অপরাধ

আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ১১ অভিযোগ, অন্তর্বর্তী সরকারের আরও কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন

আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ১১ অভিযোগ, অন্তর্বর্তী সরকারের আরও কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন

ছবি: সংগৃহীত

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এর মধ্য দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন দুর্নীতি, নিয়োগ-বাণিজ্য, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অর্থপাচারের অভিযোগও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) এক সংবাদ সম্মেলনে দুদকের উপপরিচালক আকতারুল ইসলাম আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের বিষয়টি জানান। দুদক সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে ১১টি অভিযোগ জমা পড়েছে।

এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে সরকারি কর্মকর্তাদের বদলি ও পদায়ন, নিয়োগ ও পদোন্নতি, উন্নয়ন প্রকল্পে কমিশন, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অর্থ লেনদেন, ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নিয়োগ এবং বিদেশে সম্পদ রাখার মতো বিষয়।

তবে অভিযোগ জমা পড়া এবং অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে নথিপত্র, ব্যাংক হিসাব, অর্থ লেনদেনের তথ্য ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পর্যালোচনা করতে হবে।

নিয়োগ-বদলিতে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ

আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের একটি অংশ যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতি ঘিরে। অভিযোগ অনুযায়ী, মন্ত্রণালয়ের অধীন ৩৮ উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে নতুন কর্মস্থলে পদায়নের বিনিময়ে ৭৬ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে।

একই অভিযোগে ১৫০ সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার পদোন্নতির জন্য দেড় কোটি টাকা এবং পদোন্নতির পর পছন্দের কর্মস্থলে পদায়নের জন্য আরও ২ কোটি টাকা নেওয়ার দাবি করা হয়েছে।

দুদকের অনুসন্ধানে এসব অর্থের উৎস ও গন্তব্য, কার মাধ্যমে অর্থ লেনদেন হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট বদলি ও পদোন্নতির নথিতে কোনো অনিয়ম ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হতে পারে।

উন্নয়ন প্রকল্পে কমিশনের অভিযোগ

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকার সময় উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দ থেকে ২৫ শতাংশ অর্থ উপদেষ্টাকে দিতে হতো, এমন অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, কথিত প্রেস সেক্রেটারি মাহফুজ আলম এই কমিশন-সংক্রান্ত কার্যক্রম তদারক করতেন।

অভিযোগটি যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের অনুমোদন, বরাদ্দ, ঠিকাদার নির্বাচন, বিল পরিশোধ ও অর্থ ছাড়ের নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার টেন্ডার নিষ্পত্তি হয়েছে। এসব টেন্ডারে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন নেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।

ওয়াসার এমডি নিয়োগেও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ

ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে আব্দুস সালামের নিয়োগ নিয়েও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এই নিয়োগের জন্য মোট ১০ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছিল। এর মধ্যে ৮ কোটি টাকা দুবাইয়ের আল-আনসারি মানি এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে পাঠানো এবং ২ কোটি টাকা নগদ দেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।

অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে ব্যাংক হিসাব, বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আর্থিক বিবরণী ও যোগাযোগের তথ্য পরীক্ষা করা হতে পারে।

ডিএনসিসির প্রশাসক নিয়োগ নিয়েও অভিযোগ

২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি মোহাম্মদ এজাজকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। এই নিয়োগের ক্ষেত্রেও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, ২০ কোটি টাকা নগদ এবং সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে নিয়মিত ১০ শতাংশ কমিশনের শর্তে নিয়োগটি দেওয়া হয়েছিল। পরে এজাজের বিরুদ্ধে পশুর হাট ইজারা, ই-রিকশা প্রকল্প, সম্পত্তি ও দোকান বরাদ্দসহ বিভিন্ন বিষয়ে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে।

ডিসি নিয়োগে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ

সরকারি কর্মকর্তাদের পদায়ন নিয়েও আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, সারাদেশে জেলা প্রশাসক নিয়োগের ক্ষেত্রে তিনি ৪৮টি ডিও লেটার দিয়েছিলেন। এর মধ্যে ৩৬ জনকে পরে ডিসি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

জেলা অনুযায়ী ডিসি পদায়নে ২ কোটি থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

এসব অভিযোগ যাচাইয়ে কোন কর্মকর্তার পক্ষে কখন ডিও লেটার দেওয়া হয়েছে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা কীভাবে নির্বাচিত হয়েছেন এবং তাদের আর্থিক অবস্থায় অস্বাভাবিক পরিবর্তন ঘটেছে কি না, তা পর্যালোচনা করা যেতে পারে।

বিদেশে সম্পদ ও বিনিয়োগের দাবিও আলোচনায়

আসিফ মাহমুদের ব্যাংক হিসাব প্রকাশের পর তার সম্পদ নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা শুরু হয়। পরে ক্রিপ্টোকারেন্সি, দুবাইয়ে বিনিয়োগ ও সুইজারল্যান্ডে ব্যাংক হিসাব থাকার দাবিও সামনে আসে। এসব দাবির সত্যতা এখনো আলাদাভাবে প্রমাণিত নয়।

