প্রতিদিন কোরআন তিলাওয়াতের ৭টি উপকারিতা

ছবি: সংগৃহীত
পবিত্র কোরআন শুধু মুসলমানদের ধর্মীয় গ্রন্থ নয়, এটি মানুষের জীবন পরিচালনার পথনির্দেশও। জীবনের নানা সংকট, দুশ্চিন্তা ও সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে কোরআনের শিক্ষা মানুষকে সঠিক পথ চিনতে সাহায্য করে। তাই ইসলামে নিয়মিত কোরআন তিলাওয়াতের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
অনেকেই রমজান মাসে নিয়মিত কোরআন পড়েন। কিন্তু বছরের অন্য সময় ব্যস্ততা কিংবা অলসতার কারণে সেই অভ্যাস ধরে রাখতে পারেন না। অথচ প্রতিদিন অল্প সময় হলেও কোরআন তিলাওয়াত করা একজন মুমিনের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। জেনে নেওয়া যাক প্রতিদিন কোরআন তিলাওয়াতের সাতটি উপকারিতা।
১. অন্তরে প্রশান্তি আসে
মানুষের জীবনে দুশ্চিন্তা, হতাশা ও মানসিক অস্থিরতা থাকতেই পারে। পবিত্র কোরআন মানুষকে আল্লাহর স্মরণে ফিরে আসতে শেখায়। সূরা আর-রাদের ২৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘জেনে রেখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে।’
কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে মানুষ আল্লাহর সঙ্গে নিজের সম্পর্ক আরও গভীর করতে পারে। নিয়মিত তিলাওয়াত মনকে স্থির করতে এবং জীবনের কঠিন সময়ে ধৈর্য ধারণের শিক্ষা দিতে পারে।
২. প্রতিটি অক্ষর পাঠে সওয়াব পাওয়া যায়
কোরআন তিলাওয়াতের অন্যতম বড় ফজিলত হলো এর প্রতিটি অক্ষরের জন্য সওয়াবের প্রতিশ্রুতি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাবের একটি অক্ষর পাঠ করবে, তার জন্য একটি নেকি রয়েছে। আর প্রতিটি নেকি দশ গুণ বৃদ্ধি করা হয়।
তিনি আরও বলেছেন, ‘আলিফ-লাম-মিম’ একটি অক্ষর নয়; বরং আলিফ একটি অক্ষর, লাম একটি অক্ষর এবং মিম একটি অক্ষর।
—জামে আত-তিরমিজি, হাদিস ২৯১০।
অর্থাৎ, অল্প পরিমাণ কোরআন তিলাওয়াতের মধ্যেও রয়েছে বিপুল সওয়াবের সুযোগ।
৩. সঠিক ও ভুলের পার্থক্য বুঝতে সাহায্য করে
কোরআনকে বলা হয়েছে হিদায়াত বা পথনির্দেশ। এতে মানুষের ব্যক্তিগত জীবন, পরিবার, সমাজ, ন্যায়বিচার, সততা, ধৈর্য ও মানবিক আচরণ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে।
নিয়মিত কোরআন পড়লে মানুষ শুধু আয়াত পাঠই করেন না, বরং এর অর্থ ও শিক্ষা বোঝার সুযোগ পান। ফলে দৈনন্দিন জীবনের সিদ্ধান্তে ন্যায়-অন্যায় এবং ভালো-মন্দের পার্থক্য বুঝতে সাহায্য করে।
৪. আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক গভীর হয়
ইবাদতের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা। কোরআন তিলাওয়াত মানুষকে আল্লাহর বাণীর সঙ্গে পরিচিত করে এবং তার নির্দেশনা অনুযায়ী জীবন পরিচালনার অনুপ্রেরণা দেয়।
