‘কেমনে শুধিব বলো তোমার এ ঋণ।
এ দয়া তোমার, মনে রবে চিরদিন।
যবে এ হৃদয় মাঝে ছিল না জীবন
মনে হয় ধরা যেন মরুর মতন,
সে হৃদে ঢালিয়ে তব প্রেম বারিধার
নতুন জীবন যেন করিলে সঞ্চার।’
প্রেম ও প্রকৃতি/রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ইউনেস্কো ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘শান্তিবৃক্ষ’ সম্মাননা তুলে দেয়ার সময় ইউনেস্কোর প্রধান ইরিনা সেকোভা বলেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একজন সাহসী নারী। বিশ্ব পর্যায়েও প্রধানমন্ত্রীর নারী ও কন্যাশিশুদের ক্ষমতায়নে রয়েছে জোরালো কণ্ঠ। বিশ্বব্যাপী পরিবেশ বিপর্যয়ের মারাত্মক ঝুঁকিতেও বাংলাদেশ তার অবস্থান থেকে ইতিবাচক ভূমিকা রাখায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্ব নেতৃবৃন্দের প্রশংসা কুড়িয়েছে।
শান্তিবৃক্ষ সম্মাননা নেয়ার সময় শেখ হাসিনা তার অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে দৃঢ়কণ্ঠে বলেছিলেন, ২০১৫ পরবর্তী টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার আলোকে আমরা আমাদের রূপকল্প-২০৪১-এর ভিত্তিতে একটি উন্নত, সুশিক্ষিত ও বিজ্ঞানমনস্ক সমাজ গঠনের সোপান রচনায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এই কর্মযজ্ঞে নারী ও মেয়েশিশুরা সব সময়ই আমাদের বিবেচনার অগ্রভাগে থাকবে।’ এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। আর এ কারণে পরিবেশ সংরক্ষণ ও তার বিপর্যয় রোধের বিষয়টিকে বাংলাদেশ সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। সরকার প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পরিবেশ, সুরক্ষা এবং এর পক্ষে জনসচেতনতা তৈরিতে সম্ভাব্য সব ধরনের উদ্যোগ ও কার্যক্রম গ্রহণ করছেন। বর্তমান সরকার পরিবেশের ব্যাপারে কোনো ধরনের ছাড় দিতে নারাজ। পরিবেশ ধ্বংস, বন দখল, নদী-খাল দখলসহ পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এমন যে কোনো শক্তির বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থান। এসব সম্ভব হয়েছে এ বিষয়ে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতির কারণে। পরিবেশের জন্য হুমকি কিংবা ক্ষতিকর কোনো গোষ্ঠী, শক্তিকে শক্তভাবে প্রতিহত করতে বদ্ধপরিকর সরকার ও তার সংশ্লিষ্ট দপ্তর। বর্তমান সরকার মনে প্রাণে বিশ্বাস করে যে, ধরিত্রী সবুজ থাকলে মানুষের প্রাণ সবুজ থাকবে-আর মানুষের মন-প্রাণ সবুজ থাকলে তার জীবনীশক্তি, কর্মপন্থা ও উদ্যম বহুগুণে বেড়ে যাবে। আর এসব বেড়ে গেলে তা জাতীয় জীবনে সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রাখবে। আর এ কথা ভুলে গেলে চলবে না যে, দেশের মোট জনশক্তির অর্ধেকই নারী। এই নারী সকল উন্নয়ন ও অগ্রগতির সহায়ক শক্তি। নারীর হাতে পরিবেশ, প্রকৃতি সঠিক পরিচর্যা পায়।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্যা আদায়ে বিশ্ব নেতৃবৃন্দের কাছে জোরালো দাবি তুলে ধরতে সচেষ্ট থেকেছেন। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে এ বিষয়ে বিশ্বের জনমত তৈরি করেছেন এবং বিশ্ব দরবারে পরিবেশ বিপর্যয়ের ফলে বাংলাদেশের ক্ষতির বাস্তবসম্মত চিত্র তুলে ধরেছেন। যা বিশ্বে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশে তার যৌক্তিক অবস্থান তুলে ধরতে সমর্থ হয়েছে।
পরিবেশ সংরক্ষণ, পরিচর্যা ও সুরক্ষায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার অবস্থান থেকে পরিষ্কার। দেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ বিবেচনায় রেখে তিনি এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সবাইকে যার যার জায়গা থেকে নিবেদিতভাবে কাজ করে যাওয়ার জন্য উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন। পরিবেশ বাঁচলে মানুষ বাঁচবে- আর মানুষ বেঁচে থাকলে দেশও স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে। বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতির আলোকে একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি চিন্তাও করা যায় না। অর্থাৎ পরিবেশ ও মানুষ একটি আরেকটির পরিপূরক।