এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলে আমেরিকার প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করার মতো দাম্ভিক আচরণ করছে বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি চীন। বিশাল নীল জলরাশিতে আমেরিকার নৌশক্তির প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করে চীনের এমন বেশকিছু পদক্ষেপ দেশটির আধিপত্যবাদী মানসিকতারই পরিচায়ক। এরই মধ্যে তারা দক্ষিণ চিন সাগরে বিরোধপূর্ণ স্প্রাটলি দ্বিপ পুঞ্জের নিকট কৃত্রিম দ্বীপ নির্মাণ করছে। বিশ্বজুড়ে প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে সমু্দ্রের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই। আর এই নীতিতেই অগ্রসরমান চীনের আচরণে আগ্রাসি মানসিকতা প্রবলভাবে দৃশ্যমান।
সমুদ্রের প্রভাব রাখার সাথে বৈশ্বিক ক্ষমতার সম্পর্ক বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ১৯১৪ সালে প্রয়াত আমেরিকার নৌশক্তির নীতি নির্ধারক আলফ্রেড থেয়ার মাহান এর ব্যাখ্যা এখনও রাজনৈতিক নেতা এবং সামরিক উপদেষ্টাদের জন্য পথ নির্দেশক। ১৮৯০ সালে লেখা তার ‘কন্ট্রোল অব দ্য সি’ বইয়ে তিনি লিখেছেন, সামুদ্রিক বাণিজ্য এবং নৌশক্তির আধিপত্য মানে বিশ্বে কর্তৃত্বপূর্ণ প্রভাব বজায় রাখা। কারণ ভূমির সম্পদ উৎপাদন যতই বেশি হোক না কেনো সমুদ্র পথে প্রয়োজনীয় বাণিজ্যের সুবিধাকে কখনোই তা অতিক্রম করতে পারবে না।
ওজনে ও পরিমাণে বিশ্বের ৯০ শতাংশ বাণিজ্য সমুদ্র পথেই সম্পাদিত হয়। সমুদ্রে প্রাণীজ ও খনিজ সম্পদের ব্যবহার ও এর গুরুত্বও কোনো অংশে কম নয়। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নীতির মাধ্যমেই সমুদ্রে বিভিন্ন দেশ তার বাণিজ্য পরিচালনা করে থাকে। আবার এই নীতির নির্ধারণের ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক দশকগুলোতে জোটবদ্ধ দেশগুলোকে সাথে নিয়ে জোর প্রভাব রাখছে আমেরিকা।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৭০ এর দশকে সমুদ্রে আমেরিকার প্রভুত্বকে মাত্র একবারই সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য চ্যালেঞ্জ করতে পেরেছিলো সোভিয়েত ইউনিয়ন। তবে এর জন্য সোভিয়েত ইউনিয়নের শক্তিশালী ব্লু-ওয়াটার নেভির উন্নয়নে তাদের বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হয়েছিলো। মাত্র দুই দশকেরও কম সময়ে সোভিয়েতের পতনের পেছনে এই বিরাট ব্যয়কে একটা কারণ বলে উল্লেখ করেন কয়েকজন ইতিহাসবিদ। শীতল যুদ্ধের পর এই সকল অধিকাংশ বিলাসী নৌ বহর পড়ে থেকে নষ্ট হয়।
তবে সিরিয়ার ইসলামিক স্টেটকে (আইএস) লক্ষ্য করে কাস্পিয়ান সাগর থেকে রাশিয়ার যুদ্ধ জাহাজ থেকে ছোড়া ক্রুজ মিসাইল নতুন করে রাশিয়ার সামরিক শক্তির জানান দেয়। নিজেদের সীমানা থেকেই রাশিয়া ইউরোপের অধিকাংশ অংশে হামলা চালাতে পারে, এমন একটি স্পষ্ট ধারনা এখন পশ্চিমা সামরিক শক্তির জন্য উদ্বেগের কারণ।
কিন্তু এখন পর্যন্ত নৌশক্তির চ্যালেঞ্জ ছুড়ছে মূলত চীন। তাদের উপকূলবর্তী জাপান থেকে ফিলিপাইন পর্যন্ত নৌশক্তির বিকাশ ঘটিয়ে তারা এখন আরও উচ্চাকাঙ্খী পদক্ষেপ নিচ্ছে। চীনের নৌ বাহিনী পিপলস লিবারেশন আর্মি নেভি (পিএলএএন) ভারত সাগরে স্থায়ী প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলার পাশাপাশি তার ওয়েস্টার্ন প্যাসিফিক পর্যন্ত নৌ মহড়া চালিয়েছে। পূর্বের মতো ভূমিতে শক্তি বৃদ্ধির পরিবর্তে স্থানীয় সাগরে নিয়ন্ত্রণ ও অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাব বিস্তারে সমুদ্র শাসনের পরিকল্পনা চীনের।
