তাঁর সাথে আমার পরিচয় হয়েছিল বছর দশেক আগের এক সন্ধ্যায়, বেশ নাটকীয় ভাবে। তিনি তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে সেন্ট্রাল হাসপাতালে এসেছেন। ডাক্তারদের চেম্বারের বাইরে সাজানো সারি সারি চেয়ারে তিনি বসে আছেন। তাঁর আশেপাশে আরও মানুষজন। দেয়ালে ঝুলে থাকা টেলিভিশনে চলছে ন্যাশনাল জিওগ্রাফি। তাঁর হাতে কাগজপত্র। তাঁর চিন্তাক্লিষ্ট মুখে কি ছিল বিষণ্ণতার প্রলেপ!
এতদিন পর তিনি কি চিন্তিত ছিলেন না বিষণ্ণ ছিলেন তা বেমালুম ভুলে গেছি। ভুলে যাওয়াটাই ভালো কারন মুর্তজা বশীর স্যারদের মতো প্রাণের উচ্ছলতায়, আবেগের উদ্দাময়তায় ভরপুর মানুষরা কেন অমন বিষণ্ণ হয়ে থাকবেন! এসব স্যারদের একদমই মানায় না। একদমই না।
দশ বছর ইতালির মিলান শহরে থাকার স্মৃতিকে পোষা গিরিবাজ কবুতরের মতো কাঁধে ঝুলিয়ে দেশে ফিরে এসেছি তখন। কাজ করি দেশের এক শীর্ষ স্থানীয় সাপ্তাহিক কাগজে। সাপ্তাহিক ২০০০ এ। কি একটা কাজে সেদিন আমিও গিয়েছিলাম হাসপাতালে। বাংলাদেশের শিল্প আন্দোলনের পঞ্চাশ বছর বইটি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়া হয়েছে অনেক আগেই। সেই বইতে মুর্তজা বশীর, রশিদ চৌধুরী, হামিদুর রহমান, নভেরাসহ আরও অনেকের কথা আছে। এছাড়াও মুর্তজা বশীর স্যার নানাকারনে আমার কাছে প্রিয় মানুষ হয়ে আছেন, তাঁকে বলা হয় নি, জানানো হয়নি। সুযোগই পাইনি জানাবো কিভাবে! তবে আশেপাশে লিখিয়ে বন্ধুবান্ধব, শিল্পীদের কাছ থেকে যতটুকু শুনেছি তাতে করে মুর্তজা বশীর স্যার সম্পর্কে একটা বানানো ধারণা করে নিয়েছি এরকম তিনি একজন অসম্ভব রাগী মানুষ, তিনি যার তার সাথে কথা বলেন না। তাঁর সাথে কথা বলতে গেলে শিল্প সাহিত্য সম্পর্কে বিশদ জেনে শুনে তবেই যেতে হবে। আর এসব জেনে শুনে তাঁর সামনে গেলে তিনি ( মুর্তজা বশীর ) নাকি আগন্তুককে আচ্ছামতো ব্যান্ড বক্স ধোলাই দিয়ে ছেড়ে দেন।
বন্ধুবান্ধবদের কল্যাণে এরকম একটা পূর্ব ধারণা তো ছিলই তাঁর সম্পর্কে। তারপরও সেদিন তাঁর অমন চিন্তিত চেহারায় দেখে নিজেও একটু চিন্তিত হয়েছিলাম। আমার চোখের সামনে বসে আছেন মুর্তজা বশীর আর আমি তাঁর সাথে কথা বলব না এও কি হয়! তাঁর সাথে কে কথা বলল না বলল তাতে আমার কি এসে যায়!
সেই মুহূর্তে আমার মাথায় এক অদ্ভুত যুক্তি খেলে গেল। আমি ভাবলাম আমি তো আর দশজনের মতো না। মুর্তজা বশীর ’৫৩ থেকে ৫৬ সাল ইতালিতে ছিলেন। আর আমিও ইতালিতে ছিলাম বছর দশেক। সো আমরা দু’জনেই সম্পর্কের দিক থেকে ইতালিয়ানো। ইতালিয়ান ভাষায় ফ্রাতেল্লো মানে ভাই। আমরা সেই সূত্রে তা-ই। কিন্তু স্যারকে কি সেকথা বলা যাবে!
