গলের মঞ্চ প্রস্তুত। প্রস্তুত কুশীলবরাও। যাদের কেউ কেউ নায়ক হয়ে উঠবেন ঝাম ঝরানো লড়াইয়ের শেষে। সূর্যের প্রখরতাকে মলিন করে কেড়ে নেবেন সবটুকু আলো। ইতিহাসে নাম ওঠাবেন নায়ক হয়ে। ধন্য ধন্য করবে ধরণী। কালের প্রবাহে হয়তো মহানায়কের মুকুটমাল্যই জুটবে সেই বিজয়ীদের। বাকিরা ঠিক ভিলেন হয়ে না উঠলেও থেকে যাবেন পাদপ্রদীপের আড়ালে। কৃষ্ণগহ্বরের ছায়া হয়ে। একই মঞ্চে কারো জন্য হাততালির ঝঙ্কার কারো শ্মশান-প্রস্থানের আভাস নিয়ে মঙ্গলবার মাঠে গড়াচ্ছে শ্রীলঙ্কা-বাংলাদেশ টেস্ট মহারণ।
দুই টেস্টের সিরিজ। প্রথমটি শুরু হচ্ছে ঐতিহাসিক ৭ মার্চে। রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর সেই জ্বালাময়ী-অনুপ্রেরণাদায়ী ভাষণের দিনে। সিরিজটির নামকরণও করা হয়েছে ‘জয় বাংলা কাপ’ নামে। গল স্টেডিয়ামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশেরও ইতিহাস। শ্রীলঙ্কায় একমাত্র এই মাঠেই টাইগাররা হারেনি। ২০১৩ সালে এ মাঠে খেলা একমাত্র টেস্টটিতে ৬৩৮ রানের ইনিংস গড়ে দাপুটে লড়াইয়ে ড্র করেছিল লাল-সবুজরা। এবার ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির পালা। হয়তো পালা নতুন কোনো ইতিহাস রচনারও।
ইতিহাস লেখায় সাহস যোগাচ্ছে দুটি বিষয়। অনেক ম্যাচে বাংলাদেশের হন্তারক হয়ে ওঠা সাঙ্গাকারা-জয়াবর্ধনে, ভাস-মুরালিধরনরা এখন অবসরে। অন্যদিকে সাম্প্রতিক সময়ে টাইগারদের উন্নতির গ্রাফটা ঊর্ধ্বমুখী। পালাবদলের মধ্য দিয়ে যাওয়া শ্রীলঙ্কান দলকে মাঠের লড়াইয়ে বিবর্ণ করে দেওয়ার এটাই সেরা সময় সাকিব-তামিমদের। তরুণদের নিয়ে গড়া নতুন শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সুযোগের সেই সিঁড়িটা দেখছেন অধিনায়ক মুশফিকও। দেশ ছাড়ার আগেই বলে গেছেন- এবার সেরা সুযোগ। পরে দলীয় কোরাসেই ঢুকে পড়েছে কথাটি। পুরো দলই নাকি বিশ্বাস করতে শুরু করেছে, এবার সুযোগ, ভালো সুযোগ!

গলে খেলা একমাত্র সেই টেস্টে মুশফিক দেশকে প্রথম ডাবল সেঞ্চুরি এনে দিয়েছিলেন। অধিনায়ক দুর্দান্ত ফর্মেই আছেন। তাকে আরো নির্ভার করে ২২ গজে ঠেলে দিতে মুক্তি দেওয়া হয়েছে কিপিং থেকে। চারে ব্যাট করবেন। তার আগে আছেন ‘লিটল ডায়নামাইট’ মুমিনুল হক। উদ্বোধনীতে অভিজ্ঞ তামিম, আর ফর্মে ফেরার ইঙ্গিত রাখা সৌম্য।
পরের জায়গাটা অলরাউন্ডার সাকিবের। তাকে অনুসরণ করবেন মাহমুদউল্লাহ। সাতে নামবেন মুশফিককে ভারমুক্ত করে গ্লাভস সামলানোর দায়িত্ব পাওয়া লিটন দাস। থাকবেন ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ঐতিহাসিক টেস্ট জয়ের নায়ক মিরাজ। এই পর্যন্ত প্রায় নির্ধারিতই। তিন স্পিনার খেলালে তাইজুল থাকবেন, তিন পেসার খেলালে শুভাশিস। কেননা মোস্তাফিজুর রহমান টেস্টের আঙিনায় ফিরছেন আবারো। কাটার মাস্টারের জুটি সঙ্গী হওয়ার জন্য তাসকিনের নামটি প্রায় চূড়ান্তই।
নিজেদের সেরা একাদশ সাজিয়েই নামবে বাংলাদেশ। তবে ছেড়ে কথা বলবে না শ্রীলঙ্কাও। গলে ২৮ ম্যাচে স্বাগতিকরা ১৬টিতেই জিতে মাঠ ছেড়েছে, সেখানে ৬টি হারের পিঠে ড্র ৬ ম্যাচে। এই মাঠে সর্বাধিক রান করা জয়াবর্ধনে-সাঙ্গাকারা নেই। তবে গলে দারুণ খেলা চান্ডিমাল থাকছেন। প্রস্তুতি ম্যাচে বাংলাদেশের বিপক্ষে অপরাজিত ১৯০ রানের ঝলমলে ইনিংস খেলে এই উইকেটরক্ষক-ব্যাটসম্যান ভয় বাড়িয়ে রেখেছেন।

বোলিংয়ে গলে একশর উপর উইকেট নেওয়া মুরালিধরন নেই। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ঘূর্ণিঝড় তোলা বাঁহাতি স্পিনার হেরাথ থাকছেন। তাকে সঙ্গ দেবেন অভিজ্ঞ অফস্পিনার দিলরুয়ান পেরেরা। ম্যাথুজ অবশ্য চোটে ছিটকে গেছেন। কিন্তু বাকিরাও তারুণ্যের সবটুকু ঢেলে দিয়ে অভিজ্ঞতার ঘাটতি পুষিয়ে দিতে সক্ষম। মুশফিকদের তাই শক্ত চ্যালেঞ্জের মুখেই পড়তে হতে পারে।
সেই চ্যালেঞ্জের সামনেই আশার সঞ্জীবনী হয়ে দেখা দিচ্ছে গলে খেলা মুশফিকদের আগের টেস্টের ইতিহাস। নিজেদের সামর্থ্য তো আছেই, প্রয়োজন কেবল সেটা মাঠে অনূদিত করার। দুয়ে-দুই মিলিয়ে পয়মন্ত গলে সেই ইতিহাসই নতুন করে লেখানোর পালা।
ইতিহাস ফিরে আসে আপনা-আপনি। কখনো নাকি ছাড়িয়েও যায়। এবার যদি তাই হয়, তবে মন্দ কী!