চীনের দৃষ্টিতে ‘স্বপক্ষত্যাগী’ তাইওয়ান প্রদেশকে আবার মূল ভুখন্ডে ফিরিয়ে আনা চীনের সামরিক চিন্তার কেন্দ্রে রয়েছে। এজন্য প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগেও দ্বিধা করবে না দেশটি। তবে এক্ষেত্রে তাদের প্রধান চিন্তা তাইওয়ানের মূল রক্ষাকারী আমেরিকা। তাইওয়ান সরকারকে ভীতিপ্রদর্শনে চীনের ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা বন্ধ করতে ১৯৯৬ সালে আমেরিকার দুইটি ক্যারিয়ার ব্যাটল গ্রুপ প্রেরণের অপমানজনক ঘটনা এখনও চীনের স্মৃতিতে এক তিক্ত অভিজ্ঞতা। সেসময় আমেরিকার প্রতিরক্ষা সচিব উইলিয়াম পেরির উচ্চারণ চীনের জন্য পীড়ার কারণ। “যদিও চিন সামরিক পরাশক্তি তবুও ওয়েস্টার্ন প্যাসিফিকে সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক শক্তির অধিকারী যু্ক্তরাষ্ট্র।”
এই অবস্থার পরিবর্তনে অবিচল চীন। দ্বীপমালায় প্রাধান্য বিস্তারে আমেরিকাকে পেছনে ফেলতে তাদের নৌবহরে উপকূল ভিত্তিক এন্টি-শীপ মিসাইল থেকে সাবমেরিন, আধুনিক উপকূলীয় প্রহরা ও জঙ্গি বিমান যোগ করতে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করছে চীন।
চীনের বিরোধপূর্ণ দ্বীপ
চীনের বিরোধ রয়েছে তাইওয়ান ও ভিয়েতনামের সাথে প্যারাসেল দ্বিপমালা নিয়ে, স্প্রাটলি দ্বিপপুঞ্জ নিয়ে তাইওয়ান, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া ও ব্রুনেই এর সাথে এবং স্ক্রাবোরো শোল দ্বিপ নিয়ে ফিলিপাইন ও তাইওয়ানের সাথে। পূর্ব চীন সাগরে জাপান নিয়ন্ত্রিত সেনকাকু দ্বীপমালা নিয়ে জাপানের সাথে বিরোধ রয়েছে চীনের। এ সকল বিরোধে আমেরিকা কোনো অবস্থান গ্রহণ না করলেও শক্তিপ্রয়োগের বদলে আন্তর্জাতিক মীমাংসার প্রতি জোর দিয়েছে। তবে চীন তার বিকাশমান নৌশক্তি দিয়ে দমন মূলক আচরণেরই প্রকাশ ঘটাচ্ছে।
আমেরিকাকে চ্যালেঞ্জ জানানোর ক্ষেত্রে আরোও বহুদূর যেতে হবে চীনকে। কারণ চীনের সম্পূর্ণ (সরকারি) প্রতিরক্ষা বাজেট আমেরিকার শুধুমাত্র এক নৌ বাজেটের চেয়ে খুব বেশি নয়। নৌ বহরের দিক থেকেও আমেরিকার থেকে যোজন ব্যবধানে পিছিয়ে চীন। চীনের সামরিক বিশেষজ্ঞরা বিশ্বাস করে পিএলএএন’এর আমেরিকান নেভির সমপর্যায়ে যেতে আরো ৩০ বছর সময় লাগবে।
এছাড়াও বিশ্বজুড়ে আমেরিকার সহযোগী নৌশক্তির জাপান উপকূলীয় আত্মরক্ষার বাহিনী বিশ্বে পঞ্চম সেরা বলে বিবেচিত। চীনের সাথে সমুদ্র এলাকা নিয়ে দ্বন্দ্ব থাকা প্রতিবেশী ফিলিপাইন ও ভিয়েতনামকে সহযোগিতা করছে জাপান। চীনের বিকাশ নিয়ে উদ্বিগ্ন ভারতের নৌবাহিনীও পশ্চিমাদের আরেকটি শক্তিশালী মিত্র। ভারত সাগরকে চীনের কবল থেকে মুক্ত রাখতে দৃঢ় অবস্থান তাদের।
নৌবাহিনীর শক্তিতে বিশ্বে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা চীনের ভুল সিদ্ধান্ত মারাত্মক বিপর্যয়ের দিকে নিয়ে যেতে পারে বিশ্বকে। ২০ শতকের শুরুতে ব্রিটিশ নৌবাহিনীর আধিপত্যকে চ্যালেজ্ঞ জানিয়ে জার্মানির রণতরী নির্মানের ধ্বংসাত্মক প্রতিযোগিতা সত্ত্বেও প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটেনের অবরোধ ভাঙ্গতে ব্যর্থতা এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পার্ল হারবারে জাপানের আকস্মিক আক্রমণ ও দাম্ভিক জাপানের করুণ পরিণতি চীনের জন্য শিক্ষণীয়।
শক্তিশালী নৌশক্তি চীনের মর্যাদা ও ভাবমূর্তির জন্য প্রয়োজন, এ বিবেচনায় চীনের তৎপরতাকে ভুল না বললেও শঙ্কার বিষয়টি হলো চীন নিজেও হয়তো জানে না তারা কি করবে? আবারও সেই মাহানের উদ্ধৃতি থেকে ধার করে বলা যায়, “বৃহত্তর পরিসরে সাগর শক্তির ইতিহাস কেবলমাত্র দেশগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা, পারস্পরিক বিদ্বেষ, অনবরত সংঘাতের বর্ণনা যা তাদের যুদ্ধের দিকে নিয়ে যায়।” যদিও পরিস্থিতি এখনও সেরকম পর্যায়ে যায়নি তবে সবচেয়ে খারাপ পরিণতির জন্য প্রস্তুত থাকাই পরাশক্তিদের জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত।
সূত্র : দ্য ইকোনোমিস্ট







