মুসলমানদের ‘নিষিদ্ধ’ দাবি তোলা রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প শুধু সমালোচনার ঝড় তোলেননি বরং নানা ধর্ম-বর্ণে বর্ণিল মার্কিন সংস্কৃতিতে মুসলিমদের অবদান অগ্রাহ্য করেছেন অবলীলায়।
ক্যালিফোর্নিয়ায় সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডের ছুতোয় মুসলিম বিদ্বেষী বক্তব্য দিয়ে ট্রাম্প যে কার্যত স্ববিরোধীতা করেছেন এবং মার্কিন ইতিহাসে মুসলিমদের অবদান খাটো করেছেন, তা তুলে ধরে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে প্রভাবশালী বৃটিশ গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নানাখাতে নামকরা সব মুসলিমের অবদান ট্রাম্পের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে গার্ডিয়ানের এই প্রতিবেদন। যেখানে উঠে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা যুদ্ধ থেকে শুরু করে প্রকৌশলখাতে এক বাংলাদেশী মুসলিমের অনবদ্য অবদান, চিকিৎসাখাতে এক পাকিস্তানির উজ্জ্বল সাফল্যের দৃষ্টান্ত। আরও আছে সংগীত, খাবার,খেলায় কিংবদন্তী মুসলিম আমেরিকানদের কথা।
মুসলিমরা মার্কিন ইতিহাসের অংশ:
বৃটিশ শাসনের বিরুদ্ধে আমেরিকার জন্য জর্জ ওয়াশিংটনের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়েছিলেন অনেক মুসলিম স্বাধীনতাযোদ্ধা। ভার্জিনিয়ায় ১৭৭৫ ও ১৭৭৮ এর যুদ্ধে বৃটিশ শক্তির বিরুদ্ধে অসীম সাহসের পরিচয় দিয়ে লড়েছিলেন বাম্পেট মুহাম্মদ, ইউসুফ আলীর মতো মুসলমানরা।
তাই স্বাধীন আমেরিকার নীতি ছিলো একজন দেশপ্রেমিক মার্কিনীকে নির্দিষ্ট কোনো ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর পরিচয়ে বেঁধে ফেলা যাবে না। ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্য মার্কিন এই মূলনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
শুধু তাই নয় স্বাধীনতার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে স্বীকৃতি জানানো প্রথম দেশ ছিলো ইসলামিক দেশ মরক্কো!
গগনচুম্বি মার্কিন মহানগরীর কারিগর এক বাংলাদেশি মুসলিম:
মার্কিন নগরীর সুদৃশ্য বহুতল ভবনগুলো হয়তো আকাশ ছুঁতেই পারতো না যদি যুক্তরাষ্ট্রে না যেতেন বাংলাদেশের কৃতি সন্তান ও মুসলিম ফজলুর রহমান খান।
মার্কিন নগর গড়ে ওঠার পেছনে ঢাকায় জন্ম নেয়া এই প্রকৌশলীর অবদানের জন্য তাকে ‘প্রকৌশল বিদ্যার আইনস্টাইন’ বলা হয়। তাঁর ‘ফ্রেম-টিউব’ তত্ত্ব কাজে লাগিয়েই মার্কিন নগরী পেয়েছিলো ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ( টুইন টাওয়ার)। সন্ত্রাসী হামলায় সেটি গুড়িয়ে গেলেও মাথা উচুঁ করে আছে সিয়ার্স টাওয়ার, জন হ্যানকক টাওয়ার, ইউএস ব্যাংক সেন্টারের মতো ভবন।
এমনকি যে ট্রাম্প মুসলিমদের আমেরিকায় ঢুকতে দিতে চান না সেই ট্রাম্পের অহংকারের প্রতীক ‘ট্রাম্প টাওয়ার’ গড়ে উঠেছে ফজলুর রহমানের দেখানো পথে!
অসংখ্য মার্কিনীর জীবন বাঁচানো মুসলিম:
মস্তিষ্কে অস্ত্রপোচারের মতো জটিল কাজে নতুন উদ্ভাবন চালু করে হাজারো মানুষের জীবন রক্ষা ও দুঃসহ যন্ত্রণা দূর করেছেন আইয়ুব উমাইয়া নামের এক পাকিস্তানি নিউরোসার্জন।
১৯৬৩ সালে তার বিশেষায়িত চিকিৎসা পদ্ধতিতে ব্রেন টিউমারসহ মস্তিষ্কের অনেক জটিল রোগের চিকিৎসায় আসে যুগান্তকারী পরিবর্তন।
ক্রীড়া কিংবদন্তী মার্কিন মুসলিম:
মুসলিমরা মার্কিন ক্রীড়া জগতকে সমৃদ্ধ করেছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা’র এই কথাকে কটাক্ষ করে ট্রাম্প প্রশ্ন করেন “কোন খেলা, কারা এরা?”
এই প্রশ্নের জবাব সবার জানা হলেও ট্রাম্পের জন্য তা আবার তুলে ধরেছে গার্ডিয়ান। তিনবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন মুহাম্মদ আলীর কথা যেনো তিনি বেমালুম ভুলে গেছেন!
ইসলাম গ্রহণকারী এই কিংবদন্তীর পাশে বসতে পেরে গর্বিত হওয়া ট্রাম্প আলীকে ‘বন্ধু’ বলেছিলেন ২০০৭ সালে।
অথচ গোড়ামীর চরম মাত্রায় এটাও যেনো ভুলে গেছেন মুসলিম বিদ্বেষী বক্তব্য দেয়া রিপাবলিকান পার্টির এই প্রেসিডেন্ট প্রার্থী।
মার্কিন জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা এনবিএ বাস্কেটবলে শাকিল ও’নিল, করিম আবদুল জব্বার এমনকি মাইক টাইসনের নামও খেয়াল ছিলো না ট্রাম্পের।
যে মুসলিমদের মূল্যায়নে ব্যর্থ ট্রাম্প:
আমেরিকার সংগীতাঙ্গনে হিপ-হপ মিউজিকের সূচনা ও জনপ্রিয়তার পেছনে নামী তারকাদের বাহারী নামের আড়ালে তাদের মুসলিম নাম ঢাকা পড়তেই পারে, তবে তাতে তো আর পরিচয় ঢাকা পড়ে না। মস ডেফ, টি পেইন, নাস, আন্দ্রে, লুপ ফিয়াস্কো, আইস কিউব, বাস্তা রাইমের মতো তারকাদের সবাই ধর্ম পরিচয়ে মুসলিম।
এমনকি সিরিয়ান এক অভিবাসী এর্নেস্ট হামউই’র আইসক্রিম কোন উদ্ভাবন, যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে গণতন্ত্রের বার্তা ছড়ানো ফারাহ পণ্ডিত, অধিকারকর্মী ম্যালকম এক্স, কেমিস্ট্রিতে নোবেল পাওয়া আহমেদ জুয়েইলের মতো অসংখ্য নামকরা মার্কিনী ছিলেন, আছেন যারা ধর্মীয় পরিচয়ে মুসলিম।





