রোহিঙ্গা নির্যাতনের বিষয়ে মিয়ানমার সরকারের অনৈতিক অবস্থানের কারণে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে তাদের কূটনৈতিক সম্পর্ক চরম হুমকির মুখে পড়েছে। রোহিঙ্গাদের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালানোর কারণে বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মুসলিমপ্রধান দেশগুলোর জনগণের মাঝে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ সৃষ্টি হওয়ায় দেশটির সঙ্গে সেসব দেশের সম্পর্ক দ্রুতই খারাপ হয়ে যাচ্ছে।
এর পরিপ্রেক্ষিতে সোমবার মালদ্বীপ মিয়ানমারের সঙ্গে সব ধরণের সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দেয়। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জানানো হয়, রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে চলমান বর্বরতা ঠেকানোর ব্যবস্থা নেয়ার আগ পর্যন্ত এই সম্পর্কচ্ছেদের সিদ্ধান্ত বহাল থাকবে। দুই দেশের মধ্যে কী পরিমাণ বাণিজ্যিক লেনদেন রয়েছে তা বিবৃতিতে বলা না হলেও এর ফলে অন্য অনেক মুসলিমপ্রধান দেশ একই পথ ধরতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা।
একই দিনে মিয়ানমারের ক্ষমতাসীন দলের নেতা অং সান সু চি এবং সেনাপ্রধান জেনারেল মিন অং হালাইংয়ের সঙ্গে দেখা করেছেন ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেতনো মারসুদি। বৈঠকের উদ্দেশ্য ছিল রোহিঙ্গা সঙ্কট নিরসনে আরও বেশি চেষ্টা করার জন্য সু চি সরকারকে চাপ দেয়া।
রেতনোকে এই সফরে পাঠানোর ঘোষণা দেয়ার সময় কারণ হিসেবে রোববার ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদো সাংবাদিকদের বলেন, ‘আবার সহিংসতা, এই মানবিক বিপর্যয় এখনই থামানো দরকার।’
উইদোদোর এই ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা আগেই রাজধানী জাকার্তায় মিয়ানমার দূতাবাসে পেট্রোল বোমা ছোড়া হয়। সোমবারও বহু মানুষ ওই দূতাবাসের সামনে বিক্ষোভ মিছিল করে। তবে পুরো মিশন এলাকা পুলিশ কাঁটাতার দিয়ে ঘিরে রাখায় তারা ভেতরে ঢুকতে পারেনি।
এছাড়া রোহিঙ্গা ইস্যুতে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ যারিফ একটি টুইটবার্তা পোস্ট করেন। সেখানে তিনি বলেছেন, ‘রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে চলতে থাকা সহিংসতার মুখেও পুরো বিশ্ব নিশ্চুপ। এই জাতিগত নির্মূল প্রক্রিয়া ঠেকানোর জন্য আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ অতি জরুরি। জাতিসংঘের অবশ্যই এ বিষয়ে বসা দরকার।’

মুসলিমপ্রধান দেশ মালয়েশিয়ায়ও আগস্ট মাসে মিয়ানমারে নতুন করে সহিংসতা শুরু হওয়ার পর থেকে গণআন্দোলন চলছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক টুইটবার্তায় বলেছেন, ‘আমরা চাই পরিস্থিতি শান্ত হোক ও নিয়ন্ত্রণে আসুক। আমাদের রোহিঙ্গা ভাইবোনেরা যে শোচনীয় অবস্থার মুখে আছে, মিয়ানমার এবং পুরো অঞ্চলের কল্যাণের জন্যই এর সমাধান প্রয়োজন।’
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সেনাবাহিনীর বহুদিন ধরে চলমান সংঘর্ষ-সহিংসতা সঙ্কট সমাধানে ২০১৬ সালের আগস্টে গঠিত হয় অ্যাডভাইজরি কমিশন অন রাখাইন স্টেট। জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বে ওই কমিশন এক বছরের তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন মিয়ানমারের ক্ষমতাসীন দলের প্রধান অং সান সু চির কাছে জমা দেয় চলতি বছরের ২৪ আগস্ট।
৬৩ পৃষ্ঠার এই প্রতিবেদন জমা দেয়ার কয়েক ঘণ্টা পরই ২৪ আগস্ট দিবাগত রাতে ত্রিশটি পুলিশ ও সেনাচৌকিতে রহস্যজনক হামলার ঘটনা ঘটে। হামলায় নিহত হয় নিরাপত্তা বাহিনীর ১২ সদস্য। তারপরই হামলার জন্য রোহিঙ্গা ‘জঙ্গি’দের দায়ী করে জবাব হিসেবে সেনাবাহিনী পুরো অঞ্চলে হত্যাযজ্ঞ শুরু করে।
সেনাবাহিনীর ওই হামলায় এখনও পর্যন্ত ৪শ’র বেশি মানুষ মারা গেছে, আর প্রাণভয়ে লাখো রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে পাড়ি জমাচ্ছে বাংলাদেশে। নৌপথে পালিয়ে আসার পথে নৌকাডুবিতে মারা গেছে আরও অর্ধশতাধিক রোহিঙ্গা।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, আনান কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়ন না করার জন্যই রোহিঙ্গাদের উপর কথিত অভিযোগ এনে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী এই হত্যাকাণ্ড শুরু করে।








