দুর্নীতি প্রতিরোধে চাই বিভিন্ন ধারার নজরদারি

সম্ভাবনার উল্টো পিঠে অনেক সময় থাকে দুর্ভাবনা। স্বাস্থ্য খাতে দেশের ইতিহাসে এই বছর তেমনই একটা সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থ বছরে রেকর্ড পরিমাণে প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা বাজেট বরাদ্দ স্বাস্থ্য খাতে নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। তবে আমাদের মতো দেশে যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে, বিশেষ করে নজরদারি ব্যবস্থার দুর্বলতা, সেখানে এই সম্ভাবনার পিঠে তৈরি হয় নাগরিক মনে নানা দুর্ভাবনা। প্রশ্ন জাগে এই বিশাল বরাদ্দে স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নত হবে না কী দুর্নীতির মাধ্যমে অপচয় হবে জনগণের অর্থের?
দুর্নীতি আমাদের দেশ বা বিশ্বে নতুন কিছু না। অন্য অনেক দেশ বা সমাজের মত আমাদের দেশেও দুর্নীতির রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস। ষোড়শ শতকের কবি মুকুন্দরাম লিখেছেন,”সরকার হইলা কাল, খিল জমি লিখে লাল, বিনা উপকারে খায় ধুতি।” প্রখ্যাত আমলা ও অর্থনীতিবিদ আকবর আলী খান এর ব্যাখ্যা করেছেন, “রাজস্ব কর্মকর্তা (সরকার) অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনাবাদী জমিকে কর্ষিত জমি গণ্য করছে (যার ফলে অতিরিক্ত খাজনা দিতে হবে) এবং ঘুষ নিয়েও সঠিকভাবে কাজ করছে না।”
তো এই অতি পুরাতন দুর্নীতির চর্চাকে বাগে আনার জন্য নানা প্রয়াস চালানো হয়েছে সেই আদি কাল থেকেই। ধর্ম চর্চা, আদর্শ লিপি পড়ানো বা স্কুলগুলিতে খুব ছোট থেকেই শপথ পাঠ – উদ্দেশ্য একটাই সৎ ও আদর্শবান মানুষ তৈরী করা। কিন্তু, এতসবের পরেও আদর্শ ও সততার চর্চা ব্যাপকভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। দুর্নীতির প্রসার ঘটেছে আস্বাভাবিক হারে। এক সময়তো সবচেয়ে দুর্নীতিবাজ দেশ হিসেবে আমরা আবির্ভূত হয়েছিলাম বিশ্ব মঞ্চে।
এর পর থেকে জনপরিসরে দুর্নীতি নিয়ে আলোচনার বিস্তারও ঘটে ব্যাপক। এই সময়ের পর থেকেই চোখে পড়ে বিভিন্ন দাতা গোষ্ঠীর নানান পরামর্শ এবং উন্নয়ন সংস্থাসমূহের ব্যাপক দৌড়ঝাাঁপ। অনেকে দুর্নীতি বিরোধী সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার মাধ্যমে দুর্নীতিকে রুখে দেওয়ার চেষ্টা শুরু করে। রাজনৈতিক দলগুলির কথা ও প্রস্তাবনার মধ্যেও দুর্নীতি প্রতিরোধ একটি অন্যতম এজেন্ডায় পরিণত হয়। দাতা এবং উন্নয়ন সংস্থার অ্যাডভোকেসির ফলে সরকারও নানাবিধ ব্যবস্থা হাতে নেয়। তবে দুর্নীতিকে রুখে দেওয়ার এই ব্যবস্থাগুলি গ্রহণ করা হয় মূলত Principal-Agent model থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে। এই মডেলে ধারণা করা হয় Principal এর তুলনায় Agent, যে নির্দিষ্ট খাতে কার্যক্রম বাস্তবায়নের দায়িত্ব প্রাপ্ত, তার এর কাছে সংশ্লিষ্ট খাত বা কার্যক্রমের বিষয়ে বেশি তথ্য ও বাস্তব কাজের নিয়ন্ত্রণ থাকে। একটি দেশে নাগরিক সর্বোচ্চ পর্যায়ের Principal তবে Principal-Agent সম্পর্ক অন্য ভিন্ন স্তরেও থাকতে পারে। ফলে Principal নির্দিষ্ট এজন্টের আচরণ পর্যবেক্ষণ করতে না পারলে Agent তার দয়িত্ব ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিজের স্বার্থ হাসিলের সুযোগ পায়, ফলে ঝুঁকি বাড়ে দুর্নীতির। তাই এই মডেলভিত্তিক দুর্নীতি প্রতিরোধে অবাধ তথ্যের প্রবাহ, নজরদারি বৃদ্ধি এবং অভিযোগ ও জবাবদিহি ব্যবস্থা শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। এই লক্ষ্যে বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা কর্তৃক স্বাস্থ্যসেবাসহ সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তথ্য জনগণের মধ্যে প্রচার, তথ্য বোর্ড বা সিটিজেন্স চার্টার এবং অভিযোগ বাক্স স্থাপনেরমত কার্যক্রমের প্রচলন শুরু করে সম্ভবত ২০০১ সাল থেকেই।