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে মানুষকে সম্পৃক্ত করেছেন। প্রান্তিক মানুষ থেকে শুরু করে সমাজের সব স্তরের মানুষকে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে একীভূত করে দেশকে সামনের দিকে নিয়ে যাওয়ার এক যুদ্ধে জড়িয়েছেন তিনি। বঙ্গবন্ধু সোনার বাংলার স্বপ্নকে পরিপূর্ণ করতে তিনি এই যুদ্ধে দেশপ্রেমিক সবাইকে এক সুতোয় গেঁথেছেন। আর তারই ধারাবাহিক সুফল পাচ্ছে বর্তমান বাংলাদেশ। বিশেষ করে কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নারীর অগ্রগতি, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতা, ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে সকল সেক্টরে অভাবিত অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। বাংলাদেশ আজ আর বিশ্বের তথাকথিত দেশসমূহের কাছে পিছিয়ে পড়া দেশ নয়। বিশ্বের অনেক দেশের কাছে বাংলাদেশ আজ উন্নয়ন আর অগ্রগতির রোল মডেল।
উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতা বজায় ও ত্বরান্বিত করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার সরকার নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ইতিমধ্যে সেসব কর্মকাণ্ডের সুফলও পেতে শুরু করেছে দেশ। ২০২১ সালের মধ্যে দেশকে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে পরিণত করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১০টি বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। এসব উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে একটি বাড়ি একটি খামার, আশ্রয়ন প্রকল্প, ডিজিটাল বাংলাদেশ, শিক্ষা সহায়তা কর্মসূচি, নারীর ক্ষমতায়ন, ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ, কমিউনিটি ক্লিনিক ও মানসিক স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, বিনিয়োগ বিকাশ এবং পরিবেশ সুরক্ষা। ইতিমধ্যে এই ১০টি উদ্যোগ সঠিকভাবে বাস্তবায়নের জন্য রোডম্যাপ তৈরি করা হয়েছে এবং সেই অনুযায়ী কাজও এগিয়ে চলেছে। প্রধানমন্ত্রী নিজে এই ১০টি উদ্যোগের সর্বোচ্চ বাস্তবায়নের দিক-নির্দেশনা দিয়েছেন এবং তার সার্বিক মনিটরিং করার বিষয়টিও নিজে দেখভাল করছেন।
প্রধানমন্ত্রীর ১০টি বিশেষ উদ্যোগের মধ্যে অন্যতম হলো পরিবেশ সুরক্ষা। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুপ প্রভাব মোকাবেলায় গৃহীত উদ্যোগের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৫ সালে জাতিসংঘের ‘চ্যাম্পিয়ন অব দ্য আর্থ’ পুরস্কার প্রাপ্তি বিশ্ব দরবারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে এনে দিয়েছে অনন্য স্বীকৃতি- তাকে নিয়ে গেছে অন্য এক উচ্চতায় যেখানে তার তুলনা তিনি নিজেই। একই বছর ‘পলিসি লিডারশিপ’ ক্যাটাগরিতে জাতিসংঘের পরিবেশ বিষয়ক এই সর্বোচ্চ পুরস্কারের জন্য বেছে নেয়া হয় দেশরত্ন, বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। প্রতিবেশগতভাবে ‘নাজুক অবস্থায় থাকা’ বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশের উন্নয়ন, অগ্রগতি ও প্রগতির সঠিক রূপকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের গৃহীত সুদূরপ্রসারী নানা পদক্ষেপ, জলবায়ু ও পরিবেশ ইস্যুতে বিভিন্ন উন্নয়ন এবং জলবায়ুগত পরিবর্তনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য তাকে এই ‘চ্যাম্পিয়ন অব দ্য আর্থ’ পুরস্কারে সম্মানীত করা হয়।
