২০০৬ সাল। আগষ্ট মাস। আমি তখন চট্রগ্রাম মেডিকেল কলেজে পড়ি। তারিখটি ছিলো ২৮। ফিজিওলজির ভাইবা পরীক্ষা আমার। সকাল ৮টায়। পড়া-শুনায় কখনও-ই ভালো ছিলাম না। পরীক্ষা আসলেই বুক ধক ধক করতো। দুরু দুরু বক্ষে কলেজের গেটের সামনে হাজির হলাম। ঘড়ির কাটায় ৮টা ১৫। অর্থাৎ ১৫ মিনিট দেরী হয়ে গেছে। তাড়াহুড়ো করে প্র্যাকটিক্যাল রুমে দৌড়াচ্ছি। পকেটের মোবাইলটি ভাইব্রেট হচ্ছে। ঐ পরিস্থিতে মোবাইল ধরার কথা নয়। ফোন বের করে দেখলাম,মায়ের নম্বর। ভাবলাম মায়েরা পরীক্ষার আগে সন্তানদের যা বলেন,সেটা বলতেই মা ফোন করেছেন। কেটে দেবো ভেবেও,কলটা রিসিভ করলাম। ওপাশ থেকে মায়ের নয়, আমার কাকার ভারী কন্ঠ। ‘তোমার বাবা খুব অসুস্থ্য। এক্ষুণি ঢাকায় চলে এসো’।
এমন একটা খবরের জন্য আমার প্রস্তুতি ছিলো না। বাবার হঠাৎ এমন কী হলো যে,আমাকে পরীক্ষা বাদ দিয়ে চলে আসতে হবে? তাছাড়া পরীক্ষা না দিয়ে আসলে বাবা খুব বিরক্ত হবেন। এসব চিন্তা করতে করতেই আবারও ফোন। আমি যেন এক্ষুণি রওনা দিই। কোনভাবেই হিসেব মিলছে না। অধিকাংশ পরীক্ষার আগে, বাবা আমার ওখানে উপস্থিত থাকেন। এবারও তাই কথা ছিলো। বাবা থাকলে মনের জোর বাড়ে। বাবা কেন যায়নি, সেটারও কোন সদুত্তর নেই। আকাশ-পাতাল চিন্তা-ভাবনা করতে করতে বাসষ্ট্যান্ডে গেলাম। ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। ঢাকা থেকে চট্রগ্রাম ৬ ঘন্টার পথ। সেদিন খুব বৃষ্টি হচ্ছিলো। বাস চলছে ধীর গতিতে, সাবধানে। আমি একের পর এক ফোন পাচ্ছি। কারও সাথে কারও কথা মিলছে না। কেউ বলছে, বাবা অসুস্থ্। কেউ বলছে,আমি আসলে তারপর বাবা হাসপাতালে যাবে। আমি বারবার বাবার সাথে কথা বলতে চাইছি। মায়ের সাথে কথা বলতে চাইছি। কেউ আমাকে তাদের সাথে কথা বলতে দিচ্ছে না। কারও সাথে কারও কথাও মিলছে না। আমি চরম দ্বিধাগ্রস্ত। ঘটনা কী? কী এমন হয়েছে?
বাবা আমার সাথে কথা বলবে না,এটা তো হতেই পারে না। তাহলে? আমাকে কী বাবা কোন সারপ্রাইজ দেয়ার জন্য এভাবে ডেকে আনছে? ‘সারপ্রাইজ’ কথা মাথায় আসতেই কিছুটা পুলক অনুভব করলাম। ভাবনায় প্রাপ্তির আনন্দ যোগ হলো। মনটাও বেশ ফুরফুরে। বাসের জানালা দিয়ে বৃষ্টির অপরূপ শোভা দেখছি। হয়তো ঘুমিয়েও পড়েছিলাম।ঢাকার ফকিরাপুল। বৃষ্টির জলে বিশ্রী অবস্থা। বাস থেকে নামলাম। এমন আবহাওয়ার ফায়দা তোলা সিএনজি চালকদের রীতি। আমি ১২০ টাকা ভাড়া ঠিক করে মোহাম্মদপুর আমাদের বাসার দিকে রওনা দিলাম। দূর থেকে দেখলাম,বাসার সামনে প্রচণ্ড ভীড়। বহু লোক। একটা এ্যাম্বুলেন্সও দাঁড়িয়ে আছে। আমার মাথা কাজ করছে না। ঘটনা কী?ঘটনা কী সেটা অল্পক্ষণের মধ্যেই পরিস্কার হলো। আমার সারপ্রাইজ! বাবা এমন এক জায়গায় গেছেন,যেখান থেকে আর ফেরার কোন সুযোগ নেই। সুযোগ নেই কথা বলার। এতোটুকু ছুঁয়ে দেখার। আর কোনদিন বাবার সাথে আমার কথা হবে না,গল্প হবে না,রাগ-অভিমানও না। বিষয়টা কী মেনে নেয়া যায়? এটা কী সহ্য করার মতো ঘটনা?
