ভারি বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, ধরলাসহ সবকটি নদীর পানি বাড়তে থাকায় উত্তরাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। এসব দুর্গত এলাকায় ভেঙে পড়েছে সড়ক ও রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা। খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন বন্যা কবলিতরা। অসংখ্য মানুষ হতাহতের খবর মিলছে। মানুষ অসহায় আর্তনাদ করছে!
বন্যায় ডুবতে থাকা এই মানুষগুলোকে সহযোগিতা করার জন্য ব্যতিক্রধর্মী সব উদ্যোগ নিয়ে মাঠে নেমেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির সকল সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন। ত্রাণ সংগ্রহের জন্য তিন সদস্যবিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটি ও প্রতিটি সংগঠনের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক ও সম্পাদকদের নিয়ে অর্থ, মানবসম্পদ, সাংস্কৃতিক, লজিস্টিক, যোগাযোগ ও প্রচার, মেডিকেল সহ বিভিন্ন উপ-কমিটি গঠন করে ১৭ আগস্ট থেকে ত্রাণ সংগ্রহ কর্মসূচি শুরু করে সংগঠনগুলো। এরপর থেকে সংস্কৃতির নানা বিষয় পরিবেশনার মাধ্যমে সংগঠনগুলো ক্যাম্পাসজুড়ে ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এসব পরিবেশনার মধ্যে রয়েছে গান, পথ নাটক, মূকাভিনয়, আবৃত্তি, ছবি প্রদর্শনী সহ নানা বিষয়।

বৃহস্পতিবার বিকেলে মূকাভিনয় প্রদর্শনীর মাধ্যমে টিএসসিতে ত্রাণ সংগ্রহ কার্যক্রম উদ্বোধন করা হয়। এসময় মূকাভিনয় প্রদর্শনী করেন মাইম অ্যাকশনের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক মীর লোকমান। পরদিন শুক্রবার দুপুর তিনটা থেকে লাইব্রেরি চত্বর, শাহবাগ, শহিদ মিনার এবং সন্ধ্যায় টিএসসিতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করে। শনিবার চলে ঢাকা ইউনিভার্সিটি ফটোগ্রাফি সোসাইটির ছবি প্রদর্শনী এবং ঢাকা ইউনিভার্সিটি লিটারেচার সোসাইটির আয়োজনে প্রায় দুই শতাধিক শিক্ষার্থীদের নিয়ে পাঠচক্র, যেখান থেকে বন্যার্তদের জন্য অর্থ সংস্থান করা হয়। চলতি সপ্তাহে থাকবে ঢাকা ইউনিভার্সিটি ডিবেটিং সোসাইটির আয়োজনে আঞ্চলিক বিতর্ক ও গান পরিবেশনা। টিএসসিতে এই আয়োজন হবে। এই সপ্তাহেই ঢাকা ইউনিভার্সিটি ফিল্ম সোসাইটি উদ্যোগ নিবে ফিল্ম প্রদর্শনীর। এরপর আগামী বৃহস্পতিবার থেকে শনিবার রাজু ভাস্কর্য কনসার্ট আয়োজনের মাধ্যমে ত্রাণ সংগ্রহের পরিকল্পনা করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো।
এই উদ্যোগ ছাড়াও প্রতিটি সংগঠনের প্রাক্তন নেতৃত্ব ও তাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত বিশেষ ডোনারদের কাছ থেকেও বন্যার্তদের জন্য ত্রাণ সংগ্রহ করবেন বলে জানিয়েছেন ত্রাণ সংগ্রহ কমিটির আহ্বায়ক মীর লোকমান।
তিনি বলেন, নব্বইয়ের দশকে টিএসসির সংগঠনগুলো ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতো। বহুদিন এই পরিস্থিতি ছিলো না। দেশের বন্যার্ত মানুষকে সহযোগিতা করার জন্য আমরা আবারও ঐক্যবদ্ধ হয়েছি। আমাদের কাজের মাধ্যমে সংস্কৃতির চর্চা যেমন তরান্বিত হচ্ছে , তেমনি অসহায় মানুষেরও উপকার হচ্ছে।
