ফুটবল

হোর্স্ট একেল: ‘উইন্ডহাউন্ড’ খ্যাত ক্ষিপ্রগতির ফুটবলার

জার্মানদের প্রথম বিশ্বকাপজয়ী তারকার চিরবিদায়

উইন্ডহাউন্ড খ্যাত ফুটবলার ও তার কোচের ছবি, বাংলাদেশি ফুটবলপ্রেমীদের জন্য. Channel i News - চ্যানেল আই নিউজ

উইন্ডহাউন্ড খ্যাত ফুটবলার ও তার কোচের ছবি, বাংলাদেশি ফুটবলপ্রেমীদের জন্য ফুটবল সম্পর্কিত ছবি।. Channel i News – চ্যানেল আই নিউজ

‘তারা প্রত্যেকেই আমার চোখের সামনে গত হচ্ছে, তাদের হাসি ও আনন্দের সেই মুহূর্তগুলো স্মৃতি হয়ে যাচ্ছে।’ -১৯৫৪ সালের ফুটবল বিশ্বকাপজয়ী পশ্চিম জার্মানির তারকা সদস্য হ্যান্স শেফার ২০১৭ সালে মারা গেলে এভাবেই আক্ষেপ করেছিলেন হোর্স্ট একেল। বলেছিলেন, ‘এখন আমি দলের শেষ সদস্য’।

সুইজারল্যান্ডের বার্নে ‘মিরাকল অফ বার্ন’খ্যাত রোমাঞ্চকর, বিতর্কিত আর জার্মানদের স্বপ্নের ফাইনালে সর্বকনিষ্ঠ হিসেবে খেলা সেই একেলও চিরবিদায় নিলেন শুক্রবার। জার্মান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (ডিএফবি) বিবৃতিতে জানিয়েছে, ৮৯ বছর বয়সে মারা গেছেন ১৯৫৪ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। ‘উইন্ডহাউন্ড’খ্যাত একেলের মৃত্যুতে শোক জানিয়েছে তারা।

জার্মানদের অধিনায়ক ফ্রিজ ওয়াল্টার বাদে একেল ছিলেন ওয়েস্ট জার্মানির আরেক সদস্য, যিনি ১৯৫৪ আসরে সবকটি ম্যাচেই খেলেছিলেন। শিরোপা লড়াইয়ে সেই আসরের শেষ মঞ্চে অপ্রতিরোধ্য হাঙ্গেরিকে ৩-২ গোলে হারিয়ে চমক দেখিয়েছিল একেলের পশ্চিম জার্মানি। জিতেছিল জার্মানদের সবচেয়ে বাজে সময়ে অন্যতম স্বস্তির এবং বিশ্বে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করার শিরোপা।

একেলের ‘উইন্ডহাউন্ড’ হয়ে ওঠার গল্প
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞার কারণে ১৯৫০ বিশ্বকাপের আসরে অংশ নিতে পারেনি জার্মানি। তাতেই যেন তেঁতে ওঠে জার্মানরা। আন্তর্জাতিক ফুটবলে ফিরতে মরিয়া হয়ে ওঠে। বিশ্বকাপের লক্ষ্যে তারা ঢেলে সাজায় দল। নিজেদের ঝালিয়ে নিতে একের পর এক ফ্রেন্ডলি ম্যাচের আয়োজন করতে থাকে জার্মান ফুটবলের কর্তৃপক্ষ। দলে টানে তরুণ এবং মেধাবী কিছু ফুটবলারকে। তখনই সুযোগ করে নেন ২০ বছর বয়সী উদয়ীমান মিডফিল্ডার একেল।

জার্মান কোচ সেপ হারবার্গার ১৯৫২ সালের নভেম্বরে শালকের বিপক্ষে ফ্রেন্ডলি এক ম্যাচে একেলকে সুযোগ দেন। পশ্চিম জার্মানির হয়ে খেলার সুযোগ প্রথমবারেই দারুণভাবে লুফে নেন আক্রমণাত্মক এ মিডফিল্ডার। জাতীয় দলের হয়ে খেলতে মুখিয়ে থাকা একেল সেদিন অভিষেক রাঙান দুই গোলে।

বাংলাদেশ ফুটবল দলের খেলোয়াড়রা একসঙ্গে ছবি তুলছে. Channel i News - চ্যানেল আই নিউজ
১৯৫৪ বিশ্বকাপজয়ী জার্মানরা

অধিনায়ক ওয়াল্টারের বাড়ানো বল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ক্ষিপ্রগতিতে দুবার শালকের জাল খুঁজে নেন একেল। একের পর এক আক্রমণে শালকের রক্ষণভাগ তটস্থ করে রাখেন। মুগ্ধতা বেড়ে যায় ওয়াল্টারের। ডানদিকে সতীর্থ একেলের ক্লান্তিহীন দৌড়ের বিশেষণ খুঁজতে গিয়ে সেবার জার্মান অধিনায়ক বলেছিলেন, ‘সে(একেল) গ্রেহাউন্ডের মতো দৌড়ায়।’

