লাইফস্টাইল

সুস্থ বার্ধক্যের চাবিকাঠি মস্তিষ্কের যত্ন

সুস্থ বার্ধক্যের চাবিকাঠি মস্তিষ্কের যত্ন

আমাদের চিন্তা, স্মৃতি ও যোগাযোগের মূল কেন্দ্র মস্তিষ্ক। এটি চারপাশের মানুষের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণ করে। অথচ শরীরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই অঙ্গটির যত্নেই আমরা সবচেয়ে উদাসীন।

রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে মস্তিষ্কের যত্নের এই গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।

মানুষের গড় আয়ু এখন আগের চেয়ে বেড়েছে। তাই সুস্থ বার্ধক্য নিয়ে আলোচনাও বাড়ছে। মানুষ এখন নিজের সার্বিক স্বাস্থ্য নিয়ে বেশ সচেতন। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও রোগ প্রতিরোধের দিকে সবার নজর। কিন্তু স্বাস্থ্যের একটি বিশেষ দিক এখনও আড়ালে রয়ে গেছে। সেটি হলো আমাদের মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য।

মস্তিষ্কে কোনো বড় পরিবর্তন দেখা দিলেই কেবল আমরা সচেতন হই। এর ফলে শুরুতেই রোগ প্রতিরোধের দারুণ সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যায়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। স্বাধীনভাবে চলাফেরা ও দৈনন্দিন কাজে সক্রিয় থাকতে সুস্থ মস্তিষ্ক প্রয়োজন।

মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা কমে গেলে ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রংশ রোগ হতে পারে। ভারতে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। তাই দেশটিতে বিষয়টি এখন বেশ উদ্বেগের কারণ। ২০৫০ সালের মধ্যে ভারতে ষাটোর্ধ্ব মানুষের সংখ্যা ৩৪ কোটি ছাড়িয়ে যাবে। অর্থাৎ প্রতি পাঁচজনের একজন হবেন বয়স্ক। তাই মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যকে এখনই অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।

অনেকেই কগনিটিভ কেয়ার বা মস্তিষ্কের যত্নকে কেবল বার্ধক্যের সমস্যা ভাবেন। বাবা-মা ৭০ বা ৮০ বছর বয়সে নাম ভুলতে শুরু করলে আমরা নড়েচড়ে বসি। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ততদিন অপেক্ষা করলে অনেক দেরি হয়ে যেতে পারে।

ব্যাঙ্গালুরুর মণিপাল হাসপাতাল ও আনাস্বামি মুদালিয়ার জেনারেল হাসপাতালের কগনিটিভ নিউরোলজি ক্লিনিকের প্রধান ডা. রত্নাভল্লি এল্লাজোসিউলা বলেন, স্মৃতিভ্রমের লক্ষণ প্রকাশের অনেক আগেই মস্তিষ্কে জৈবিক পরিবর্তন শুরু হয়।
মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য মূলত পুরো শরীরের ওপর নির্ভরশীল। হৃৎপিণ্ড, অন্ত্র ও যকৃতের অবস্থার সঙ্গে মস্তিষ্কের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে।

ডা. রত্নাবলী বলেন, মস্তিষ্কের যত্ন নেওয়া একটি আজীবন প্রক্রিয়া। চল্লিশ ও পঞ্চাশের দশকেই এ বিষয়ে মন দেওয়া উচিত। সবচেয়ে ভালো হয় শৈশব থেকেই এই চর্চা শুরু করতে পারলে।

সারাজীবন মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখলে একটি কগনিটিভ রিজার্ভ বা মস্তিষ্কের ক্ষয় প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়। এটি মস্তিষ্কে শক্তিশালী স্নায়বিক সংযোগ গড়ে তোলে। বয়স বাড়লে মস্তিষ্কের কিছু কোষ নষ্ট হয়। তখন এই মজুত মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা ধরে রাখতে সাহায্য করে।

ভবিষ্যতের জন্য মস্তিষ্ক হোক সঞ্চয়
ডা. রত্নাবলী মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যকে ভবিষ্যতের বিনিয়োগের সঙ্গে তুলনা করেছেন। নিয়মিত সঞ্চয় যেমন আর্থিক নিরাপত্তা দেয়। তেমনি দীর্ঘদিনের চর্চা মস্তিষ্ককে সুস্থ রাখে। এই চর্চা মস্তিষ্ককে বয়সজনিত রোগ মোকাবিলায় সক্ষম করে তোলে।
মস্তিষ্কের এই রিজার্ভ বা মজুত যত বেশি হবে, মস্তিষ্ক তত বেশি সচল থাকবে। এর জন্য অসাধারণ কিছুর প্রয়োজন নেই। দৈনন্দিন কিছু ভালো অভ্যাসই মস্তিষ্ককে শক্তিশালী করে তোলে।

