ঈদ উল ফিতর এবং ঈদুল আযহা। মুসলিম বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ দুইটি উৎসব। বাঙালি মুসলিমের কাছে যা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। গাম্ভীর্য ও আনন্দের সাথে যে দিনটি পালিত হয় আমাদের মুসলিমপ্রধান দেশে। ছোটবেলা থেকেই দেখছি বাঙালি ‘বারো মাসে তেরো পার্বণ’-এর জাতি। যেখানে সাম্প্রদায়িকতার বিন্দুমাত্র ছটা পরিলক্ষিত হয়নি। এখনো হয়না। কালের পরিক্রমায় ঈদের উৎসবের রং পাল্টেছে। বেড়েছে এর উৎসবের আকার। বাঙালি মুসলিমের প্রাণের গভীরের যে ঈদ উৎসব তা নতুন বর্ণে আনন্দ বয়ে এনেছে।
ঈদ মানে খুশি, ঈদ মানে আনন্দ। এ ধারণাটাই যেন এই উৎসবের মূলে প্রোথিত। আর ক’দিন বাদেই ঈদ উল আযহা। যা আমাদের কাছে কুরবানির ঈদ হিসেবেই বেশি পরিচিত। মহান আল্লাহ্তায়ালার রাহে মুসলিমরা তার সামর্থ্য অনুযায়ী পশু কুরবানি দিয়ে থাকেন।
ইতিহাস বলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে বাংলায় মুসলিমরা আসে পারস্য অঞ্চল হয়ে। ইরাক, ইরান, আফগানিস্তান হয়ে ভারতবর্ষে প্রবেশ করে। সারা বছরই নানা ধর্মীয় অনুষ্ঠান লেগে থাকতো পরিবারগুলোতে। তবে ঈদুল ফিতর আর ঈদুল আযহাই যেন সবকিছুর ওপরে। যেহেতু গ্রামবাংলার মুসলিমরা ছিলো দরিদ্র এবং প্রান্তিক তাই এ দেশে ইসলাম প্রবেশকালে ওই দুটি দিন প্রথমদিকে বড় হয়ে ওঠেনি। কালক্রমে মুসলিমরা যখন অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধির দেখা পায়, সমাজে একটা মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উদ্ভব ঘটে। তখনই ঈদ এই জনপদে পায় সামাজিক মর্যাদা। ভারতবর্ষের নবাব-বাদশাহদের আমলে ঈদ উৎসবে রূপান্তরিত হয়। এই তথ্যগুলো ইতিহাসের পাতা থেকে সংগৃহীত।

সময়ের পরিক্রমায় বাংলাদেশের মুসলিমরা ঈদকে নিয়ে এসেছে জাতীয় উৎসবের কাতারে। যোগ হয়েছে নতুন সাংস্কৃতিক মাত্রা আর নানান নতুন উপাদান। ঈদ এখন আর কেবল মুসলিমদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়। ঈদ ক্রমেই ধর্মীয় থেকে সামাজিক ও জাতীয় গন্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক উৎসবে পরিণত হয়েছে। হয়ে উঠেছে সর্বজনীন এক উৎসব। ঈদের এই উৎসবে সময়ের সাথে যুক্ত হয়েছে নানান উপাদান। ঈদ ফ্যাশন, পত্র-পত্রিকার ঈদ সংখ্যা, নাটক, মঞ্চানুষ্ঠান এমনকি বেতার-টেলিভিশনে ঈদ উপলক্ষে সপ্তাহব্যাপী বিচিত্র সব আয়োজন ঈদকে সর্বজনীন হতে সহায়তা করেছে।
বাংলাদেশের বাঙালিদের ঈদ উৎসবের নানা মাত্রা। এ উৎসব গ্রাম ও শহর ভেদে যেমন আলাদা। তেমন পাথর্ক্য সমাজ ভেদেও। তবে উৎসবের মূল উপাদান আনন্দ। যে কোন উৎসবেই মানুষ আনন্দ খোঁজে। আনন্দের মাত্রায় সমাজের সকলেই একই বৃত্তে এসে দাঁড়ালে তা সর্বজনীন হয়ে ওঠে। আর তাই মানুষ যুগ যুগ ধরে চিন্তা করে এসেছে মানুষের চিত্তকে আনন্দিত করে কী? কিসের জন্য মানুষ তার যাপিত জীবনের ক্লেদকে মুছে দাঁড়াতে শেখে? পায় বাঁচার নতুন অনুপ্রেরণা?
