বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে প্রায় ২১ কোটি টাকা (২ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার) জালিয়াতি এবং মার্কিন সরকারের কাছে তথ্য গোপনের অভিযোগে বড় ধরনের আইনি গ্যাঁড়াকলে পড়েছেন ৬২ বছর বয়সী ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্যবসায়ী দেবাশিস ঘোষ। প্রতারণার মাধ্যমে নাগরিকত্ব অর্জনের অভিযোগে তার মার্কিন নাগরিকত্ব বাতিলের (ডিন্যাচারালাইজেশন) প্রক্রিয়া শুরু করেছে দেশটির বিচার বিভাগ।
আদালতের নথি ও তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, শিকাগোভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ‘ভারডেন্ট ক্যাপিটাল গ্রুপ’-এর সহ-প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) থাকাকালীন এই জালিয়াতির ছক আঁকেন দেবাশিস ঘোষ। তার সঙ্গে ছিলেন সহযোগী কিথ এরিক জেরজেনসেন। নিউইয়র্কের ‘লরেন্টিয়ান অ্যারোস্পেস কর্পোরেশন’ নামের একটি সংস্থা বিমান রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্র তৈরির জন্য তাদের মাধ্যমে বিনিয়োগ করতে রাজি হয়।
চুক্তি ছিল, বিনিয়োগের ২ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার একটি বিশেষ ব্যাংক অ্যাকাউন্টে গচ্ছিত থাকবে এবং লরেন্টিয়ানের অনুমতি ছাড়া তা খরচ করা যাবে না। কিন্তু অর্থ জমা হওয়ার মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় দেবাশিস ও তার সহযোগী সেই টাকা সরিয়ে ফেলেন। এই টাকা তারা ব্যক্তিগত খরচ, অন্য প্রতিষ্ঠানের পাওনা মেটানো এবং নিজেদের ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহার করেন। বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করতে তারা বছরের পর বছর ধরে ব্যাংকের ভুয়া নথিপত্র তৈরি করে জালিয়াতি চালিয়ে যান।
দেবাশিস ঘোষ ১৯৯১ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে ভিসা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যাতায়াত করতেন এবং ২০০১ সালে গ্রিন কার্ড পান। জালিয়াতি চলাকালীনই ২০১২ সালে তিনি মার্কিন নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করেন। নাগরিকত্বের আবেদনে (এন-৪০০ ফর্ম) একটি প্রশ্ন থাকে যে, আবেদনকারী কখনো এমন কোনো অপরাধ করেছেন কি না যার জন্য তিনি গ্রেপ্তার হননি। দেবাশিস সেখানে সচেতনভাবে ‘না’ লিখেছিলেন।
মার্কিন বিচার বিভাগের দাবি, দেবাশিস যখন নাগরিকত্বের শপথ নিচ্ছিলেন, তখন থেকেই তিনি একজন অপরাধী ছিলেন। ‘ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ন্যাশনালিটি অ্যাক্ট’ অনুযায়ী, যদি কেউ জালিয়াতি বা তথ্য গোপনের মাধ্যমে নাগরিকত্ব অর্জন করেন, তবে তা অবৈধ বলে গণ্য হবে।
২০১৬ সালে এই জালিয়াতির ঘটনা জানাজানি হলে তার বিরুদ্ধে তারবার্তা জালিয়াতিসহ (ওয়্যার ফ্রড) একাধিক মামলা হয়। ২০১৭ সালে আদালত তাকে দোষী সাব্যস্ত করে এবং ২০১৮ সালে তাকে প্রায় পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। বর্তমানে সেই সাজার সূত্র ধরেই তার নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার জন্য আদালতে আবেদন করেছে মার্কিন সরকার।
মার্কিন প্রসিকিউটরদের মতে, দেবাশিস ঘোষ কেবল সাধারণ বিনিয়োগকারী নন, বরং অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদেরও প্রতারিত করেছেন। নাগরিকত্ব বাতিল হলে তাকে স্থায়ীভাবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কার বা নিজ দেশ ভারতে ফেরত পাঠানোর সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
এই মামলার মাধ্যমে মার্কিন প্রশাসন স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড গোপন করে যারা নাগরিকত্ব নিয়েছেন, তাদের দীর্ঘ সময় পরেও আইনি কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।








