আপিল বিভাগে মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকা শুকুর আলীর বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ রায় না পেয় এবং রিভিউ প্রস্তুতি চলছে বলে আইনজীবীর প্রার্থনার প্রেক্ষাপটে ওই আসামির ফাঁসি কার্যকরের সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকলে তা আপাতত স্থগিত রাখতে নির্দেশ দিয়েছেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত।
রোববার প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের পাঁচ বিচারপতির ভার্চুয়াল বেঞ্চ মৌখিক এই আদেশ দেন। এসময় আদালতে আসামি পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী হেলাল উদ্দিন মোল্লা। আর রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বিশ্বজিৎ দেবনাথ।
আজকের আদেশের বিষয়ে আইনজীবী হেলাল উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, ‘গত ১৮ আগস্ট সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ আমার আসামি শুকুর আলীর মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। আর এই মামলার অপর তিন আসামির সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন এবং এই তিনজনকে কারাগারের কনডেম সেল থেকে সাধারণ সেলে স্থানান্তরে অ্যাডভান্স অর্ডার কারা কর্তৃপক্ষকে পাঠাতে নির্দেশ দেন। সে অনুযায়ী রায়ের এ্যাডভান্স অর্ডারটি কুষ্টিয়ার বিচারিক আদালত হয়ে কারাগারে যায়। পরবর্তীতে শুকুর আলীর পরিবার আমাকে জানায় যে, অ্যাডভান্স অর্ডারের পর রাষ্ট্রপতির কাছে করা প্রাণভিক্ষার আবেদন নামঞ্জুর হলে আসামির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রস্তুতি নেয় কারা কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে আমি আপিল বিভাগের রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। কিন্তু রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি প্রকাশ না হওয়ায় এবং ওকালতনামার পেতে দীর্ঘসূত্রতার প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আজ আমি আপিল বিভাগের নজরে আনি। সর্বোচ্চ আদালতকে আমি বলি যে, রিভিউ আবেদন করার আগে যেন আমার আসামির ফাঁসি কার্যকর করা না হয়। আদালত আমার এই প্রার্থনা বিবেচনায় নিয়ে আমাকে আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে একটি আবেদন করতে বলেন। এসময় আদালত অ্যাটর্নি জেনারেলকে বলেন আইজি প্রিজন্সকে বলে দিতে যে, আপাতত ফাঁসি কার্যকরের সিদ্ধান্ত যেন স্থগিত রাখা হয়।’
এ বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, ‘আজকে একজন আইনজীবী আপিল বিভাগে আবেদন করলেন যে, তার আসামির আপিলটা ডিসমিস (খারিজ) হয়েছে কিন্তু তারা এখনো পূর্ণাঙ্গ রায়টি পাননি। রায়টি পেলে তারা রিভিউ করতে পারবেন কিন্তু এর আগেই নাকি আসামির ফাঁসি কার্যকরের পদক্ষেপ নিচ্ছে কারা কর্তৃপক্ষ। তখন আদালত আইজি প্রিজন্সকে বলতে বললেন যে, পূর্নাঙ্গ রায়ের আগে যেন ফাঁসি কার্যকর করা না হয়। এছাড়া সর্বোচ্চ আদালত বলেছেন, পরবর্তীতে বিষয়টি আমাদের কাছে (আদালতে) এলে একটা গাইডলাইন দিয়ে দেবেন।’
আজকের মৌখিক আদেশের প্রসঙ্গে অ্যাটর্নি জেনারেল আরও বলেন, ‘মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি যারা কনডেম সেলে থাকে, তাদের যখন সাজা কমে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয় তখন তাদের কনডেম সেল থেকে সরিয়ে নরমাল সেলে আনা হয়। যাতে সাজা কমা আসামিকে আর একটুও যেন কনডেম সেলে থাকতে না হয়। সে অনুসারেই এই মামলায় সাজা কমে যাবজ্জীবন পাওয়া তিনজনের ক্ষেত্রে কনডেম সেল থেকে সাধারণ সেলে নিতে অ্যাডভান্সড অর্ডার দিয়েছিলেন সর্বোচ্চ আদালত।’
১৭ বছর আগে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর ১৩ বছরের শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যার দায়ে শুকুর আলীর মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে অপর তিন আসামির সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত।
আসামিদের করা জেল আপিলের শুনানি নিয়ে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের ৫ বিচারপতির ভার্চুয়াল বেঞ্চ গত ১৮ আগস্ট এই রায় দেন। ওই রায়ে আদালত সাজা কমে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পাওয়া তিনজনকে কনডেম সেল থেকে সাধারণ সেলে স্থানান্তরের নির্দেশ দেন। ওইদিন আদালতে আসামিপক্ষে শুনানিতে ছিলেন অ্যাডভোকেট এস এম শাহজাহান ও ব্যারিস্টার রাগীব রউফ চৌধুরী। আর রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বিশ্বজিৎ দেবনাথ।
এই মামলার বিবরণে জানা যায়, ২০০৪ সালের ২৫ মার্চ রাতে দৌলতপুর উপজেলার লালনগর গ্রামের ১৩ বছর বয়সী ওই শিশু প্রতিবেশীর বাড়ি থেকে টেলিভিশন দেখে বাড়ি ফেরার পথে আসামিরা অপহরণ করে। পরবর্তীতে লালনগর ধরমগাড়ী মাঠের একটি তামাক ক্ষেতে নিয়ে তাকে পালাক্রমে ধর্ষণ শেষে হত্যা করে। পরদিন ভিকটিমের বাবা পাঁচজনকে আসামি করে দৌলতপুর থানায় মামলা করেন। ওই মামলার বিচার শেষে ২০০৯ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি পাঁচ আসামির মৃত্যুদণ্ড দিয়ে রায় দেন কুষ্টিয়ার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক আকবর হোসেন। সে পাঁচজনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয় তারা হলেন- কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার লালনগর গ্রামের খয়ের আলীর ছেলে শুকুর আলী, আব্দুল গনির ছেলে কামু ওরফে কামরুল, পিজাব উদ্দিনের ছেলে নুরুদ্দিন সেন্টু, আবু তালেবের ছেলে আজানুর রহমান ও সিরাজুল প্রামাণিকের ছেলে মামুন হোসেন।
পরবর্তীতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে আসে এবং আসামিরা রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন। এরই মধ্যে আসামি কামু ওরফে কামরুল মারা যায়। এরপর ডেথ রেফারেন্স ও আসামিদের আপিলের শুনানি শেষে হাইকোর্ট চার জনেরই মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে রায় দেন। সে রায়ের বিরুদ্ধে করা জেল আপিলের শুনানি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ শুকুর আলীর মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। আর আসামি নুরুদ্দিন সেন্টু, আজানুর রহমান ও মামুন হোসেনের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন।