এই সম্মাননা প্রাপ্তির পর দেশে বিদেশে তাকে গণ্য করা হয়েছে ‘বিশ্ব পরিবেশের বন্ধু’ হিসেবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই পুরস্কার প্রাপ্তিতে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় এক নাগরিক সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়েছিল। সেই সংবর্ধনা সভায় এমিরেটাস অধ্যাপক বিশিষ্ট নজরুল গবেষক ও প্রাবন্ধিক অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম তার প্রিয় ছাত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘ধরিত্রীর শ্রেষ্ঠা’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, আজকে ধরিত্রীর শ্রেষ্ঠাকে অভিনন্দন জানাই। দেশের মানুষ তাকে ভালবাসেন। তিনিও দেশকে ভালোবাসেন। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে দেশ আজকে এগিয়ে যাচ্ছে। বৈরী পরিবেশের মধ্যেও দেশের সকল সংকট মোকাবিলা করে শক্ত হাতে শেখ হাসিনা দেশকে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড় করিয়েছেন। সেদিনের সেই নাগরিক সংবর্ধনায় প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে বলেছিলেন, আমাদের দেশের পরিবেশ রক্ষা করতে হবে; জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে হবে এবং মানুষের উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে। কারও মুখাপেক্ষী না হয়ে যেন নিজেরা নিজেদের পরিবেশ রক্ষার কার্যক্রম গ্রহণ করি। আমাদের এই ভূখণ্ড, আমার প্রতিজ্ঞা হলো, সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তুলব। আজকে যারা শিশু তাদের জন্য বাসযোগ্য একটা দেশ করে দিয়ে যাব।’
শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ২০০৯ সালে বাংলাদেশ যে জলবায়ু সংক্রান্ত কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা নেয়া হয় তা বিশ্বব্যাপি প্রশংসিত। বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে প্রথম এমন সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। আর বাংলাদেশই বিশ্বের প্রথম দেশ যে তার নিজস্ব তহবিলে জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড করেছে। ২০০৯ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে নিজস্ব অর্থায়নে এই ফান্ড ৩০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বাংলাদেশী মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ২৪০০ কোটি টাকা। উপরন্তু বার্ষিক বাজেটের ৬ থেকে ৭ শতাংশ জলবায়ু পরিবর্তন খাতে বরাদ্দ রাখার ঘোষণা ও তার সফল বাস্তবায়ন দেখিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জন্য প্রাকৃতিক সম্পদ, জীব বৈচিত্র্য, বনাঞ্চল আর বন্যপ্রাণিসম্পদ রক্ষার লক্ষ্যে ২০১১ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগে পরিবেশ রক্ষা ও উন্নয়নে সংবিধান সংশোধন করা হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত পরিবেশ রক্ষা ও সংরক্ষণে অন্তত আটটি নতুন প্রণয়ন অথবা সংশোধিত হয়েছে। পরিবেশের সার্বিক উন্নয়নে তিনি সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সেসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কঠোরভাবে মনিটরিং-এর ব্যবস্থাও করেছেন। এর ফরে দেশের পরিবেশের চিত্র পাল্টেছে। এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, ২০১৪-১৫ সালে দেশের বনাঞ্চল ১৭.০৮ শতাংশে উন্নীত হয়। উল্লেখ্য, ২০০৫-০৬ মালে বনাঞ্চলের পরিমাণ ছিল ৭ থেকে ৮ শতাংশ।
সামাজিক বনায়ন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আরও একটি যুগোপযোগী উদ্যোগ। এর মাধ্যমে দেশের শহর ও গ্রাম প্রত্যেক স্থানে গাছ লাগানো ও তা বড় করে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। প্রতিটি বাড়িতে বছরে একটি ফলজ, একটি বনজ ও একটি ঔষধি গাছ লাগানোকে দেশের মানুষের মধ্যে সামাজিক আচারে পরিণত করার এই উদ্যোগ আজ পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও অনুসৃত হচ্ছে।
এক পরিসংখ্যানে জানা গেছে, বর্তমানে দেশের মানুষের মধ্যে বৃক্ষরোপনের বিষয়টি একটি নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। মানুষ এখন বৃক্ষরোপনকে তার নৈতিক দায়িত্ব বলে মনে করে। তারা বিষয়টিকে পরিবেশের জন্য ইতিবাচক বলে মনে করছেন। প্রতিবছর দেশের মানুষের মধ্যে ১২ কোটি গাছের চারা বিরতণ করা হচ্ছে। এর বাইরেও মানুষ স্বপ্রনোদিত হয়ে বৃক্ষরোপন করছেন।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







