বাংলাদেশ ক্রিকেটের পথিকৃৎ আকরাম খানকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা
৫৮ বছর পূর্ণ করলেন

বাংলাদেশ ক্রিকেটের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় নাম আকরাম খান। নব্বইয়ের দশকে দেশের ক্রিকেটকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিত করে তোলার পেছনে যাদের অবদান সবচেয়ে বেশি, তিনি তাদের অন্যতম। বিশেষ করে ১৯৯৭ সালে মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে অনুষ্ঠিত আইসিসি ট্রফিতে তার নেতৃত্বে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক শিরোপা জয় দেশের ক্রিকেটের গতিপথ বদলে দিয়েছিল। সেই সাফল্যের হাত ধরে ১৯৯৯ সালে প্রথমবার ওয়ানডে বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে বাংলাদেশ। দেশের ক্রিকেটের সেই স্বপ্নসারথি, জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক আকরাম খানের জন্মদিন আজ। জীবনের ৫৮ বছর পূর্ণ করলেন তিনি।
১৯৯৭ সালে আইসিসি ট্রফি জিতে দেশে ফেরার পর তৎকালীন প্রধান বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কাছ থেকেও সংবর্ধনা পেয়েছিল বাংলাদেশ দল। হোটেল পূর্বানীতে ফুলেল শুভেচ্ছা জানানোর পাশাপাশি মিন্টো রোডের কার্যালয়ে ক্রিকেটারদের আমন্ত্রণ জানিয়ে উপহার ও নৈশভোজের আয়োজন করেছিলেন তিনি। রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের ক্রিকেটের ঐতিহাসিক সাফল্যকে উদযাপনের সেই স্মৃতি আজও মনে রেখেছেন আকরাম খান।
১৯৬৮ সালের ১ নভেম্বর চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী খান পরিবারে জন্ম মোহাম্মদ আকরাম হুসেইন খানের। ক্রিকেটীয় আবহে বেড়ে ওঠা আকরাম বাংলাদেশের ক্রিকেটে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন একজন নির্ভরযোগ্য মিডলঅর্ডার ব্যাটার হিসেবে। জাতীয় দলের সাবেক দুই তারকা ওপেনার তামিম ইকবাল ও নাফিস ইকবালের চাচা তিনি।

১৯৮৮ সালের ২৯ অক্টোবর নিজ শহর চট্টগ্রামের এমএ আজিজ স্টেডিয়ামে পাকিস্তানের বিপক্ষে ওয়ানডে ক্রিকেট দিয়ে আন্তর্জাতিক অভিষেক আকরামের। অভিষেকে ৩৫ বলে ২১ রানের অপরাজিত ইনিংস খেললেও জয় পায়নি বাংলাদেশ। পরবর্তী সময়ে ব্যাট হাতে দলের নির্ভরতার প্রতীক হয়ে ওঠেন।
১৯৯৪ সালে আইসিসি ট্রফিতে বাংলাদেশের ব্যর্থতার পর অধিনায়কের দায়িত্ব পান আকরাম খান। তার নেতৃত্বে ১৯৯৭ সালে মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত আইসিসি ট্রফিতে ইতিহাস গড়ে বাংলাদেশ। বিশেষ করে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে ১৪১ রানের লক্ষ্যে খেলতে নেমে বিপর্যয়ে পড়ে দল। কঠিন সেই পরিস্থিতিতে ৬৮ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেলে জয়ের বন্দরে পৌঁছে দেন অধিনায়ক আকরাম। তার সেই সাহসী ব্যাটিং আজও বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায়।