মানুষ বিপদে পড়লে নাকি তার বুদ্ধি বাড়ে। আমারও কি তাই হয়েছিল! জানি না তবে সেই সন্ধ্যায় মুর্তজা বশীর স্যারের সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমি আবিষ্কার করলাম ইতালিতে একসময় থাকার মধ্যকার সম্পর্ককে বিবেচনায় আনলে অন্য দশজনের চেয়ে আমারই বৈধ অধিকার বেশি স্যারের সাথে কথা বলার।
মুর্তজা বশীর টেলিভিশন স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছেন। বাইরে তখন বিকেল পাততাড়ি গুটিয়ে নিয়ে সন্ধ্যাকে ডাকছে। বাইরে থেকে তাঁকে দেখে মনে হবে চোখের সামনে যেন বসে আছেন পুরনো কলকাতার সিনেমার রাশভারী, গম্ভীর ছবি বিশ্বাস। তাঁকে সেরকমই লাগছে। স্ত্রী অসুস্থ। মেয়েকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে এসেছেন। স্ত্রী আর মেয়েকে চেম্বারে ঢুকিয়ে দিয়ে তিনি বাইরে একা একা বসে আছেন।
রাশভারী মনে হলেও তাঁর সঙ্গে একবার ভাব জমে গেলে এই মানুষটাকেই মনে হয় যেন বাচ্চাশিশুদের চেয়েও বাচ্চা।
কিভাবে তাঁর সঙ্গে কথা বলব? বৈধ অধিকার বলে ইতালিয়ান ভাষার দ্বারস্থ হলাম আমি। আমি তাঁর দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে তাঁকে চমকে দিয়ে বললাম, বোনও ছেরা সিনোরে, কমে ভা? ( শুভ সন্ধ্যা, জনাব। আপনি কেমন আছেন?)
আমার কথা শুনে তিনি সত্যি সত্যি চমকে আমার দিকে তাকিয়েছিলেন। তারপর তিনি খানিক অবাক হয়ে যাওয়ার চেহারা করে আমাকে বললেন, লিঙ্গুয়া ইতালিয়ানো!
আমি বলেছিলাম, সি, কমে নো! ( অবশ্যই, কেন নয়)।
তাঁর অবাক তিরোহিত হয় না। তিনি আমার দিকে পিটপিট করে তাকিয়ে থেকে বললেন, আপনি আমার সঙ্গে ইতালিয়ান ভাষায় কথা বললেন কেন?
আমি আমার ইতালিতে থাকার কথা এবং তাঁকে দেখে কিভাবে তাঁর সঙ্গে কথা বলব- শেষে দুজনের ইতালিতে থাকার সম্পর্ককে হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনায় এনে কথা বলার ক্ষেত্র তৈরি করার কৌশল জানালাম। আমার কথা বলার ধরন ধারণ সম্ভবত তিনি বিশ্বাস করেছিলেন। সেদিন তিনি আমার সঙ্গে টুকটাক কথা বলেছিলেন।
অনেক দিন পর তিনি ইতালিয়ান ভাষা শুনতে পেরে তাঁর ভালো লেগেছে বলে জানালেন তিনি। তারপর তিনি আমাকে তাঁর ফ্লরেন্সে আর ভেনিসে থাকার দিনগুলোর কথা বললেন। তাঁর প্রেমের কথা বললেন। এরপর তিনি আমার সেল নম্বর সেভ করে রাখলেন। সেভ করার সময় তিনি বললেন, আমার ফোন বুকে মাহবুব নামে আরও কয়েকজন আছে, তোমার নাম আমি সেভ করলাম মাহবুব মিলান, এই নামে- ঠিক আছে?
