জাগরণ মঞ্চের নেতা জনাব ইমরান এইচ সরকারকে ক্ষমা চাইতে বলেছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি উপদেষ্টা সজিব ওয়াজেদ জয়। ফেসবুক পেজে সজিব ওয়াজেদ জয় বলেছেন যে, “যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস আমাকে অপহরণ ও হত্যার ষড়যন্ত্রে শফিক রেহমানের সরাসরি সংশ্লিষ্টতা উদ্ঘাটন করেছে। তারা এ বিষয়ে প্রমানাদি আমাদের সরকারের কাছে দিয়েছে। তাকে এই প্রমাণের ভিত্তিতেই গ্রেফতার করা হয়েছে। আমি এরচেয়ে বেশি কিছু প্রকাশ করতে পারছি না, কিন্তু এই প্রমাণ দ্ব্যর্থহীন এবং অখণ্ডনীয়। আমি আশাই করেছিলাম বিএনপি এটা নিয়ে মিথ্যা বলার চেষ্টা করবে। যদিও, আমি আশ্চর্য হয়েছি ইমরান সরকারের বিষয়ে। সম্ভবত শেষ পর্যন্ত তার আসল চেহারাটা উন্মোচিত হলো।
এটা দেখে মনে হচ্ছে সে আমাদের বেশিরভাগ সুশীলের মতই, আরেকটা সুবিধাবাদী এবং মিথ্যাবাদী। হয়তো বিএনপি তাকে পয়সা দিয়েছে। কে জানে। যেভাবেই হোক, আমি তার প্রতি সব শ্রদ্ধা হারিয়েছি। তাকে তার বক্তব্য প্রত্যাহার করে আমাদের সরকারের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।“ সজিব ওয়াজেদের ফেসবুকে দেয়া উপরোক্ত বিবৃতির জবাবে জাগরণ মঞ্চের নেতা ইমরান সরকার চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন,“আমি কোনো অপরাধীর পক্ষে নয় বরং মতপ্রকাশের পক্ষ নিয়েছি। যেহেতু শফিক রেহমান সাংবাদিক সেহেতু মতপ্রকাশের বিষয়টি আসছে। বিরোধী মত দমনের যে সংস্কৃতি শুরু হয়েছে আমি তার সমালোচনা করেছি মাত্র। আমি কোনো অপরাধ করিনি। তাই সরকারের কাছে ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না”। বাকবিতন্ডতায় উদ্ভুত যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তা একাধারে যেমন বিস্ময়কর, তেমনি অজ্ঞানতায় ভরা মতবিনিময়ের শামিল।
সজিব ওয়াজেদ জয় সাংবাদিক শফিক রেহমানের গ্রেফতারের ব্যাপারে সুস্পষ্ট রেফারেন্স দিয়ে বলছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস তাঁকে অপহরণ ও হত্যার ষড়যন্ত্রে শফিক রেহমানের সরাসরি সংশ্লিষ্টতা উদ্ঘাটন করেছে। অর্থাৎ শফিক রেহমান পেশাগতভাবে যা-ই হোন না কেন, তিনি মূলত একটা অপরাধ সংগঠনে নিজেকে জড়িত করেছেন, যা ফৌজদারি আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধই শুধু নয়, এমনকি রাষ্ট্রদ্রোহেরও শামিল। এক্ষেত্রে জয় স্পষ্ট করেছেন যে, পেশাগতভাবে সাংবাদিক শফিক রেহমান যে অপরাধের সাথে জড়িয়েছেন, তা তাঁর পেশার সাথে একেবারেই সংগতিহীন এবং অপরাধের মাত্রায় এক্ষেত্রে শুধুই একজন ‘অপরাধী শফিক রেহমান’-কে দেখা ছাড়া অন্য কোন ভাবে দেখার সুযোগ নেই। জয়ের এই বক্তব্য এখানে এতো স্পষ্ট যে কোনোভাবেই তা ভুল বোঝার অবকাশ থাকে না। লক্ষ্যনীয় যে, শফিক রেহমান পেশাগত সাংবাদিক হিসেবে এমন কিছু বলেননি বা লিখেননি যে, তা কাউকে অসম্মানিত বা আঘাত করেছে, যার জন্য তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছে। যদি সত্যিই তাই হতো, তাহলে নিঃসন্দেহে এবং তর্কাতীতভাবে সাংবাদিক শফিক রেহমানের বাক-স্বাধীনতা হরণ করা হয়েছে বা তাঁর স্বাধীন মতপ্রকাশে বাধা দেয়া হয়েছে বলে প্রতীয়মান হতো, যা ইমরান সরকার শুধু দাবিই করছেন না, এর বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়ে তীব্র প্রতিবাদও করেছেন।