সরকারও দুর্নীতি দমন ব্যুরো থেকে দুর্নীতি দমন কমিশন গঠন, তথ্য অধিকার আইন চালু, জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশলপত্র তৈরি, অনলাইন ভিত্তিক অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থার প্রচলনসহ নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করে দুর্নীতি প্রতিরোধের লক্ষ্যে। কিন্তু, এতসব উদ্যোগের ফলে যে দুর্নীতির লাগাম খুব বেশি টানা গেছে এমন প্রতিয়মান হয়না। উন্নয়ন সংস্থায় দুর্নীতি বিরোধী কাজে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায়ও দেখেছি শুধুমাত্র এইসব ব্যবস্থা দুর্নীতি প্রতিরোধে ছোট খাটো বা সাময়িকভাবে কিছু ইতিবাচক ভূমিকা রাখলেও দীর্ঘস্থায়ী বা ব্যাপক কোন পরিবর্তন করতে পারে না।
প্রশ্ন জাগে, কেন এত কিছুর পরেও দুর্নীতিকে আটকানো যাচ্ছে না? তাহলে সমস্যাটি কী শুধু তথ্যের ঘাটতি বা অভিযোগ জানাতে না পারার মধ্যে নিহিত, না কী কারণ অন্য কিছু? এখানেই নতুনভাবে ভাবার সুযোগ তৈরি করে Mushtaq Khan ও Pallabi Roy এর “Making Anti-Corruption Real: Using a ‘Power, Capabilities and Interest Approach’ to Stop Wasting Money and Start Making Progress” শীর্ষক গবেষণা। SOAS University of London ও SOAS -ACE-এর ২০২২ সালের এই গবেষণায় দেখানো হয়েছে, শুধু স্বচ্ছতা, তথ্য প্রকাশ বা অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা তৈরি করাই দুর্নীতি প্রতিরোধে যথেষ্ট না। প্রয়োজন সেইসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা তৈরি করা, যাদের দুর্নীতি ঠেকানোর ক্ষমতা রয়েছে এবং দুর্নীতিকে ঠেকানো গেলে তাদেরও স্বার্থসিদ্ধি হয়।
স্বাস্থ্য খাতে এই মডেল প্রয়োগ শুরু হতে পারে খুব নির্দিষ্ট কিছু জায়গা থেকে। প্রথমে, সেবা গ্রহীতা, স্বাস্থ্যখাতের ব্যবস্থাপক, উন্নয়ন সংস্থা, অন্যান্য অংশীজনদের সাথে নিয়ে কোথায় সরকারি অর্থের দুর্নীতি হলে জনগণের সবচেয়ে ক্ষতি হয় তা চিহ্নিত করতে হবে। একই সাথে কোথায় সেটা প্রতিরোধ করা বাস্তবসম্মত সেটাও চিহ্নিত করতে হবে। এরপর প্রতিটি ক্ষেত্রে দেখতে হবে, কার হাতে ক্ষমতা (Power) রয়েছে পরিবর্তন ঘটানোর, কার আছে কাজ করার সক্ষমতা (Capability) এবং কার স্বার্থ (Interest) আছে দুর্নীতি বন্ধ করার। পরবর্তী ধাপে খুঁজে দেখতে হবে, কোথাও ইতোমধ্যে পারস্পরিক নজরদারি বা Horizontal Check কাজ করছে কি না। যদি কাজ করে তাহলে তাকে আরো শক্তিশালী করতে হবে এবং এই ব্যবস্থাকে ছড়িয়ে দিতে হবে অন্য প্রতিষ্ঠানসমূহে। যদি কার্যকর নজরদারির এমন কিছু না পাওয়া যায় তাহলে সেখানে এমন পরিস্থিতি ও প্রণোদনা তৈরি করতে হবে, যাতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, স্বাস্থ্যকর্মী, সেবাগ্রহীতা, সরবরাহকারী বা স্থানীয় প্রভাবশালী নাগরিকদের নিজেদের স্বার্থই তাদের দুর্নীতি প্রতিরোধে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে উৎসাহিত করে। পাশাপাশি প্রচলিত স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি ব্যবস্থাকে আরো শক্তিশালী করতে হবে।
প্রথমেই শাস্তির ব্যবস্থা জোরদার করার পরিবর্তে দেখতে হবে, যারা নিয়ম মেনে চলতে চায় তারা কোন কোন বাধার সম্মুখীন হচ্ছে। সেই বাধাগুলি দূর করা গেলে নিয়ম মেনে চলা মানুষের সংখ্যা বাড়বে এবং তারাই পরবর্তীতে প্রকৃত দুর্নীতিবাজ বা দুর্নীতির সুবিধাভোগীদের ওপর প্রয়োজনীয় চাপ তৈরি করতে পারবে। বাংলাদেশ ও নাইজেরিয়ার স্বাস্থ্য খাতে চিকিৎসকদের অনুপস্থিতি নিয়ে Blake ও অন্যান্য লেখকদের ২০২১ সালের একটি গবেষণায়ও এমন সম্ভাবনার কথা উল্লেখ রয়েছে।
বাজেট শুধু বাড়ালেই হবে না। দুর্নীতি কমিয়ে বাজেটেরে কার্যকর ব্যবহারের মাধ্যমে বাড়াতে হবে সেবার মান। আর এই জন্য প্রচলিত ব্যবস্থার বাইরে আরো অন্যান্য ব্যবস্থা সম্পর্কে গবেষণা করা, জানা, এবং কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজনে উন্নয়ন সংস্থা বা এই বিষয়ে গবেষকদের সহযোগিতাও নেওয়া যেতে পারে। শুধু নজরদারি ব্যবস্থা নয়, কোথায়, কাকে এবং কীভাবে নজরদারিতে যুক্ত করলে সেই নজরদারি সত্যিই সফলভাবে কাজ করবে, সেটি ভাবাও জরুরি। এমন ব্যবস্থা করতে হবে যেখানে দুর্নীতি করা ক্রমেই কঠিন হবে এবং নিয়ম মেনে চলা হবে সহজ।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই–এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)






