বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল পেরিয়ে সেমিফাইনালে উঠে এসেছে ফ্রান্স ও স্পেন। অপেক্ষায় রয়েছে ইংল্যান্ড-নরওয়ে এবং আর্জেন্টিনা-সুইজারল্যান্ড। এই চার দলের কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে আরও দুটি দল উঠে আসবে সেমিফাইনালে। রাত তিনটায় মিয়ামিতে মুখোমুখি হবে ইংল্যান্ড ও নরওয়ে। আগামীকাল সাতসকালে কানসাস সিটি স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা ও সুইজারল্যান্ড। এই দুই কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে কোন দুটি দল সেমিফাইনালে উঠে আসবে তা নিয়ে চলছে বিস্তর গবেষণা। আর্জেন্টিনা ও সুইজারল্যান্ড ম্যাচে অনেকেই আর্জেন্টিনাকে বেশ এগিয়ে রাখলেও ইংল্যান্ড ও নরওয়ে ম্যাচ পুরোটাই সব অনুমানের বাইরে। এই ম্যাচ এক দারুণ রহস্য তৈরি করেছে। এই ম্যাচে কৌশল, ধৈর্য ও মানসিক দৃঢ়তার লড়াই দেখার অপেক্ষায় ফুটবলপ্রেমীরা।
ইংল্যান্ড ও নরওয়ের ম্যাচ হবে হ্যারি কেন ও আর্লিং হালান্ডের সরাসরি লড়াই। যেখানে দুদল সমানে সমান। নরওয়ে আবার ব্রাজিলকে হারিয়ে গৌরবময় অবস্থানে রয়েছে। অন্যদিকে ইংল্যান্ড পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে দেখিয়েছে ভারসাম্যপূর্ণ ফুটবল। রক্ষণে শৃঙ্খলা, মাঝমাঠে বলের নিয়ন্ত্রণ এবং সুযোগ তৈরি করে গোল করার দক্ষতা তাদের অন্যতম শক্তি। বড় ম্যাচে চাপ সামলে খেলার অভিজ্ঞতাও দলটিকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে। আবার নরওয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের গতিময় আক্রমণ। উইং দিয়ে দ্রুত উঠে আসা, পাল্টা আক্রমণে প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলা এবং শারীরিক সক্ষমতার সদ্ব্যবহার করে ম্যাচের গতি বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে তাদের। সুযোগ পেলেই প্রতিপক্ষের ভুলের সর্বোচ্চ মূল্য আদায় করার ক্ষমতা দেখিয়েছে তারা।
এই ম্যাচের ভাগ্য অনেকটাই নির্ভর করবে মাঝমাঠের লড়াইয়ের ওপর। ইংল্যান্ড যদি বলের দখল ধরে রাখতে পারে, তবে নরওয়ের আক্রমণের ধার কমে যেতে পারে। আবার নরওয়ে যদি দ্রুত ট্রানজিশনের সুযোগ কাজে লাগাতে পারে, তাহলে ইংল্যান্ডের রক্ষণকে কঠিন পরীক্ষায় পড়তে হবে। কাগজে-কলমে ইংল্যান্ড কিছুটা এগিয়ে থাকলেও নরওয়েকে অবমূল্যায়নের সুযোগ নেই। বড় টুর্নামেন্টে অঘটন ঘটানোর সামর্থ্য তাদের রয়েছে। তাই সেমিফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে এটি হতে পারে টানটান উত্তেজনার এক স্মরণীয় ম্যাচ। যেখানে একটি মুহূর্তের নৈপুণ্যই নির্ধারণ করে দিতে পারে বিজয়ীর নাম। শেষে হ্যারি কেন না আর্লিং হালান্ড হাসবে তা দেখার অপেক্ষায় সবাই।