আইসিসি ট্রফির ফাইনালে কেনিয়াকে হারিয়ে প্রথমবার আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের শিরোপা জেতে বাংলাদেশ। একইসঙ্গে নিশ্চিত হয় ১৯৯৯ সালের বিশ্বকাপে খেলার টিকিট। দেশের ক্রিকেটকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেয়া সেই ঐতিহাসিক অর্জনের অন্যতম প্রধান কারিগর ছিলেন আকরাম।
পরে ১৯৯৯ সালে আমিনুল ইসলাম বুলবুলের নেতৃত্বে প্রথমবার বিশ্বকাপে অংশ নেয় বাংলাদেশ। সেই বিশ্বকাপে পাকিস্তান ও স্কটল্যান্ডকে হারিয়ে সামর্থ্যের জানান দেয় টাইগাররা। এর পরপরই ২০০০ সালের ১০ নভেম্বর ভারতের বিপক্ষে ঢাকায় বাংলাদেশের অভিষেক হয় টেস্ট ক্রিকেটে। দেশের প্রথম টেস্ট ম্যাচেও একাদশে ছিলেন আকরাম। প্রথম ইনিংসে পাঁচ নম্বরে ব্যাট করতে নেমে করেন ৩৫ রান।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ২০০৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন এ কিংবদন্তি। ক্যারিয়ারে ৮টি টেস্ট ও ৪৪টি ওয়ানডে খেলেছেন। ওয়ানডেতে ৯৭৬ রানের পাশাপাশি পাঁচটি অর্ধশতক রয়েছে। সর্বোচ্চ ইনিংস ৬৫ রানের। টেস্টে ১৬ ইনিংসে করেছেন ২৫৯ রান। সর্বোচ্চ ৪৪।
ঘরোয়া ক্রিকেটে সমৃদ্ধ ছিল আকরামের ক্যারিয়ার। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ৪৩ ম্যাচে দুটি সেঞ্চুরি ও ১০টি অর্ধশতকে করেছেন ২,১১৭ রান। সর্বোচ্চ অপরাজিত ১২৯। লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটে ৯৫ ম্যাচে ২,১৯২ রান করেছেন। রয়েছে ১২টি অর্ধশতক। সর্বোচ্চ ইনিংস ৮২ রানের। সবধরনের ক্রিকেট মিলিয়ে বল হাতে তার উইকেটসংখ্যা একটি। ২০০৫ সালে চট্টগ্রাম বিভাগের হয়ে বরিশাল বিভাগের বিপক্ষে খেলেন ক্যারিয়ারের শেষ ঘরোয়া ম্যাচ।
খেলোয়াড়ি জীবন শেষে দেশের ক্রিকেটের উন্নয়নে যুক্ত হন আকরাম। ২০০৭ সালে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) নির্বাচক হিসেবে দায়িত্ব নেন। সেবছর সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকোর অনুরোধে তখনকান ক্রিকেট বোর্ডের নির্বাচক হিসেবে যোগ দেন। ২০১১ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপের পর প্রধান নির্বাচকের দায়িত্ব পান তিনি। ২০১২ সালে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিলেও পরে প্রত্যাহার করেন। ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে বিসিবি পরিচালক পদে নির্বাচনে অংশ নেয়ার লক্ষ্যে প্রধান নির্বাচকের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ান। পরে বিসিবির পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন দীর্ঘসময়।

২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যুর পর তার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গুলশানে বিএনপি চেয়ারপার্সনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে যান আকরাম। সেখানে রাখা শোকবইয়ে স্বাক্ষর করেন জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক। ক্রীড়া সংগঠক কোকোর মৃত্যুতে শোক জানাতে সেদিন আরও কয়েকজন সাবেক ক্রিকেটার সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন।
বাংলাদেশের ক্রিকেট যখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে শুরু করেছিল, তখন নেতৃত্ব-সাহস ও পারফরম্যান্স দিয়ে সেই পথকে মসৃণ করেছিলেন আকরাম। বিশেষ করে ১৯৯৭ সালের আইসিসি ট্রফির সাফল্যের সঙ্গে তার নাম জড়িয়ে থাকবে বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে। দেশের ক্রিকেটের সেই পথিকৃৎ আকরাম খান আজ ৫৯ বছরে পা রাখলেন।
শুভ জন্মদিন আকরাম খান।