ওয়াল্টারের সেই বিশেষণটি নামের পাশে আটকে যায় একেলের। সতীর্থদের কাছে তার ডাকনামও হয়ে যায় ‘উইন্ডহাউন্ড’। জার্মান শব্দ ‘উইন্ডহাউন্ড’র অর্থ ক্ষিপ্র, শক্তিশালী এবং বুদ্ধিদীপ্ত শিকারি, যা ব্যবহার করা হয় শিকারি হাউন্ড কুকুরের ক্ষিপ্রতা বোঝাতে। ছ’ফুট ছুঁইছুঁই একেলের পাতলা গড়ন, পেটানো শরীর আর ক্ষিপ্রতা মিলিয়ে নামকরণ পেয়ে যায় দারুণ সার্থকতাও।

হোর্স্ট একেলের ফুটবল ক্যারিয়ার
১৯৫২ সালে ওয়েস্ট জার্মানির হয়ে অভিষেকের আগে কাইজারস্লাটার্ন ক্লাবে খেলতেন একেল। তাদের হয়ে ২১৩ ম্যাচে নেমেছিলেন মাঠে। ১৯৫১ ও ১৯৫৩ সালে দলটির হয়ে জেতেন দুটি জার্মান লিগ শিরোপা। মূলত মিডফিল্ডার হিসেবে খেলতেন। কখনও কখনও খেলেছেন সেন্টার ফরোয়ার্ড পজিশনেও। একেল জাতীয় দল জার্সিতে নেমেছেন ৩২ ম্যাচ।

উইন্ডহাউন্ড কুকুরের কালো ও সাদা ছবি. Channel i News - চ্যানেল আই নিউজ
সেই ক্ষিপ্র গ্রেহাউন্ড কুকুর

ঝানু রক্ষণাত্মক স্কিলের ছিলেন একেল। ক্ষিপ্রগতির সঙ্গে গ্রেহাউন্ডের মতো শিকারের চোখে চোখ রেখে পরাস্ত করতে পারতেন প্রতিপক্ষকে। সতীর্থদের বল বাড়ানোর ক্ষেত্রেও ছিলেন দুর্দান্ত। ডানপ্রান্ত দিয়ে দ্রুত উপরের দিকে ওঠা একেল সেপ হারবার্গারের দলে বাড়তি রসদ জোগাতেন। একেলের পায়ে গড়া সব দুর্দান্ত আক্রমণকে পুঁজি বানাতেন খানিকটা সামনে থাকা হেলমুট রাহন ও বক্সের আশপাশের ম্যাক্স মরলক। আক্রমণগুলোর সাফল্যময় পরিণতির অন্যতম কারিগর থাকতেন একেল।

পুরো ক্যারিয়ারে মাত্র একটি ক্লাব পরিবর্তন করেছিলেন বিশ্বকাপজয়ী সাবেক এ ফুটবলার। ১৯৬৫-৬৬ সালে কাইজারস্লাটার্ন থেকে এসভি রোচলিংয়ে যান। ক্যারিয়ার শেষে সেই একমাত্র পরিবর্তনের কারণও জানিয়েছিলেন। বলেছিলেন, শুধু টাকার জন্য খেলা নয়, থিতু হয়ে ক্যারিয়ার এগিয়ে নেয়াই ছিল লক্ষ্য।

২০১৭ সালে ‘কিকার’ নামের এক ম্যাগাজিনকে একেল বলেছিলেন, ‘জানি, অনেকেই এখনও বুঝবেন না কেনো আমি দল পরিবর্তন করি নাই। আসলে টাকার জন্য খেলি না। শুধু একজন ভালো খেলোয়াড় হতে চাইছিলাম। এমনকি কাইজারস্লাটার্নে খেলার সময়ও তাদের থেকে কোনো অর্থ নিতাম না।’

১৯৩২ সালে জার্মানির ভোগেলবাখে জন্ম নেয়া একেল ক্লাব এসসি ভোগেলবাখে খেলার সুযোগ পান যখন বয়স সবে ১৫। দলটির ফরোয়ার্ড হয়ে খেলেছেন দুর্দান্ত। গোলকরার ক্ষমতা কারণে দু’বছর পর তাকে নিজেদের দলে টেনে নেয় কাইজারস্লাটার্ন। সেখানে আইডল ওয়াল্টারের সঙ্গে খেলেন উইঙ্গার হিসেবে। ছোটবেলায় যে ক্লাবের ম্যাচ দেখতে ৩০ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে আসতেন, সেখানেই মেলে থিতু হওয়ার সুযোগ। ১৯৬৫ সালে, ক্যারিয়ার যখন পড়ন্ত, তখন এসভি রোচলিংয়ের হয়ে এক মৌসুম খেলেছিলেন।

বাংলাদেশের ফুটবল খেলোয়াড়রা মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে. Channel i News - চ্যানেল আই নিউজ
ডানপ্রান্ত দিয়ে ছুটছেন একেল