সেই সন্ধ্যায় তিনি আমাকে সেভ করলেন। তারপর থেকে আমি তাঁর সঙ্গে আছি। নানাভাবে মুর্তজা বশীর আমাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছেন। বিশেষ করে এই মানুষটার সততা আর চিন্তার শুদ্ধতা আমাকে বিস্মিত করে রেখেছে। চোখের সামনে শিল্প সাহিত্যের এত এত ফাঁপা বিজ্ঞজনদের ভান ভণিতা দেখি যাঁদের কি কথাবার্তা কি চিন্তা কি বিশ্বাস সব কিছুতেই যোজন যোজন ফারাক তাদের ভিড়ে মুর্তজা বশীর একমাত্র ব্যতিক্রম।
তিনি তাঁর জীবনে কখনোই নিজের ব্যক্তিস্বার্থকে কারো কাছে সঁপে দেননি। তাঁর সমকালে তিনি এক ও অদ্বিতীয়।
সেদিন থেকে তিনি আমাকে অপার মমতায় আপন করে নিয়েছেন। জীবন জীবিকার ফালতু রকম ব্যস্ততার কারণে তাঁর সঙ্গে হয়ত খুব বেশি যোগাযোগ রাখা সম্ভব হয় না। কিন্তু মাঝে মাঝে তাঁকে ফোন করি। ফোন করলে তিনি তাঁর নিজস্ব আন্তরিকতার ঢঙে খোঁজখবর নেন। প্রিয়তম স্ত্রীর মৃত্যুর পর থেকে তাঁর শরীরটাও খুব একটা ভালো যাচ্ছে না। সারাদিন ঘরে একা একা থাকেন। মেয়েরা খোঁজখবর নেন। আর শুক্রবারের জন্য অপেক্ষায় থাকেন কবে আসবে সেই দিন। প্রতি শুক্রবার মেয়ের সঙ্গে স্ত্রীর কবরের পাশে গিয়ে বসে থাকেন।
পেশাগত কারণে কয়েক দফায় মুর্তজা বশীরের সাক্ষাৎকার নেয়ার সৌভাগ্য হয়েছে আমার। সাংবাদিকতা করার চেয়ে আমার আগ্রহ লেখালেখিতে- একথা জানার পর আমার প্রতি তাঁর স্নেহ, ভালোবাসা যে বেড়ে গিয়েছিল সেটা আমি বিলম্বে হলেও বুঝতে পেরেছিলাম। একদিন একথা বলতেই তিনি বললেন, সাংবাদিকতা করার পূর্বশর্তই হলো তাকে সাহিত্যটা জানতে হবে, বুঝতে হবে।
মুর্তজা বশীর যখনই আমার সাথে কথা বলেন ঘুরে ফিরে তিনি ইতালির কথা বলেন। এখন ইতালির মেয়েরা কেমন? ইতালিয়ান মেয়েরা কি এখনও আগের মতো সরল সুন্দর আর প্রেমময়ী! তিনি যখন অবিচল শিশু সারল্যে আমার কাছে এসব জানতে আমি তখন তাঁকে বলি, এখনও ইতালিয়ান মেয়েরা আগের মতোই আছে…
একদিন তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, এ জীবনে আপনার কি কোনো বিষয় নিয়ে ক্ষোভ আছে?
আমার কথায় তিনি স্বভাবসুলভ ভঙ্গীতে বললেন, ক্ষোভ! আমার জীবনে কোনোধরনের ক্ষোভ নেই। আমি এসব পছন্দ করি না। তবে আর্থিক সচ্ছলতার দিকে আমার কোনোদিনই লোভ ছিল না। আমি একজন সাধারণ মানুষের মতো ভদ্রভাবে জীবনযাপন করতে চেয়েছি যেখানে অর্থের জৌলুস থাকবে না। তাই সে ব্যাপারে আমার কোনও আক্ষেপ নেই কেননা আমি সরস্বতীকেই চেয়েছিলাম, লক্ষ্মীর দ্বারস্থ হইনি। এ বয়সেও আমাকে অর্থ চিন্তা বা সংসার চালানোর দুশ্চিন্তা জড়িয়ে রেখেছে। এখন এটাকে আমি ক্ষোভ বলে জ্ঞান করি না। আমি বরং এসব নিয়েই এই জীবনে অনেকের চেয়ে ভালো ছিলাম এবং ভালো আছি…
আজ মুর্তজা বশীরের জন্মদিন। এই মানুষটি আজ সাতাশি বছরে পড়লেন। আরও অনেক বছর আপনি আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন- এরকম প্রত্যাশা করি আমরা সবাই।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)