এদিকে আগামীকাল সকালে আর্জেন্টিনা ও সুইজারল্যান্ডের মুখোমুখি নিয়েও নানান মতের বহিঃপ্রকাশ দেখা যাচ্ছে। বলা হচ্ছে একদিকে আক্রমণভিত্তিক, বলের দখল ধরে রেখে প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলার আর্জেন্টিনা; অন্যদিকে শৃঙ্খলাবদ্ধ রক্ষণ এবং দ্রুত পাল্টা আক্রমণে বিশ্বাসী সুইজারল্যান্ড। তবে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা বড় ম্যাচের চাপ সামলাতে অভ্যস্ত। মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ, দ্রুত পাসের আদান-প্রদান এবং আক্রমণভাগের গতিশীলতা তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করে সুযোগ তৈরি করতে তারা দক্ষ। প্রতিপক্ষের রক্ষণে ফাঁক খুঁজে বের করতে ধৈর্য ধরে আক্রমণ গড়ে তোলাই তাদের স্বভাব। এছাড়া একজন লিওনেল মেসি ‘ম্যাজিক ম্যান‘ হিসেবে রয়েছেন। মাঝমাঠে ডে পল, ফার্নান্দেজও সক্রিয়।
লাতিন আমেরিকার বিপরীতে সুইজারল্যান্ড ইউরোপের অন্যতম সংগঠিত দল। বড় প্রতিপক্ষের বিপক্ষে রক্ষণ শক্ত করে রেখে সুযোগ বুঝে পাল্টা আক্রমণে ওঠাই তাদের কৌশল। কর্নার ও ফ্রি-কিকের মতো সেট-পিস থেকেও তারা নিয়মিত বিপদ তৈরি করতে পারে। তাই আর্জেন্টিনার রক্ষণকে পুরো ম্যাচজুড়ে সতর্ক থাকতে হবে। এই ম্যাচের সবচেয়ে বড় লড়াই হতে পারে মাঝমাঠে। আর্জেন্টিনা বলের দখল ধরে রেখে ছন্দ তৈরি করতে চাইবে, আর সুইসরা সেই ছন্দ ভেঙে ম্যাচকে শারীরিক ও কৌশলগত লড়াইয়ে পরিণত করার চেষ্টা করবে। আর্জেন্টিনা যদি দ্রুত গোল পেয়ে যায়, তবে ম্যাচ তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে।
সাবেক ফুটবলার, কোচ, ফুটবল বিশ্লেষক, ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব গোলাম সারোয়ার টিপু উল্লেখিত দুটি ম্যাচ নিয়ে মন্তব্য করেছেন। তিনি বললেন, ‘ইংল্যান্ড ও নরওয়ের ম্যাচটা হবে হাড্ডাহাড্ডি। মাঠে কী ঘটবে কিছু বলা সম্ভব না। দুই দলই তুঙ্গে আছে। দুই দলের মাঝেই সেমিফাইনালে যাওয়ার দুর্বার স্বপ্ন। তবে দুদলের মাঝে একটা ছোট্ট পার্থক্য হল হ্যারি কেন সারা মাঠজুড়ে খেলতে পারে। তীব্র আক্রমণে নিজেই ঝাপিয়ে পড়ে। সেই তুলনায় আর্লিং হালান্ড কিছুটা ধীরগতির। একটা নিজস্ব বৃত্তেই থাকেন। সেখান থেকেই ফলাফল টেনে তোলার চেষ্টা করেন। সেক্ষেত্রে ইংল্যান্ডের হ্যারি কেন একটু এগিয়ে থাকবেন। এই পার্থক্যের সুফল ইংল্যান্ড পেতে পারে। তবে এই ম্যাচ নিয়ে কারো কিছু বলার সাধ্য নেই।‘
আর্জেন্টিনা ও সুইজারল্যান্ডের মধ্যেকার ম্যাচ নিয়ে তিনি বললেন, ‘যদি সবচেয়ে খারাপ দিন না আসে তাহলে আর্জেন্টিনার বিজয়রথ সুইসরা থাামাতে পারবে না। তারাই শতভাগ ফেভারিট, তারাই সব বিবেচনায় এগিয়ে। পরিসংখ্যানও তাদের পক্ষে।’
তিনি বললেন, ‘আর্জেন্টিনা তাদের স্বভাবজাত খেলা দিয়ে ম্যাচ বের করে নিয়ে যাবে। এছাড়া একজন মেসি তো রয়েছেন। হয়তো মেসি আজ আরও চমক দিতে পারেন। আর আর্জেন্টিনা তো চ্যাম্পিয়ন টিমের মতোই খেলছে। আবার গত দুই ম্যাচের শিক্ষা থেকেও তাদের এই ম্যাচ খেলার কৌশল, কম্পিটিশন ভিন্ন হতে পারে।‘
গোলাম সারোয়ার টিপু আরও বললেন, ‘আর্জেন্টিনা টিমের ১১ জনই ছন্দোবদ্ধভাবে খেলছে। এও ঠিক একটা খেলার দিন অনেককিছু ঘটে। সেটাও মাথায় রাখতে হবে। তবে অভিজ্ঞতা ও পরিপক্বতার দিক থেকে আর্জেন্টিনা অনেক এগিয়ে। কোচ স্কালোনি সেভাবেই দলকে ব্রিফ করবেন এবং সাজাবেন বলে মনে করি।।’
সবশেষে ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব গোলাম সারোয়ার টিপু বললেন, দুটি ম্যাচই সুন্দর হবে বলে মনে করি। আর কয়েকঘণ্টা পর আমরা সেই দৃশ্য দেখার অপেক্ষায় থাকলাম।







