কেমন ছিলো নানা পাটেকরের ৫ দশকের সিনেমাযাত্রা?

ভারতীয় চলচ্চিত্রের বর্ষীয়ান অভিনেতা নানা পাটেকরের মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ বলিউড ও মারাঠি চলচ্চিত্র অঙ্গন। ৮ অক্টোবর ৭৫ বছর বয়সে গোয়ার নিজ বাড়িতে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান জাতীয় পুরস্কারজয়ী এই অভিনেতা। তার মৃত্যুতে সহকর্মী, নবীন-প্রবীন শিল্পী ও বিভিন্ন অঙ্গনের বিশিষ্টজনেরা শোক প্রকাশ করেছেন।
প্রায় পাঁচ দশকের অভিনয়জীবনে হিন্দি ও মারাঠি সিনেমায় অসংখ্য স্মরণীয় চরিত্রে অভিনয় করেছেন নানা পাটেকর। মঞ্চ থেকে চলচ্চিত্র- দীর্ঘ এই যাত্রায় কখনো খলনায়ক, কখনো নায়ক, আবার কখনো চরিত্রাভিনেতা হিসেবে দর্শকের মনে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছেন তিনি।
অভিনয়ে আসার আগে নানা পাটেকর কাজ করতেন চিত্রশিল্পী হিসেবে। মাত্র ১৩ বছর বয়সে পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে তাকে কাজ শুরু করতে হয়। মুম্বাইয়ে সিনেমার পোস্টার আঁকতেন তিনি। এ কাজ করে মাসে প্রায় ৩৫ রুপি আয় করতেন বলে জানা যায়।
জীবিকার প্রয়োজনে ক্যালিগ্রাফির কাজও করেছেন নানা। এমনকি মুম্বাইয়ের রাস্তায় জেব্রা ক্রসিং আঁকার কাজও করেছেন তিনি। জীবনের সেই কঠিন সময় পেরিয়েই পরবর্তী সময়ে ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম শক্তিশালী অভিনেতা হয়ে ওঠেন।
নানা পাটেকরের অভিনয়জীবনের শুরু মারাঠি থিয়েটারে। মুম্বাইয়ের স্যার জে. জে. স্কুল অব আর্ট ও স্যার জে. জে. ইনস্টিটিউট অব অ্যাপ্লাইড আর্টে পড়াশোনা করে অ্যাপ্লাইড আর্টে ডিপ্লোমা নেন তিনি।
স্কুলে পড়ার সময়ই নাটকে অভিনয় শুরু করেছিলেন নানা। পরে ‘পুরুষ’ ও ‘হামিদাবাইচি কোঠি’র মতো প্রশংসিত নাটকে অভিনয় করে মঞ্চে নিজের অবস্থান শক্ত করেন।
১৯৭৮ সালে মুজাফফর আলি পরিচালিত ‘গমন’ সিনেমার মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক হয় নানা পাটেকরের। ছবিতে ফারুক শেখ ও স্মিতা পাটিলের সঙ্গে পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করেন তিনি।
তবে বলিউডে তার বড় ধরনের পরিচিতি আসে ১৯৮৬ সালের ‘অঙ্কুশ’ সিনেমার মাধ্যমে। এন. চন্দ্র পরিচালিত ছবিটি নানা পাটেকরের ক্যারিয়ারে নতুন মোড় এনে দেয়। এরপর একের পর এক শক্তিশালী চরিত্রে অভিনয় করে হিন্দি সিনেমায় নিজের জায়গা পাকাপোক্ত করেন তিনি।
১৯৮৯ সালে বিধু বিনোদ চোপড়ার ‘পারিন্দা’ সিনেমায় আন্ডারওয়ার্ল্ড গ্যাংস্টার আন্নার চরিত্রে অভিনয় করে ব্যাপক প্রশংসা পান নানা। তার অভিনীত চরিত্রটি হয়ে ওঠে ভারতীয় সিনেমার অন্যতম স্মরণীয় খলচরিত্র। এই সিনেমার পর দেশজুড়ে পরিচিতি আরও বাড়ে তার।