তাই দেশি-বিদেশি সম্পদের উৎস যাচাইয়ের ক্ষেত্রে সম্পদ বিবরণী, আয়কর নথি, ব্যাংক হিসাব ও সংশ্লিষ্ট আর্থিক তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

ইউনূসের কর্মকাণ্ড নিয়েও প্রশ্ন

আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান শুরুর পর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কর্মকাণ্ড নিয়েও তদন্তের দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।

গ্রামীণ-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিদেশি বিনিয়োগ, সরকারি অনুমোদন ও বিভিন্ন সুবিধা পাওয়ার বিষয়েও অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগের একটি অংশে দাবি করা হয়েছে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের জুনের মধ্যে ফ্রান্সের গ্রামীণ ক্রেডিট এগ্রিকল ফাউন্ডেশনে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা নতুন বিনিয়োগ হয়েছে। একই সময়ে গ্রামীণ আমেরিকায় প্রায় ১২০ কোটি টাকার বিনিয়োগ বাড়ার কথাও বলা হয়েছে।

এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাঠানোর অনুমোদন ছিল কি না, অর্থের উৎস কী এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের হিসাবপত্রে অর্থের উৎস কীভাবে দেখানো হয়েছে, তা যাচাইয়ের বিষয় হতে পারে।

গ্রামীণ ইউনিভার্সিটির অনুমোদন, গ্রামীণ এমপ্লয়মেন্ট সার্ভিসেসের জনশক্তি রপ্তানি লাইসেন্স ও গ্রামীণ টেলিকমের ডিজিটাল ওয়ালেট চালুর অনুমোদন নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এ ছাড়া গ্রামীণ ব্যাংকের কর সুবিধা এবং ব্যাংকে সরকারের শেয়ারের হার ২৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েও অভিযোগ রয়েছে।

আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধেও অভিযোগ

আইন উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন অভিযোগ সামনে আসে। এর মধ্যে নিবন্ধন অধিদপ্তরের সাব-রেজিস্ট্রার বদলি অন্যতম।

অভিযোগকারীদের দাবি, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রায় ১৮ মাসে নিবন্ধন অধিদপ্তরের ৪০৩ জন সাব-রেজিস্ট্রারের মধ্যে ২৮২ জনকে বদলি করা হয়। তাদের মধ্যে প্রায় ২০০ জন অর্থের বিনিময়ে পছন্দের কর্মস্থলে বদলি হয়েছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

ভালো কর্মস্থলে বদলির জন্য ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত এবং সাধারণ বদলির ক্ষেত্রে ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেনের দাবিও রয়েছে।

এ ছাড়া ২০২৫ সালের ২ জুন দেশের বিভিন্ন আদালতের ২৫২ বিচারককে একযোগে বদলি করা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। বদলির পেছনে আর্থিক লেনদেনের চক্র কাজ করেছে এবং এর সঙ্গে আসিফ নজরুলের সম্পৃক্ততা ছিল বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক নথি, বদলির সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া এবং আর্থিক লেনদেনের তথ্য পরীক্ষা প্রয়োজন।

রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স নিয়েও প্রশ্ন

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকার সময় নতুন রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স অনুমোদন নিয়েও অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, ওই সময়ে ২৫২টি নতুন প্রতিষ্ঠানকে রিক্রুটিং লাইসেন্স দেওয়া হয়। এসব প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণ করেছিল কি না, লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো প্রভাব বা আর্থিক লেনদেন ছিল কি না, তা তদন্তের বিষয় হতে পারে।

আরও কয়েকজন সাবেক উপদেষ্টাকে ঘিরে অভিযোগ

সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ও তার স্বামী আবু বকর সিদ্দিকীকেও ঘিরে বিভিন্ন অভিযোগ সামনে এসেছে। তাদের সম্পদ ও অর্থনৈতিক লেনদেন নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

এ ছাড়া মোস্তফা সরয়ার ফারুকী, নুরজাহান বেগম ও আদিলুর রহমান খানের বিরুদ্ধেও দুদকে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। অভিযোগ থাকলেই অপরাধ প্রমাণিত হয় না। আবার অভিযোগ থাকলে তার সত্যতা যাচাইয়ে তদন্ত করাও প্রয়োজন।

আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান শুরু হওয়ায় অন্তর্বর্তী সরকারের পুরো সময়ের দুর্নীতির অভিযোগগুলো একইভাবে যাচাই করা হবে কি না, সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় নয়, তদন্তের ভিত্তি হওয়া উচিত তথ্য ও প্রমাণ। অভিযোগ সত্য হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং পর্যাপ্ত প্রমাণ না মিললে অভিযোগ থেকে দায়মুক্তি দেওয়াই জবাবদিহির স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।

বিষয়:অন্তর্বর্তী সরকার উপদেষ্টা দুর্নীতির অভিযোগ

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…