সূরা আল-ইসরা-এর ৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, এই কোরআন এমন পথ দেখায়, যা সবচেয়ে সরল ও সঠিক। তাই নিয়মিত তিলাওয়াতের পাশাপাশি আয়াতের অর্থ বোঝার চেষ্টা করলে আল্লাহর নির্দেশনা সম্পর্কে জ্ঞান বাড়ে।
৫. বিপদে ধৈর্য ধরার শিক্ষা দেয়
জীবনে বিপদ, ব্যর্থতা কিংবা প্রিয়জন হারানোর মতো কঠিন পরিস্থিতি আসতে পারে। কোরআনে বিভিন্ন নবী-রাসুলের জীবনের ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। তাদের ধৈর্য, ত্যাগ, বিশ্বাস ও আল্লাহর ওপর ভরসার ঘটনা মানুষকে কঠিন সময়েও আশাবাদী থাকতে শেখায়।
সূরা আল-বাকারার ১৫৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।’
কোরআনের এসব শিক্ষা বিপদের সময় মনোবল ধরে রাখতে সহায়তা করে।
৬. পরিবারে ধর্মীয় পরিবেশ তৈরি হয়
পরিবারের সদস্যরা নিয়মিত কোরআন তিলাওয়াত করলে ঘরে ইবাদতের একটি সুন্দর পরিবেশ গড়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের সামনে মা-বাবা কোরআন পড়লে তাদের মধ্যেও ছোটবেলা থেকে ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি আগ্রহ তৈরি হতে পারে।
শুধু তিলাওয়াত নয়, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কোরআনের অর্থ ও শিক্ষা নিয়ে আলোচনা করাও গুরুত্বপূর্ণ। এতে পারস্পরিক বোঝাপড়া, নৈতিকতা ও ভালো আচরণের চর্চা বাড়তে পারে।
৭. কিয়ামতের দিন সুপারিশের মাধ্যম হবে
কোরআন তিলাওয়াতের একটি বিশেষ ফজিলত সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা কোরআন পাঠ করো। কেননা, কিয়ামতের দিন কোরআন তার পাঠকারীদের জন্য সুপারিশকারী হিসেবে উপস্থিত হবে।’
—সহিহ মুসলিম, হাদিস ৮০৪।
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, কোরআনের সঙ্গে নিয়মিত সম্পর্ক রাখা একজন মুমিনের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ। তবে কোরআন পাঠের পাশাপাশি এর নির্দেশনা অনুযায়ী জীবন পরিচালনার চেষ্টাও জরুরি।
প্রতিদিন কীভাবে কোরআন তিলাওয়াতের অভ্যাস গড়বেন?
প্রতিদিন অনেক পৃষ্ঠা পড়ার লক্ষ্য দিয়ে শুরু না করে অল্প সময় নির্ধারণ করা যেতে পারে। যেমন—
• ফজরের নামাজের পর ১০ মিনিট কোরআন পড়ুন।
• প্রতিদিন অন্তত কয়েকটি আয়াতের অর্থ বোঝার চেষ্টা করুন।
• তিলাওয়াতের জন্য নির্দিষ্ট একটি সময় ঠিক করুন।
• সম্ভব হলে শুদ্ধ উচ্চারণ শেখার জন্য অভিজ্ঞ শিক্ষকের সহায়তা নিন।
• ব্যস্ততার দিনেও অল্প হলেও তিলাওয়াতের ধারাবাহিকতা বজায় রাখুন।
কোরআন তিলাওয়াত শুধু সওয়াব অর্জনের মাধ্যম নয়, বরং নিজের জীবনকে আল্লাহর নির্দেশনা অনুযায়ী সাজানোর একটি সুযোগ। প্রতিদিন অল্প অল্প করে কোরআন পড়া, এর অর্থ বোঝা এবং সেই শিক্ষা কাজে লাগানোর চেষ্টা একজন মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। তাই কোরআনকে শুধু বিশেষ মাস বা বিশেষ দিনের জন্য নয়, প্রতিদিনের জীবনের অংশ করে তোলাই হোক আমাদের লক্ষ্য।