ঢাকা ইউনিভার্সিটি ডিবেটিং সোসাইটির সভাপতি মাহমুদ আব্দুল্লাহ বিন মুন্সিও বলছিলেন তাদের উদ্যোগের কথা। সম্মিলিত প্রয়াসে সংস্কৃতির চর্চার মাধ্যমে আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতি চর্চাকে নতুন করে জাগ্রত করতে চাই। আমাদের এই প্রয়াস অব্যাহত থাকবে।

টিএসসির সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর সম্মিলিত এই উদ্যোগে ব্যাপক সাড়া পড়েছে ক্যাম্পাসে। ক্যাম্পাসের অনেক শিক্ষার্থী দীর্ঘদিন হলেও টিএসসির সংগঠনগুলোর এই সম্মিলিত প্রয়াসকে অনুপ্রেরণা দিচ্ছেন ।আবার শিক্ষার্থীদের সামান্য অংশ এই উদ্যোগকে নেতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকেও দেখছেন।তাদের ধারণা এসব সংগঠন আসলে বলার মতো কিছু করতে পারছে না।
তবে এসব সংগঠনের প্রাক্তন নেতৃবৃন্দরা প্রেরণা দিচ্ছেন ব্যতিক্রধর্মী উদ্যোগে। এদেরই একজন ইকবাল হাসান। ডিবেটিং সোসাইটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক তিনি। বর্তমানে ৩৫ তম বিসিএস এ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কর্মরত।
তিনি বলছিলেন, টিএসসি কেন্দ্রিক সংগঠনগুলো সংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এই সংগঠনগুলোই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে নতুন করে জাগ্রত করতে পারে। সংগঠনগুলো যে সম্মিলিতভাবে উদ্যোগ নিয়েছে তাতে আমরা ভরসা পাচ্ছি। নতুনভাবে সংস্কৃতি চর্চার জায়গাটি বিস্তৃত হবে এখন।
এবিষয়ে কথা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী শুধু পাঠ্যবইয়ে সীমিত থাকলে চলে না। তাদের মূল শিক্ষার পাশাপাশি সহশিক্ষায় সম্পৃক্ত থাকতে হবে। এক্ষেত্রে টিএসসি কেন্দ্রিক সংগঠনগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। আমরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে খুব সামান্য পরিমাণ সহযোগিতা তাদের করতে পারি। কিন্তু আমাদের শিক্ষার্থীরা নিজস্ব উদ্যোগে এসব সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে থাকে। তারা যে সাংস্কৃতিক বিভিন্ন আয়োজনের মাধ্যমে সম্মিলিতভাবে দেশের বন্যার্ত মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছে তা অত্যন্ত প্রশংসার দাবি রাখে। আশা করি তাদের এই কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
প্রসঙ্গত এই সম্মিলিত উদ্যোগে টিএসসির যেসব সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন অংশ নিচ্ছে তার মধ্যে রয়েছ ঢাকা ইউনিভার্সিটি ডিবেটিং সোসাইটি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদ, ফটোগ্রাফি সোসাইটি, ঢাকা ইউনিভার্সিটি ট্যুরিস্ট সোসাইটি, ঢাকা ইউনিভার্সিটি মাইম অ্যাকশন, ঢাকা ইউনিভার্সিটি সায়েন্স সোসাইটি, ঢাকা ইউনিভার্সিটি ক্যারিয়ার ক্লাব, প্রভাতফেরী, পরিবেশ সংসদ, আইটি সোসাইটি, স্লোগান একাত্তর, ঢাকা ইউনিভার্সিটি মডেল ইউনাটেড নেশন্স অ্যাসোসিয়েশন, কুইজ সোসাইটি, কালচারাল সোসাইটি, ব্যান্ড সোসাইটি, রিসার্চ সোসাইটি, নাট্যসংসদ, সাহিত্য সংসদ সহ প্রায় ২০টির মতো সংগঠন।
সংগঠনগুলো আশা করছে, তারা দ্রুত সময়ের মধ্যে বড় ধরনের একটি ফান্ড সংগ্রহ করতে সমর্থ হবে এবং তা দ্রুত দুর্গত এলাকার মানুষের মাঝে পৌঁছাতে পারবে।










