বাংলাদেশ

ভাঙচুর-দখলের ধারাবাহিকতা: ‘নরমাল ইন বাংলাদেশ’ হয়ে উঠছে কি?

ভাঙচুর-দখলের ধারাবাহিকতা: ‘নরমাল ইন বাংলাদেশ’ হয়ে উঠছে কি?

রাজধানীতে পরপর কয়েকটি হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও দখলের অভিযোগ নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কি এমন এক পর্যায়ে যাচ্ছে, যেখানে সংঘবদ্ধভাবে কোনো স্থাপনা বা সম্পত্তিতে হামলা চালানোও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হচ্ছে?

মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে রাজধানীর চারটি ঘটনায় একই ধরনের কিছু উপাদান চোখে পড়েছে। কোথাও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, কোথাও জমি দখলের চেষ্টা হয়েছে, কোথাও রাজনৈতিক দলের কার্যালয় ঘেরাও করে বিপুলসংখ্যক মানুষকে আটক করা হয়েছে, আবার কোথাও ব্যক্তিমালিকানাধীন স্টুডিওতে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করা হয়েছে।

ঘটনাগুলোর পেছনের কারণ এক নয়। প্রতিটি ঘটনার তদন্তও এখনো শেষ হয়নি। তবে সংঘবদ্ধ হামলা, রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ এবং পুলিশের ভূমিকা—এই তিনটি বিষয় প্রায় প্রতিটি ঘটনাকেই আলাদা গুরুত্ব দিয়েছে।

মিরপুর-১-এর রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলার ঘটনাটি শুরুতেই ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। অভিযোগ অনুযায়ী, মুখোশধারী একটি বড় দল গভীর রাতে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রবেশ করে। নিরাপত্তাকর্মীদের জিম্মি করার পর সেখানে লুটপাট ও ভাঙচুর চালানো হয়। পরে ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে স্থাপনাটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।

ঘটনাটির গুরুত্ব আরও বেড়ে যায় এ কারণে যে, সেখানে সরকারি উদ্যোগে হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি চালুর প্রস্তুতি চলছিল।

পরে ওই স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ধ্বংসাবশেষের মধ্যেই টিকাদান কার্যক্রম চালাতে হয়। শিশুদের নিয়ে আসা অভিভাবকদের দুর্ভোগের চিত্রও সামনে আসে। একটি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, যেখানে শিশুদের টিকা দেওয়ার কথা, সেটিই যদি সংঘবদ্ধ হামলার শিকার হয়, তাহলে জননিরাপত্তা ও সরকারি সেবার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

এর পরদিন মোহাম্মদপুরের বেড়িবাঁধ এলাকায় জমি দখলের চেষ্টা ও ভাঙচুরের অভিযোগ সামনে আসে। সেখানে বিপুলসংখ্যক মানুষ একটি জায়গায় প্রবেশ করে স্থাপনা ভাঙচুর এবং দখলের চেষ্টা করেছে বলে অভিযোগ করা হয়।

জমির মালিকানা নিয়ে পক্ষগুলোর মধ্যে বিরোধ রয়েছে। ফলে এ ঘটনার প্রকৃত কারণ ও দায় নির্ধারণে তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে। তবে জমি-সংক্রান্ত বিরোধ মেটাতে আইনগত প্রক্রিয়ার পরিবর্তে সংঘবদ্ধ লোকজন ব্যবহার করা হলে তা আইনশৃঙ্খলার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করে।

একই সময় গুলিস্তানে জাসদের কেন্দ্রীয় কার্যালয় ঘেরাও এবং সেখান থেকে বিপুলসংখ্যক ব্যক্তিকে আটক করার ঘটনা ঘটে।

পুলিশের ভাষ্য, কার্যালয়ে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের উপস্থিতির তথ্য পাওয়ার পর তারা সেখানে অভিযান চালায়। অন্যদিকে জাসদের পক্ষ থেকে এটিকে দলীয় সভা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঘটনাটির আরেকটি দিকও গুরুত্বপূর্ণ। একটি রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে রাজনৈতিক কর্মসূচি চলাকালে অন্য একটি রাজনৈতিক পক্ষের লোকজন সেখানে প্রবেশ বা ঘেরাও করলে পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে পুলিশের ভূমিকা হওয়া উচিত আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা এবং সংশ্লিষ্ট সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

একই রাতে ইসিবি চত্বরের নিউগিনি প্রপার্টিজে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।

সালমান তাঁর প্রকাশিত ভিডিওতে স্টুডিওর ক্ষয়ক্ষতির চিত্র তুলে ধরেন। এ ঘটনায় জমি-সংক্রান্ত বিরোধের বিষয়টি সামনে এসেছে। পুলিশের পক্ষ থেকেও ঘটনাটিকে জমি-সংক্রান্ত বিরোধের সঙ্গে যুক্ত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে এসব ঘটনায় কারা হামলা চালিয়েছে, তাদের উদ্দেশ্য কী ছিল এবং কোনো রাজনৈতিক পক্ষ সরাসরি জড়িত ছিল কি না—এসব প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর তদন্ত শেষ হওয়ার পরই পাওয়া সম্ভব।

ঘটনাগুলোকে একসঙ্গে দেখলে একটি বিষয় স্পষ্ট—আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

