সম্প্রতি একটি ঘটনা আমাদের বিবেককে মারাত্মকভাবে নাড়া দিয়েছে। ঢাকার স্যার জন উইলসন স্কুলের দুই শিক্ষার্থীকে বহিস্কার করেছিলো স্কুল কর্তৃপক্ষ। স্কুলে ফিরতে ওই শিশুদের উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হতে হয়েছিলো।
ঘটনার পেছনের ঘটনা হচ্ছে: অভিযুক্ত বাবা একদিন তার সন্তানকে স্কুল ছুটির পর আনতে গেলে স্কুল কর্তৃপক্ষের কেউ একজন তার কাছে সদ্য শেষ হওয়া স্কুলের স্পোর্টস ইভেন্টের ব্যাপারে মতামত জানতে চেয়েছিলেন। একজন সচেতন অভিভাবকের মতোই জনাব মিনহাজ উত্তর দিয়েছিলেন, ইভেন্ট ভালো ছিলো তবে খেলার মাঠখানা আরো বড় হলে ভালো হতো। যথার্থই একজন সচেতন অভিভাবকের মতো উত্তর দিয়েছেন। কথার মাত্রা ছাড়িয়ে তা শেষ হয়েছিলো কর্তৃপক্ষের অফিসে হাজিরা দেবার নোটিশের মাধ্যমে।
তাহলে কি অভিভাবকের মতো মতামত দেয়াটাই ছিলো সেই ভদ্রলোকের অপরাধ? আর সে এমনই গুরুতর অপরাধ যে, স্কুল তার শোধ নিয়েছে নিরপরাধ দুটি বাচ্চাকে স্কুল থেকে বহিস্কারের মাধ্যমে। সত্যি অনেক বড় অপরাধ বটে!
ফলাফল হলো জনাব মিনহাজ তার সন্তানদের শিক্ষাজীবন ফিরিয়ে আনতে এবং ন্যায়বিচারের আশায় স্কুল কর্তৃপক্ষের এই অন্যায় সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে মামলা করেন। টেলিভিশনের পর্দায় বাচ্চা দুটোকে দেখলাম স্কুল ড্রেস পরে হাইকোর্টের বারান্দায় বাবা মায়ের হাত ধরে বেরিয়ে আসছে। যদিও হাইকোর্ট স্কুলের সিদ্ধান্তকে বাতিল করে তাদের শিক্ষাজীবন চালিয়ে যাবার পক্ষেই রায় দিয়েছেন, কিন্তু মানুষ হিসেবে আমাদের নীতি-নৈতিকতা কোথায় দাঁড়িয়েছে যে বাচ্চারা স্কুলে পড়তে পারবে কি পারবে না সেই সিদ্ধান্তের জন্য কোর্টের দুয়ারে ঘুরতে হয় দুটি বাচ্চাকে!
প্রশ্ন হচ্ছে: সেই স্কুল তাহলে কী শিখাচ্ছে? তাদের উদ্দেশ্য কী এবং কোন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তারা শিক্ষা নিয়ে কাজ করতে এসেছে? আমাদের দেশে বর্তমানে যে বহুমুখী এবং বহু ধারার শিক্ষা ব্যবস্থা চলছে আর তা যে অসঙ্গতিপূর্ণ এ ঘটনাটি যেনো আরেকবার আমাদেরকে তা মনে করিয়ে দিলো।
বর্তমানে সারাদেশে যে আকৃতিতে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল গড়ে উঠছে তার কয়টি সরকারের নীতিমাল অনুযায়ী চলছে এবং তাদের মনিটরিং কীভাবে করা হচ্ছে সে বিষয়ে যথেষ্ট তর্ক করার আছে। মনে হয় না কেউ এটা অস্বীকার করবেন।
দেশে আজ যে সামাজিক বিশৃঙ্খলা চলছে তার মূল কারণ যদি আমরা জানতে চাই তবে অবশ্যই পারিবারিক শিক্ষার পাশাপাশি আসবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকার কথা। সন্তানের নীতি-নৈতিকতা, মূল্যবোধ গড়ে উঠার পেছনে সব থেকে বড় ভূমিকা আছে পরিবারের এবং পারিবারিক ভিত্তির উপর নির্ভর করেই আমরা যাই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় আর জীবনের একটা বিরাট সময় আমরা পার করি বিদ্যালয়ে।
সে বিদ্যালয়ের শিক্ষাই যদি শুরু হয় কোর্টের বারান্দা থেকে শিক্ষা জীবন চালিয়ে যাবার হুকুমজারীর মাধ্যমে তাহলে সেইসব শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ের উপর কীভাবে আস্থা বা বিশ্বাস রাখতে পারবে? আস্থা বিশ্বাসের ঘাটতি নিয়ে কি একটা স্বাভাবিক সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারবে? শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীর মধ্যে যদি একটা নিবিড় সম্পর্ক না থাকে তবে কে কাকে গড়ে তুলবে আর সেই শিক্ষার্থী কী নিয়ে বেড়ে উঠবে এবং পরবর্তী জীবনে সে সমাজের জন্য কী বয়ে নিয়ে আসবে সে ব্যাপারে যথেষ্ট ভাবার অবকাশ আছে।
আজকের সন্তান আগামীর ভবিষ্যত। আজকে যারা কচিকাঁচা তাদের মধ্য থেকেই বেরিয়ে আসবে সামনের দিনের নেতৃত্ব। নেতৃত্ব কখনো নিজে নিজে গড়ে উঠে না, তাদেরকে গড়ে তুলতে হয়। তাই দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে অর্থনৈতিক অগ্রগতির পাশাপাশি আমাদের দরকার একটি শক্তিশালী জাতি গঠনের দিকে মনযোগী হওয়া। ‘শিক্ষাই জাতীর মেরুদণ্ড’ শুধু মুখে বললে আর পড়ার বইয়ে থাকলে হবে না, মেরুদণ্ড শক্ত করতে দরকার স্বাস্থকর ও পুষ্টিকর খাবার অর্থাৎ একটি শক্তিশালী এবং কার্যকর শিক্ষা ব্যবস্থা। আমরা কি আসলেই সেদিকে যথেষ্ট নজড় দিচ্ছি!