এরপর ‘ক্রান্তিবীর’, ‘অব তক ছাপ্পান’, ‘প্রহার: দ্য ফাইনাল অ্যাটাক’, ‘অগ্নিসাক্ষী’, ‘ওয়েলকাম’, ‘রাজনীতি’সহ বহু সিনেমায় দুর্দান্ত অভিনয় করেন তিনি। ভিন্নধর্মী চরিত্রে নিজেকে বারবার প্রমাণ করে দর্শকের কাছে তৈরি করেন আলাদা গ্রহণযোগ্যতা।
অভিনয়ের স্বীকৃতি হিসেবে তিনবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন নানা পাটেকর। ‘পারিন্দা’র জন্য সেরা পার্শ্ব অভিনেতা, ‘ক্রান্তিবীর’-এর জন্য সেরা অভিনেতা এবং ‘অগ্নিসাক্ষী’র জন্য আবারও সেরা পার্শ্ব অভিনেতার পুরস্কার অর্জন করেন তিনি।
এই পুরস্কারগুলো তার অভিনয় প্রতিভার বড় স্বীকৃতি হয়ে ওঠে। শক্তিশালী সংলাপ বলার ধরন, অভিব্যক্তি এবং চরিত্রের গভীরে ঢুকে অভিনয় করার ক্ষমতার জন্য তিনি দর্শক ও সমালোচকদের কাছে বিশেষ মর্যাদা অর্জন করেন।
চলচ্চিত্র ও শিল্পকলায় অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৩ সালে নানা পাটেকরকে ভারতের চতুর্থ সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ‘পদ্মশ্রী’ দেওয়া হয়। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জী তার হাতে এই সম্মান তুলে দেন।
বলিউডে সাফল্যের পাশাপাশি মারাঠি থিয়েটার ও সিনেমার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন নানা পাটেকর। মঞ্চে ‘হামিদাবাইচি কোঠি’ ও ‘পুরুষ’-এর মতো নাটকে তার অভিনয় প্রশংসিত হয়।
তবে মারাঠি সিনেমায় তার ক্যারিয়ারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র মহেশ মাঞ্জরেকর পরিচালিত ‘নটসম্রাট’-এর আপ্পাসাহেব। চরিত্রটিতে তার অভিনয় ব্যাপক প্রশংসা পায় এবং এটি মারাঠি চলচ্চিত্রে তার ক্যারিয়ারের অন্যতম স্মরণীয় কাজ হিসেবে বিবেচিত হয়।
এ ছাড়া মারাঠি জীবনীভিত্তিক সিনেমা ‘ড. প্রকাশ আমটে-দ্য রিয়েল হিরো’-তেও অভিনয় করে প্রশংসা পান নানা। ছবিটি তার ক্যারিয়ারের উল্লেখযোগ্য কাজগুলোর একটি হয়ে আছে।
জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত অভিনয় থেকে দূরে সরে যাননি নানা পাটেকর। সাম্প্রতিক সময়ে অনিল কাপুরের সঙ্গে ‘সুবেদার’ সিনেমায় ক্যামিও চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। বিশাল ভরদ্বাজ পরিচালিত ‘ও’ রোমিও’ সিনেমায় ইসমাইল খান চরিত্রেও দেখা গেছে তাকে। ছবিতে তার সহশিল্পী ছিলেন শহীদ কাপুর ও তৃপ্তি দিমরি।
এ ছাড়া ‘সঙ্কল্প’ দিয়ে ওটিটিতে অভিনয়ে অভিষেক হয় নানা পাটেকরের। সামাজিক-রাজনৈতিক থ্রিলারধর্মী এই সিরিজে কানহাইয়া লাল চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি।
পাঁচ দশকের বেশি সময়ের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে নানা পাটেকর শুধু অসংখ্য চরিত্র উপহার দেননি, ভারতীয় অভিনয়জগতেও রেখে গেছেন নিজস্ব এক স্বাক্ষর। তার মৃত্যুতে সেই বর্ণাঢ্য অধ্যায়েরই ইতি ঘটল। ডব্লিউআইওনিউজ