গণমাধ্যম এখন ঈদ উদযাপনের একটি বিশেষ জায়গা। যেখানে মানুষ ঈদের দিনগুলোতে খুঁজে পেতে চায় বিনোদন। টেলিভিশন, বেতার, পত্র-পত্রিকা, ম্যাগাজিন, সিনেমা হল, অনলাইন নিউজ পোর্টাল- সবাই সাজতে চায় উৎসবে। আর দর্শক বা পাঠক চায় বাড়তি একটু আনন্দ। ঈদের এই অনুষ্ঠানমালা বা লেখালেখি সাজানোর একটা বড় জায়গা জুড়েই থাকে শহরের মানুষ। শহরের মানুষ কী দেখতে বা পড়তে চায়- তা’ই যেন দেখাতে বা পড়াতে উদগ্রীব থাকে প্রকাশক বা টেলিভিশনের স্বত্ত্বাধিকারী। আর বিজ্ঞাপনের বাজারটির কথাও ভুলে গেলে চলবে না।

ঈদ এলেই সব বিজ্ঞাপনদাতাদের চাই তারকাখচিত অনুষ্ঠান, তারকাদের ফ্যাশন, রান্না ইত্যাদি নিয়ে বহুমাত্রিক আধুনিক প্রকাশনা। তারকা না থাকলে বিজ্ঞাপনদাতা নারাজ থাকে। গণমাধ্যমের যেকোনো শাখা যেমন টিভি, রেডিও বা যা উল্লেখ করলাম একটু আগে- তাদের জন্য মুনাফা আয় করা হয়ে পড়ে কঠিন। এমন অবস্থায় টিভিতে যেখানে আমি কাজ করছি সেই আশির দশকের শুরু থেকে, সেখানে সবসময়ই দেখেছি ঈদ আনন্দে প্রান্তিক ও গ্রামীণ মানুষের বিনোদনের জন্য কিছুই নেই। নেই পত্র-পত্রিকাতেও, অনলাইন বা রেডিওতেও।
কীভাবে সম্পৃক্ত করা যায় গ্রামের সাধারণ মানুষদের ঈদ আনন্দে? এমন একটি প্রশ্ন এবং এক ধরণের দায়বদ্ধতা কাজ করছিল বহু আগ থেকেই। চ্যানেল আইতে হৃদয়ে মাটি ও মানুষ অনুষ্ঠানটি শুরুর পর থেকে এ ধারণা আরও বাস্তবতার পথে হাঁটতে থাকে। পরিকল্পনাগুলো ধীরে ধীরে পরিপক্ক হতে থাকে।
২০০৬ সালে, অবশেষে শুরু করি টেলিভিশনে বাংলাদেশের ঈদ বিনোদনে নতুন মাত্রা, কৃষকের ঈদ আনন্দ। যেখানে প্রান্তিক, দরিদ্র, স্বাবলম্বী কৃষকেরা অংশগ্রহণ করে। আর তাদের গ্রামীণ খেলাগুলো স্যাটেলাইটের যুগে পৌঁছে যায় শহরে, নগরে এমনকী পুরো বিশ্বে। বিপুল জনপ্রিয় এই অনুষ্ঠান শুধু খেলা বা কৃষকের অংশগ্রহণের জন্যই যে জনপ্রিয় হয়েছে তা নয়। এই ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানটি মানুষের মন জয় করতে পেরেছে কারণ অনুষ্ঠানটিতে অংশগ্রহণকারীরা সাধারণ মানুষ আর তাদের জীবনের নানান গল্পগুলো প্রামাণ্যচিত্রের আকারে খেলার ফাঁকে ফাঁকে জুড়ে দেওয়া হয়েছে।
এই ঈদ বিনোদন অনুষ্ঠানে শুধু দেশের কৃষক নয়, বিশ্বের কৃষকরাও সংযুক্ত হয়েছে। উগান্ডার কৃষক, জার্মানির কৃষক, দেশে-বিদেশে ঐতিহাসিক স্থানগুলো থেকে কৃষকের ঈদ আনন্দ হয়ে উঠেছে একটি বৈশ্বিক ও আন্তর্জাতিক মানের অনুষ্ঠান। যখন ঈদ আনন্দ প্রচারিত হয় চ্যানেল আইয়ে সে সময়ে সর্বাধিক দর্শকের চোখ থাকে টেলিভিশনের পর্দায়। এই অর্জন শুধুমাত্র চ্যানেল আই বা হৃদয়ে মাটি ও মানুষের নয়, এই অর্জন পুরো বাংলাদেশের মানুষের। ঈদ আনন্দে যদি দেশের গুরুত্বপূর্ণ একটি শ্রেণী পুরোপুরি বাদ পড়ে যায়, তাহলে বিনোদনের সংজ্ঞা কী দাঁড়ায়? দর্শক তাই মনেপ্রাণে ভালোবেসেছে এই অনুষ্ঠান। একটু বলতে চাই পাঠক, যেমন কোন টেলিভিশনে কৃষি সংবাদের ধারণাটি ছিলো না একসময়।