বিশ্বকাপের স্মৃতিচারণে একেল
জার্মান ফুটবলের নতুন পথচলার পেছনে অসামান্য অবদান ছিল যাদের, তাদের সর্বকনিষ্ঠজন হলেও অন্যতম ছিলেন হোর্স্ট একেল। ১৯৫৪ বিশ্বকাপে যুদ্ধ বিধ্বস্ত এবং পুরো বিশ্বে নানা ক্ষেত্রে পর্যুদস্ত জার্মানিকে স্বস্তি এনে দিয়েছিল যেকয়টি নাম, তার একটি হোর্স্ট একেল। বিশ্বকাপজয়ী দলের সবার শেষে চিরবিদায় নিলেন তিনি। চলে যাওয়ার আগে নানা সময় অবিস্মরণীয় অম্লমধুর সেইসব স্মৃতি রোমন্থন করেছেন।

২০১৭ সালে এক সাক্ষাৎকারে একেল স্মৃতিচারণ করে বলেছিলেন, ‘হারবার্গার(কোচ) আমাদের প্রত্যেককে বলে দিয়েছিলেন ঠিক কী করতে হবে, দলকে ঠিক কোন পথে হাঁটতে হবে।’ শেষে বলেছিল, ‘যাও, তোমার খেলা খেলো এবং জেতো।’

কোচের অনুপ্রেরণা আর আগ্রাসী মানসিকতার কারণে বৃষ্টিবিঘ্নিত সেই ফাইনালে হাঙ্গেরিকে হারিয়েছিল ওয়েস্ট জার্মানি। যেটি জার্মানদের প্রথম বিশ্বকাপ শিরোপা। সঙ্গে বিশ্বযুদ্ধের পর বৈশ্বিক কোনো আসর, যেখানে তারা খেলার সুযোগ পেয়েছিল। স্বভাবতই তাদের উল্লাসের মাত্রাও ছিল বাধভাঙা। সেই স্মৃতিচারণই করেছিলেন একেল।

বলেছিলেন, ‘যখন আমরা ট্রেনে চেপে জার্মানি ফিরি, শহরের পাশে, পথে মানুষের মাঝে জয়ের উল্লাস-উত্তেজনা দেখে মনে করছিলাম ‘আমরা সত্যিই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন’।উইন্ডহাউন্ড খ্যাত ফুটবল খেলোয়াড়দের পুরোনো দলীয় ছবি. Channel i News - চ্যানেল আই নিউজ

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাতি হিসেবে পুনর্গঠনের প্রচেষ্টায় থাকা জার্মানির জন্য বিশ্বকাপ জয়ের ঘটনাটির ছিল আলাদা মাহাত্ম্য। সেটি আবার বৈশ্বিক আসরেই তাদের প্রথম শিরোপা। প্রতিপক্ষ ছিল সেসময়ের অন্যতম সেরা দল হাঙ্গেরি। অপরাজেয় ছুটতে থাকা সেই দলটির বিপক্ষে শুরুতে পিছিয়ে গেলেও ৩-২ গোলে হারিয়ে ইতিহাস লিখেছিলেন ওয়াল্টার-একেলরা।

ডর্টমুন্ডে জার্মান ফুটবল জাদুঘরে ২০১৪ সালের বিশ্বকাপজয়ী মিরোস্লাভ ক্লোসের সাথে একেলকে ‘হল অফ ফেমে’ অন্তর্ভুক্ত করা হয়। টুর্নামেন্টের পঞ্চম আসরে জার্মানদের প্রথম শিরোপা জয় নিয়ে ২০০৩ সালে সঙ্কি ওয়ার্থম্যানের বানানো সিনেমা ‘দ্য মিরাকল অব বার্ন’র পরামর্শকের দায়িত্বেও ছিলেন একেল।

১৯৫৪ বিশ্বকাপের জার্মানদের নিয়ে অনেক বিতর্ক থাকলেও শেষপর্যন্ত স্বস্তির শিরোপা এনে দেয়া দলের সদস্য হতে পেরে একেল অনেক খুশি ছিলেন। একবার আলাপচারিতায় বলেছিলেন, ‘‘যখন অল্পবয়সীরা আমার কাছে আসে, স্কুলের ছেলেমেয়েরা আমার কাছে আসে এবং বলে ‘আপনি জানেন, আমি আপনার মতো’ —সেটি বিস্ময়কর। এটি আমাকে গর্বিত করে তোলে।’’

‘বন্ধুত্ব এবং ফুটবল আমাদের সবাইকে সারাজীবন এক সুতোয় বাঁধবে।’ —২০১৭ সালে এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন একেল। সত্যিকার অর্থেই, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাতি হিসেবে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া জার্মানদের মুখে হাসি ফোটানোর উপলক্ষ এনে দেয়া একেলদের নিশ্চিতভাবেই ভুলতে পারবেন না জার্মানরা।

বিষয়:পশ্চিম জার্মানি

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…