মানবিক পেশায় জড়িত একজন চিকিৎসক যদি তাঁর স্ত্রীকে খুন করেন এবং সেজন্য যদি তাঁকে গ্রেফতার করা হয়, তাহলে নিশ্চয়ই রাষ্ট্রের মানবতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া হয়না। ধর্মীয় গুরু, যাজক, ইমাম বা ধর্মপ্রচারককে যদি যৌননির্যাতনের দায়ে গ্রেফতার করা হয়, তাহলে নিশ্চয়ই সেই ধর্মের অবমাননা বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করা হয়না। ঠিক একইভাবে কোন সাংবাদিক যদি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ন কোনো ব্যক্তিকে অপহরণ করার চক্রান্তে লিপ্ত হন এবং সেজন্য তাঁকে গ্রেফতার করা হলে অবশ্যই মহান সাংবাদিকতা পেশাকে অবমাননা করা হয়না এবং তাঁর বাকস্বাধীনতা বা মতপ্রকাশে বাধা দেয়া হয় না। এখানে অবশ্যই অপরাধের শ্রেনীবিন্যাস এবং এর গর্হিত কাজকে আমলে নিতে হবে। এক্ষেত্রে ইমরান এইচ সরকার সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন বলেই প্রতীয়মান হয়, যা নিঃসন্দেহে দুঃখজনক এবং অনভিপ্রেত। সজিব ওয়াজেদ জয়ের সুস্পষ্ট বক্তব্যের পরেও যখন ইমরান সরকার বলেন যে, বিরোধী মত দমনের যে সংস্কৃতি শুরু হয়েছে আমি তার সমালোচনা করেছি, তখন তাঁর অজ্ঞানতাকে সত্যিই ভয় পেতে হয়।
বিরোধী দমন আর অপরাধ দমন নিশ্চয়ই এক কথা নয়। বেগম খালেদা জিয়ার নব্বই দিনের অবরোধে যে কয়েক শত মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছিল, হাজার হাজার গাছ কেটে দেশকে সবুজশূন্য করা হয়েছিল, শত শত বাস পুড়িয়ে সম্পদের বিনষ্ট করা হয়েছিল, তখন নিশ্চয়ই তাঁকে বিরোধী মত প্রকাশের স্বাধীনতা হিসেবে গণ্য করা উচিত ছিল। অথবা যুদ্ধাপরাধীদের সাজার রায়ে প্রতি কিস্তিতে যখন জামায়াত-শিবির যৌথ প্রযোজনায় সারাদেশে জ্বালাও-পোড়াও সংস্কৃতির অণুশীলন করেছিল এবং বিএনপি সে পালে হাওয়া দিয়েছিল, তখন তা বাধা দিয়ে রাষ্ট্র নিশ্চয়ই ‘বিরোধী মত দমন’ করেছিল! সত্যিই অবাক হতে হয় ভেবে যে, আমাদের মস্তিস্কের সঠিক অনুশীলনের অভাবনীয় দারিদ্রতা আজ আমাদের কোথায় নিয়ে দাঁড় করিয়েছে। হটকারিতা আর স্ববিরোধীতাই যদি হয় আমাদের জাতীয় পরিচয়ের প্রতীক, তাহলে সে লজ্জা ঢাকবার জায়গা খুজে পাওয়া দুস্কর হয়ে যায়!
জাগরণ মঞ্চের একচ্ছত্র নেতা জনাব ইমরান এইচ সরকার ‘মত প্রকাশের পক্ষের আড়ালে যে মূলত একজন অপরাধীর পক্ষ নিয়েছেন, তা সম্ভবত তিনি নিজেও বুঝতে পারেননি এবং তার বক্তব্য সে সাক্ষ্যই দেয়। একজন সাংবাদিক, চিকিৎসক, ধর্মীয় প্রতিনিধি বা সমাজ সেবকও যে অপরাধী হতে পারেন, সে ব্যাপারে যখন ইমরান সরকারের মত একজন শীর্ষ নেতার কোন অনুভূতি কাজ করে না, তখন সত্যিই ভয় পেতে হয়। সরকারী দলের একাধিক মন্ত্রীর মত বিরোধী দলের নেতা-কর্মীরাও যে অপরাধ করে কারারুদ্ধ হতে পারেন, তা কি এই প্রজন্ম দেখছে না! আমরা ভুলে যাই যে, পেশা কোনো ছাতা নয় যে, অপরাধ ঢেকে দেবে! জেনে হোক বা না জেনে হোক, প্রজন্মের পথ প্রদর্শক হিসেবে খ্যাত ইমরান এইচ সরকারের আদর্শিক বিচ্যুতি আমার মত নিশ্চয়ই অনেককে ভাবায়, দুঃখ দেয়!
এর থেকে পরিত্রাণের উপায় নিয়ে ভাবতে হবে এবং তা এই প্রজন্মকেই। সময় যেমন অনেকদিন কারো জন্য বসে থাকেনা, তেমনি সাহসও বুকে জমা থাকেনা আজীবন। হটকারি এবং স্ববিরোধী রাজনীতির অণুশীলন, প্রজন্মের সময় ও মেধার দুঃখজনক অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়!
(এ বিভাগে প্রকাশিত
মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির
সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)