মস্তিষ্কের পরিবর্তনের সংকেতগুলো চেনা খুব জরুরি। যেমন বারবার একই প্রশ্ন করা বা পরিচিত জিনিস হারিয়ে ফেলা। পরিচিত শব্দ ভুলে যাওয়া বা রুটিন কাজে কষ্ট হওয়াকে অবহেলা করা ঠিক নয়। পরিচিত জায়গায় দিক হারিয়ে ফেলাও একটি সতর্কবার্তা।

ডা. রত্নাবলী জানান, এই লক্ষণগুলো সবসময় ডিমেনশিয়ার ইঙ্গিত দেয় না। তবে এমন হলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। দ্রুত রোগ নির্ণয় করা গেলে সঠিক চিকিৎসা দেওয়া যায়। অনেক ক্ষেত্রে বিষণ্ণতা বা ভিটামিন বি-১২ এর অভাবজনিত সমস্যা পুরোপুরি সারিয়ে তোলা সম্ভব।

ল্যানসেট কমিশনের ২০২৪ সালের প্রতিবেদনেও দ্রুত রোগ শনাক্তের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে ডিমেনশিয়ার ৪৫ শতাংশ ক্ষেত্রে প্রতিরোধ সম্ভব। এর জন্য ১৪টি পরিবর্তনযোগ্য কারণের দিকে নজর দিতে হবে। এর মধ্যে শৈশবের শিক্ষা, উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, মদ্যপান পরিহার ও নিয়মিত ব্যায়াম অন্তর্ভুক্ত।

যেভাবে মস্তিষ্ক সুরক্ষিত রাখবেন
আমাদের প্রতিদিনের ছোট ছোট সিদ্ধান্ত মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে। সুস্থ মস্তিষ্কের জন্য কোনো একক সমাধান নেই। একাধিক স্বাস্থ্যকর অভ্যাসের সম্মিলিত ফল মস্তিষ্ককে রক্ষা করে।

নিয়মিত ব্যায়াম মস্তিষ্কে রক্ত চলাচল বাড়ায়। এটি নতুন স্নায়বিক সংযোগ তৈরিতেও সাহায্য করে। প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট জোরে হাঁটা খুবই উপকারী। ডা. রত্নাবলী পর্যাপ্ত ঘুমের ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন। গভীর ঘুমের সময় মস্তিষ্ক ক্ষতিকর প্রোটিন বের করে দেয়। অ্যালঝেইমারস রোগের জন্য দায়ী উপাদানগুলোও এসময় পরিষ্কার হয়। নিয়মিত সাত ঘণ্টার কম ঘুমালে এই প্রক্রিয়াটি বাধাগ্রস্ত হয়।

একসময় যৌথ পরিবারগুলো মানুষকে একাকীত্ব থেকে দূরে রাখত। এখন পরিবার ছোট হয়ে গেছে। সেই সঙ্গে বেড়েছে ডিজিটাল নির্ভরতা। ফলে একাকীত্ব এখন খুব সাধারণ সমস্যা। মানুষের মস্তিষ্ক সামাজিক যোগাযোগ পছন্দ করে। পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিলে মস্তিষ্ক বেশ সক্রিয় থাকে।

মস্তিষ্ককে নতুন চ্যালেঞ্জ দেওয়াও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। নতুন কিছু শেখা মস্তিষ্কের জন্য সবচেয়ে বেশি উপকারী। নতুন কোনো ভাষা বা বাদ্যযন্ত্র বাজানো শেখা যেতে পারে। এতে মস্তিষ্কে নতুন স্নায়ুপথ তৈরি হয়। মস্তিষ্ককে যত বেশি চ্যালেঞ্জ দেওয়া হবে, এটি তত বেশি মানিয়ে নিতে শিখবে।

বয়স বাড়লে স্মৃতিশক্তি কমবেই। এমন ভ্রান্ত ধারণা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের আলোচনায় মস্তিষ্কের যত্নকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। ডা. রত্নাবলী বলেন, সুস্থ বার্ধক্যের জন্য মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা কথা বলতে হবে। যত দ্রুত আমরা এর যত্ন নেব, বার্ধক্য ততটাই সুন্দর হবে।

বিষয়:কগনিটিভ কেয়ারডিমেনশিয়ামস্তিষ্কের যত্ন
প্রতিবেদক

চ্যানেল আই অনলাইন

চ্যানেল আই অনলাইন

আরও →

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…