যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে এই প্রজন্মকে রুখে দাঁড়াবার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন শহীদ জননী জাহানারা ইমাম। তিনি ছিলেন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার মা, বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও সংগঠক। আজ তার ৮৮তম জন্মদিন।
১৯২৯ সালের ৩ মে অবিভক্ত বাংলার মুর্শিদাবাদ জেলার সুন্দরপুর গ্রামে জাহানারা ইমাম জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলায় তার ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট পিতা আবদুল আলীর তত্ত্বাবধানে তিনি রক্ষণশীলতার বাইরে এসে আধুনিক শিক্ষা গ্রহণ শুরু করেন।
তার স্বামী ইঞ্জিনিয়ার শরীফ ইমামও তাকে লেখাপড়ায় অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। ১৯৪৫ সালে কলকাতার লেডি ব্রাবোর্ন কলেজ থেকে তিনি বিএ পাস করেন। বিএড পাস করার পর তিনি ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে প্রাইভেট পরীক্ষার্থী হিসেবে বাংলায় এমএ পাস করেন।
ময়মনসিংহের বিদ্যাময়ী বালিকা বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে তার কর্মজীবন শুরু হয়। ১৯৫২ থেকে ১৯৬০ পর্যন্ত তিনি সিদ্ধেশ্বরী গার্লস স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা ছিলেন। এর পর ফুলব্রাইট স্কলার হিসেবে তিনি আমেরিকা থেকে উচ্চশিক্ষা নিয়ে ১৯৬৬ সালে ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন এবং ১৯৬৮ সালে তা ছেড়ে দিয়ে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যোগ দেন।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তিনি ছেলে রুমী ও স্বামীকে হারান। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস তার কেটেছে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও ত্রাসের মধ্য দিয়ে। এ সময় তার মনের মধ্যে ছিল দেশপ্রেম ও স্বাধীনতার স্বপ্ন। এ দুঃসময়ে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের নানাভাবে সাহায্য করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের এসব বৃত্তান্ত তিনি দিনলিপি আকারে নানা চিরকুটে, ছিন্ন পাতায় ও গোপন সংকেতে লিখে রেখেছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধের এ দিনলিপি তিনি ১৯৮৬ সালে একাত্তরের দিনগুলি নামে প্রকাশ করেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক মর্মস্পর্শী এ বৃত্তান্ত জনমনে ব্যাপক সাড়া জাগায়। একাত্তরের দিনগুলি ছিলো একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার মায়ের দৃঢ়তা আর আত্মত্যাগের অনন্য উদাহরণ।
শহীদ জননীর নেতৃত্বে ১৯৯২ সালের ১৯ জানুয়ারি গঠন করা হয়- ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি। ওই সময়ের শহীদ জননীর স্মৃতি ও গুরুত্ব তুলে ধরেন একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহরিয়ার কবির।
তিনি চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, ১৯৯১ সালের ২৯ ডিসেম্বর গোলাম আযমকে জামায়াতে ইসলামী তাদের দলের আমীর ঘোষণা করলে নাগরিক আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। ১৯৯২ সালের ১৯ জানুয়ারি দেশের ১০১ জন বরেণ্যব্যক্তিদের একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি গঠিত হয় জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে। এই কমিটি ১৯৯২ সালে ২৬ মার্চ ’গণআদালত’ এর মাধ্যমে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে একাত্তরের নরঘাতক গোলাম আযমের ঐতিহাসিক বিচার অনুষ্ঠান করে।
শাহরিয়ার কবির আরও বলেন, শহীদ জননী জাহানারা ইমামের দেখিয়ে দেওয়া পথে আমরা এখনো হাঁটছি। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীতে নাগরিক আন্দোলন চলছে, তার সর্বশেষ প্রমাণ ২০১৩ সালের শাহবাগের গণজাগরণ। সেখানে একমাত্র জাহানারা ইমামের পোস্টার শোভা পেয়েছে যেখানে লেখা ছিল আমরা জাহানারা ইমামের আন্দোলনের সন্তান।
মৃত্যুর আগে জাহানারা ইমাম মুখের ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। অসুস্থ অবস্থায়ও তিনি একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির কার্যক্রমে উৎসাহ দিয়ে এসেছেন। ১৯৯৪ সালের ২৬ জুন আমেরিকার মিশিগান স্টেটের ডেট্রয়েট শহরের হাসপাতালে তিনি মারা যান।
খুব ছোটবেলা থেকেই কাছ থেকে জাহানারা ইমামকে দেখেছেন সুরকার, ভাষা সৈনিক ও মুক্তিযোদ্ধা আলতাফ মাহমুদের মেয়ে শাওন মাহমুদ। তিনি শহীদ জননীর স্মৃতি তুলে চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, আমি ছোট বেলা থেকেই তাকে দেখেছি আমার মতে, তিনি একজন পূর্ণাঙ্গ বাঙ্গালী স্মার্ট মহিলা ছিলেন, যেমনটা আমি এখনো কারও মধ্যে পাইনি। উনি যে ধরণের বই আর গান শুনতেন আমাদের প্রজন্ম তা কল্পনায় করতে পারবে না।
শাওন মাহমুদ আরও বলেন, বেশ কয়েকদিন আমাকে তার গাড়ীতে নিয়ে ঘুড়িয়েছেন, বাংলা বা ইংরেজী তার বাচনভঙ্গি ছিল অসাধারণ, ছেলে রুমীকে সব সময়ই ইংরেজীতে চিঠি লিখতেন।
শহীদ জননী জাহানারা ইমামের আদর্শ আমরা কতোটুকু ধরে রাখতে পেরেছি এমন প্রশ্নের জবাবে শাওন মাহমুদ চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, আমি ব্যক্তিগত মতামত আমরা তার আদর্শ ধরে রাখতে পারি নাই। কারণ আমরা শুধু তার আদর্শ মুক্তিযুদ্ধের যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রামে বদ্ধ করে ফেলেছি। তিনি সর্বগুণে গুণান্বিতা ছিলেন।
শুধু নারী হিসেবে নয় একজন মানুষ হিসেবে শহীদ জননী জাহানারা ইমাম ছিলেন আমার আইডল।









