ অনুমতি নয়, তেমনি জনপ্রতিনিধি হওয়া মানে পুলিশের দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকারও নয়।

রাজনীতিকদের হাতে কলম, আইন, নীতি ও জনগণের দেওয়া ক্ষমতাই যথেষ্ট হওয়ার কথা। কিন্তু ইতিহাসের এসব ঘটনা দেখে মনে হয়, কেউ কেউ ক্ষমতার সেই অদৃশ্য শক্তির ওপর পুরোপুরি ভরসা করতে পারেন না। তারা মাঝে মাঝে দৃশ্যমান শক্তির প্রদর্শনও জরুরি মনে করেন।

প্রশ্ন হলো, পিস্তল দেখিয়ে কি মানুষের আস্থা অর্জন করা যায়? ভয় দেখিয়ে কি সম্মান আদায় করা যায়? আর জনসেবার নামে অস্ত্র প্রদর্শন করলে তা কি সত্যিই জনসেবা থাকে? আর তখন জনতার মনে প্রশ্ন জাগে: আমরা ভোট দিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচন করছি, নাকি অ্যাকশন ছবির নায়ক?

পার্থক্য একটাই। সিনেমায় দৃশ্য শেষ হলে পর্দা নামে, দর্শক বাড়ি ফেরেন। বাস্তবের রাজনীতিতে পর্দা নামলেও ঘটনাগুলোর পরিণতি জনগণকেই বহন করতে হয়।

বিষয়:অ্যাকশন ছবির নায়ক আরিফ খান জয় ইশরাক হোসেন ক্যাপ্টেন (অব.) গিয়াস উদ্দিন আহমেদ জনপ্রতিনিধি পিস্তলকাণ্ড

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…