আমরা প্রথম এরকম শুরু করি। শুরুর দিকে সম্পাদনা পর্ষদ বা কেউই তখন মনে করতেন না কৃষি নিয়ে সংবাদ হতে পারে। পরবর্তীতে টেলিভিশনে কৃষি সংবাদ হয়েছে এবং আমরা তার শুরুটা করেছি দক্ষতার সাথে। চ্যানেল আইয়ের বাইরে অন্যান্য টেলিভিশনও এখন প্রচার করছে কৃষি সংবাদ। আমি মনে করি কৃষকের বিনোদনের বিষয়টিও এখন তাই। পথ দেখাচ্ছে কৃষকের ঈদ আনন্দ। পর্যায়ক্রমে দেশের অন্যান্য টেলিভিশন চ্যানেলগুলো এগিয়ে আসছে। ইতোমধ্যে দু’চারটি টেলিভিশন কৃষকের ঈদ আনন্দ অনুসরণ করে ঈদে এমন বিনোদন অনুষ্ঠান নির্মাণ শুরু করেছে। দর্শক এখন তার ঈদ অনুষ্ঠানের তালিকায় কৃষকের ঈদ আনন্দ-কে স্থান দিয়েছে ভালোবাসার জায়গা থেকে। গ্রাম-গঞ্জ-হাট-বাজার-শহর-নগর-বন্দর সবখানে মানুষই কৃষকের ঈদ আনন্দ অনুষ্ঠানটি দেখার অপেক্ষায় থাকে।
প্রিয় পাঠক, বাঙালি মুসলিমদের ঈদ উদযাপনে সংস্কৃতি একটি জরুরি বিষয়। আর টেলিভিশন সংস্কৃতি এখন মূল্যায়ন হচ্ছে নতুন আঙ্গিকে। এমন একটি প্রেক্ষাপটে, আমাদের টেলিভিশন, সংবাদপত্র এবং এমন গণমাধ্যমে অবশ্যই গ্রামীণ মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে ঈদ আনন্দে। নইলে, আমরাই পিছিয়ে পড়বো। পৃথিবী জানতে পারবে না বাংলাদেশের গ্রামীণ মানুষগুলোর শ্রমে আর ঘামেই যে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের শক্তিশালী অর্থনীতি। তারাই যে এ জাতির মেরুদন্ড, তারাই যে রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে আর কনকনে শীতে আমাদের জন্য ফলিয়ে চলেছে সোনার ফসল।

গণমাধ্যমের সাথে সংশ্লিষ্ট সবাইকে এবং দেশের মানুষের কাছে বিনীতভাবে অনুরোধ করতে চাই, বিনোদনকে বৈষম্যের কাতারে না ফেলে এবং বাণিজ্যের জোয়ারে না ভেসে দেশের সাধারণ মানুষদের আনন্দকে আরও আপন করে নিই, টেলিভিশনে বা পত্র-পত্রিকায় তুলে ধরতে চেষ্টা করি আমাদের গ্রামীণ কৃষ্টি আর ঐতিহ্য, যার ওপর দাঁড়িয়ে আছি আমরা। যে ভূখণ্ডে একটা সময় কৃষি সংস্কৃতি থেকেই কৃষ্টি এসেছিল; বর্ণাঢ্য একটা সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে যে ভূখণ্ড বেড়ে উঠেছে, তা বর্তমান সময়ের তথাকথিত আধুনিকতার গড্ডালিকা প্রবাহে যেন হারিয়ে না যায় তাও খেয়াল রাখতে হবে আমাদের।
ঈদ আনন্দ তাই কখনোই কোথাও বৈষম্যের শিকার হতে পারে না। আমি তাই মনে করি, আসুন যে দেশে ১১ কোটি মানুষের বসবাস গ্রামাঞ্চলে, এই ঈদের সময়ে এবং ঈদ সংস্কৃতির নতুন জোয়ারে, গণমাধ্যমেও যেন আমরা জায়গা করে দিতে পারি এই সব মানুষদের। ঈদ আনন্দে জয় হোক বাংলার মেহনতি মানুষের যাদের সারা বছরের কঠিন শ্রম আর কষ্টের ভেতর, কিছুটা হলেও বিনোদনের সুযোগ করে দেওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে আমাদের।