জমি নিয়ে বিরোধ থাকলে আদালত ও প্রশাসনের মাধ্যমে সমাধানের সুযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক বিরোধ থাকলে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া রয়েছে। কোনো স্থাপনা নিয়ে বিরোধ থাকলেও তার আইনি সমাধানের পথ আছে।

কিন্তু কোনো বিরোধের সমাধান যদি শত শত মানুষ জড়ো করে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট বা দখলের মাধ্যমে করার চেষ্টা হয়, তাহলে সেটি শুধু একটি ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক বিরোধ থাকে না; জননিরাপত্তার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

এই ঘটনাগুলোতে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। কোথাও পুলিশের উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও হামলা ঠেকানো যায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। আবার কোনো ঘটনায় পুলিশ দ্রুত অভিযান চালিয়ে বিপুলসংখ্যক মানুষকে আটক করেছে।

পুলিশের এই ভিন্ন ভিন্ন ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার কারণও এখানেই। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে একই ধরনের মানদণ্ড সবার জন্য প্রযোজ্য কি না, সেটি গুরুত্বপূর্ণ।

কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর রাজনৈতিক পরিচয় যা-ই হোক, হামলা, ভাঙচুর, দখল বা বেআইনি সমাবেশের অভিযোগ থাকলে তদন্তের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একইভাবে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কাউকে ঢালাওভাবে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করাও ন্যায়সংগত নয়।

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক সম্ভবত এখানেই। জমি, ভবন কিংবা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান—বিরোধের ধরন আলাদা হলেও সংঘবদ্ধ শক্তি ব্যবহার করে দখল নেওয়ার অভিযোগ বারবার সামনে আসছে।

এ ধরনের ঘটনা যদি অপরাধীদের কাছে একটি বার্তা দেয় যে বিপুলসংখ্যক লোক জড়ো করে হামলা চালালেও দ্রুত ও কার্যকর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, তাহলে ভবিষ্যতে একই কৌশল আরও ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

আর রাজনৈতিক প্রভাব বা ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের ছত্রচ্ছায়ার অভিযোগ যদি তদন্তে সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে বিষয়টি আরও গুরুতর। কারণ তখন শুধু অপরাধী নয়, অপরাধ সংঘটনে সহায়তা বা প্রশ্রয় দেওয়া ব্যক্তিদের ভূমিকাও তদন্তের আওতায় আসা প্রয়োজন।

‘নরমাল ইন বাংলাদেশ’—একটি বিপজ্জনক বাক্য
সালমান মুক্তাদির তাঁর ধ্বংস হয়ে যাওয়া স্টুডিওর সামনে দাঁড়িয়ে ব্যঙ্গাত্মকভাবে বলেছেন, ‘দিস ইজ নরমাল ইন বাংলাদেশ।’

কথাটি হয়তো একটি ব্যক্তিগত ক্ষোভ ও হতাশার প্রকাশ। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর প্রেক্ষাপটে এই বাক্যটি আরও বড় একটি প্রশ্ন সামনে আনে—আইন ভেঙে সংঘবদ্ধ হামলা ও দখল কি ধীরে ধীরে এমন কিছু হয়ে উঠছে, যাকে মানুষ অনিবার্য বাস্তবতা হিসেবে মেনে নিতে শুরু করবে?

কোনো রাষ্ট্রের জন্য এর চেয়ে বিপজ্জনক স্বাভাবিকীকরণ খুব কমই হতে পারে।

কারণ নাগরিক যখন মনে করেন, তাঁর সম্পত্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা নিরাপত্তা রক্ষায় রাষ্ট্রের সক্ষমতা অনিশ্চিত, তখন রাষ্ট্রের প্রতি আস্থাও দুর্বল হতে শুরু করে। আর সেই জায়গা দখল করে ভয়, অনিশ্চয়তা ও নিজস্ব শক্তির ওপর নির্ভরতার প্রবণতা।

এই চারটি ঘটনা একই পরিকল্পনার অংশ কি না, কিংবা রাজনৈতিকভাবে কোনো একটি পক্ষ এসব ঘটনার পেছনে সমন্বিতভাবে রয়েছে কি না—এ মুহূর্তে নিশ্চিতভাবে বলার মতো পর্যাপ্ত তথ্য নেই।

তবে প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রয়োজন হলে পৃথকভাবে তদন্ত হওয়া উচিত।

কারণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো—আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ হবে। রাজনৈতিক পরিচয়, অর্থনৈতিক প্রভাব কিংবা সংঘবদ্ধ শক্তি কোনো ব্যক্তিকে আইনের ঊর্ধ্বে রাখতে পারে না।

বাংলাদেশে ভাঙচুর, দখল ও সংঘবদ্ধ হামলা যদি সত্যিই ‘নরমাল’ হয়ে যায়, তাহলে সেটি শুধু কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার সমস্যা থাকবে না; রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক নিরাপত্তার ওপর তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে। তাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—এসব ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে কঠোরভাবে প্রতিরোধ করা হবে, নাকি ধীরে ধীরে এগুলোই আমাদের নতুন স্বাভাবিকতায় পরিণত হবে?

বিষয়:ইসিবি চত্বরব্যবসাপ্রতিষ্ঠানভাঙচুর-দখল
প্রতিবেদক

চ্যানেল আই অনলাইন

চ্যানেল আই অনলাইন

আরও →

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…