মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে আসা রোহিঙ্গাদের নিবন্ধনের আওতায় আনতে ১৭ টি পয়েন্টে শুরু হচ্ছে বায়োমেট্রিক পদ্ধতির নিবন্ধন। প্রাথমিকভাবে পাসপোর্ট অফিসের সহায়তায় এই নিবন্ধনের কার্যক্রম চালানো হবে। এছাড়া রোহিঙ্গা বিষয়ক নিয়ন্ত্রণ কক্ষ চালু করেছে কক্সবাজার জেলা প্রশাসন।
কিন্তু বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের শুধু বায়েমেট্রিক নিবন্ধনেই হবে না, বরং তাদের ভবিষ্যৎ কী হবে সে বিষয়ে দ্রুত পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সাংবাদিক ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট আরিফ জেবতিক। শনিবার বিকেলে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে দেয়া এক স্ট্যাটাসে তিনি নিজের এই ভাবনার কথা জানান।
স্ট্যাটাসে তিনি বলেন, “লেখক হুমায়ূন আহমেদের যখন অনেক টাকা পয়সা হয়েছে, তখন তিনি তার মা’র কাছে জানতে চেয়েছিলেন যে মায়ের কোনো সাধ আছে কী না। হুমায়ূনের মা বলেছিলেন, তোমার উপর আমার একটা আদেশ আছে বাবা। কেউ যদি কখনো টাকা পয়সা ধার চায়, তাকে তুমি ফেরাতে পারবে না। আমি জীবনে অনেকবার অনেকের কাছে ধারের জন্য গিয়েছি, ধার নেয়ার কষ্ট আমি জানি।
জাতিগতভাবে আমাদের একই অবস্থা। আমরা ১ কোটি মানুষ পেছনে পাকিস্তানি সেনাদের আক্রমণের মুখে ঘরবাড়ি ছেড়ে ভারতে উদ্বাস্তু হয়েছি, সেখানে ক্যাম্পে ক্যাম্পে আমাদের রাত-দিন কেটেছে; শুধু একারণেই জাতি হিসেবে আমরা এক ধরনের বাধ্যবাধকতার মধ্যে রয়েছি। আমরা চাইলেই গণহত্যার শিকার কোন জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিতে না করতে পারি না, উচিত নয়।
কিন্তু এই নৈতিক বাধ্যবাধকতার মধ্যে থেকেও আমাদেরকে অন্য বিষয়গুলোও ভাবতে হচ্ছে। কারণ ৭১ সালে আমরা যখন ভারতে উদ্বাস্তু হয়েছি তখন আমাদের নেতা ছিল, সংগঠন ছিল, বাঙালি সেনা-পুলিশ-ইপিআর ছিল, আন্তর্জাতিক ক্ষমতার ভারসাম্যের জন্য তখন সোভিয়েত লবি আমাদের সাথে শক্তভাবে ছিল- এই সবকিছু মিলিয়ে আমাদের ভারত অবস্থান যে দীর্ঘস্থায়ী হবে না সেরকম একটি আশাবাদ সবখানেই ছিল। তাছাড়া ভারতের জন্য আমরা কোনো রিস্ক ছিলাম না, কখনো ভারতের মধ্যে কোন ধরনের আক্রমণে আমরা জড়িয়ে পড়ব- এমন সম্ভাবনা ছিল না।
কিন্তু রোহিঙাদের ক্ষেত্রে অবস্থাটা খুবই শোচনীয়। তাদের নিজেদের দেশের মগরা তাদেরকে দেখলেই জবাই করে দিচ্ছে অথবা আগুনে পুড়িয়ে দিচ্ছে, তাদের কোনো অবিংসবাদী নেতা নেই, রাজনৈতিক সংগঠন নেই, বিশ্ব জনমত তৈরির কোনো বড় উপায় নেই এবং সবচাইতে ভয়ানক বিষয় হচ্ছে যে বিশ্বের সব মোড়লরা একযোগে এই গণহত্যাকে সমর্থন করছে। এই পরিস্থিতিতে রোহিঙাদের আবার মায়ানমারে ফেরত যাওয়া প্রায় অসম্ভব একটা ব্যাপার। বাংলাদেশে আটকে পড়া পাকিস্তানিদেরকে যেভাবে পাকিস্তান গত ৪৫ বছর ধরে ফিরিয়ে নিয়ে যায়নি ঠিক একই অবস্থা হবে রোহিঙাদের ক্ষেত্রে, এমন সম্ভাবনাই বেশি।
এই হতাশ জনগোষ্ঠীকে নিয়ে তাই নানা আন্তর্জাতিক চক্রান্ত হবে দীর্ঘমেয়াদে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে আমাদের দেশে।
আমরা স্বীকার করি বা না করি, অফিশিয়ালি সীমান্ত খুলে দেই বা না দেই, আগের রোহিঙারা ছাড়াও শুধু গত এক সপ্তাহে ২ লাখের মতো লোক বাংলাদেশে ঢুকে পড়েছে। এদেরকে শুধু বায়োমেট্রিক নিবন্ধন করে ক্যাম্পে ঘিরে রেখে দিলেই হবে না। এদেরকে নিয়ে কী করা হবে, সেই পরিকল্পনা খুব দ্রুত করা উচিত এবং সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নও শুরু করা উচিত।”