যে মানুষটি আমাকে বুক দিয়ে আগলে রাখতো,সেই মানুষটি আমাকে রেখে কীভাবে চলে গেলো? কেন চলে গেলো?সুনীল ব্যানার্জি। এক সময়ের খ্যাতিমান সাংবাদিক। সংবাদপত্র জগতের নক্ষত্র বললেও হয়তো খুব বেশী ভুল বলা হবে না।
১৯৪৭ সালের ২০ এপ্রিল সাতক্ষীরা শহরের এক অভিজাত পরিবারে জন্ম গ্রহন করেন তিনি। নবম শ্রেনী থেকে সাংবাদিকতা পেশার সাথে যুক্ত থাকলেও প্রত্যক্ষভাবে কাজ শুরু করেন ১৯৭২ সাল থেকে। বিসিএস পাশ করেও পুলিশের চাকরিতে যোগ দেননি তিনি। সাংবাদিকতার মোহে বাংলার বাণী’র পত্রিকার মাধ্যমে ঢাকায় বাবার কাজ শুরু। ১৯৭৩ সালে যোগ দেন দৈনিক বাংলায়। দৈনিক বাংলা বন্ধ হওয়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত পত্রিকাটির সিনিয়র রিপোর্টার হিসেবে কর্মরত ছিলেন তিনি। 
দৈনিক জনকন্ঠ ছিলো বাবার সর্বশেষ কর্মস্থল।বিবিধ অনুসন্ধানী রির্পোটের আলোকে তিনি বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। ২০০৬ সালে একুশে গ্রন্থ মেলায় সুনীল ব্যানার্জির লিখিত বই ‘সাংবাদিকতায় বিড়ম্বনা’ পাঠক মহলে ব্যাপক প্রশংসিত হয়। তিনি জাতীয় প্রেস ক্লাবের স্থায়ী সদস্য, ক্রাইম রিপোর্টার্স এসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির আজীবন সদস্য ও কনজুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) এর কার্যনির্বাহী পরিষদের একজন সদস্য ছিলেন। অভিবিভক্ত সাংবাদিক ইউনিয়নের সাথেও তিনি জড়িত ছিলেন।একজন মানুষের মৃত্যুতে সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্থ হয় তার পরিবার। সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু অস্বাভাবিক হচ্ছে জীবিত দশায় যার যশ- খ্যাতি এবং ক্ষমতার পূজারীর অভাব হয় না, সেই মানুষটির মৃত্যুর পর তার পরিবারের খোঁজ রাখার লোকের বড্ড বেশী অভাব দেখা যায়। এটি শুধু আমার ক্ষেত্রে নয়। এমন বহু উদাহরণ আমাদের দেশে ঘটছে। হয়তো এই ধারাই চলমান থাকবে। আমার বাবার মৃত্যুর সময় ফেসবুক ছিলো না। শত শত পত্রিকা কিংবা অসংখ্য টিভি চ্যানেল ছিলো না। যে কয়টি পত্রিকা ছিলো,সেগুলোর প্রায় সব কয়টিতে তার মৃত্যু সংবাদটি প্রকাশ পেয়েছে। প্রকাশ পেয়েছে সরকারী-বিরোধীদল সহ বিভিন্ন মহলের শোকবার্তা।
বিস্ময়কর বিষয় হচ্ছে,মৃত্যুর প্রথম বছর থেকে শুরু করে,অদ্যাবধি একই নিউজ প্রকাশের জন্য তদ্বির করতে হয়। তারপরও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেটি ঠাঁই পায় না। বাবা বলতেন “মানুষ মানুষের জন্য”। বাস্তবতার কষাঘাতে জর্জরিত হয়ে বাবার এই কথাটি এখন মানতে খুব কষ্ট হয়। বাবার স্বপ্ন ছিলো আমাকে একজন ডাক্তার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার। মৃত্যুর সাথে সাথে তার স্বপ্নেরও ইতি ঘটেছে। মায়ের অসুস্থতা এবং বিভিন্ন পারিপার্শ্বিক কারণে আমার আর চট্রগ্রাম ফেরা হয়নি। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নিয়েছি ঢাকা থেকে। ইংরেজী সাহিত্যে মাষ্টার্স পাশ করেছি। বাবার পথ অনুসরণ করে সাংবাদিকতা পেশায় নাম লিখিয়েছি। কিন্তু সুপারিশের অভাবে একটি ভালো চাকরি আমার জোটে না।
একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হয়েও আমাকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ‘হিন্দু’ চিহ্নিত করা হয়! আজ ২০ এপ্রিল। আমার বাবা সুনীল ব্যানার্জির জন্মদিন। জীবন দশায় বহু মানুষের উপকার বাবা করেছেন। সুযোগ মতো চাকরি দিয়েছেন। আমি নিশ্চিত আমার বাবার জন্ম কিংবা মৃত্যুর তারিখটি তারা কেউ মনে রাখতে চান না। ভুলে থাকার এই চেষ্টা অনেকটা ইচ্ছাকৃত। কারণ অজানা। আমি শুধু জানি,আমার বাবা নেই। আমি এতিম। ভীষণ অসহায়। নিদারুণ নিঃসঙ্গ। এক দশক সাংবাদিকতা করেও প্রতিষ্ঠিত হতে পারিনি। একটি চাকরির জন্য দুয়ারে দুয়ারে ধরনা দিতে হয় আমাকে। খুব ইচ্ছে হয়, মাঝে মাঝে বাবার বুকে মাথা রাখতে। দুঃখগুলো শেয়ার করে হালকা হতে। প্রকৃতির নিঠুর বিচারে আমি সেই সুযোগ থেকে চিরতরে বঞ্চিত। বাবা আমাকে খোকা বলে ডাকতেন। সেই প্রিয় ডাকটি শুনতে খুব সাধ হয়! আমার মনের এই ব্যথা কি কেউ বুঝতে চাইবে? বাবা কী পরলোকে বসে আমার কষ্ট গুলো দেখতে পায়? যেই বাবা আমার হাতটি ধরে পথ চলতো, সে কী জানে, আজ আমার হাত দু’টো তাকে শুধু খুঁজে বেড়ায়? জন্মদিনের এই মাহেন্দ্র ক্ষণে বাবাকে আরও বেশী মনে পড়ছে। ‛শুভ জন্মদিন বাবা’।









