দীর্ঘ ৩০ বছর পর দেখা মিলল প্রিয় বন্ধুর! সেই আশির দশকে ছেড়ে গিয়েছিলেন ক্যাম্পাস। এরপর কেটে গেছে এতগুলো বছর। এরই মধ্যে ক্যাম্পাস জীবন শেষে পাড়ি জমান একজন আমেরিকায়। আরেকজন ইউরোপে৷ এরপর কখনো আর দেখা মিলেনি তাদের৷ কিন্তু আজ সেই ক্যাম্পাসেই মিলে গেছে প্রাণ৷ পরস্পরে আলিঙ্গনে জড়িয়ে ধরে ফিরে গেলেন স্মৃতির অ্যালবামে।
বয়স সত্তরের একজন পরানের বন্ধুকে দেখে দূর থেকে হাঁক ছাড়লেন, ‘এই দোস্ত আলিম বাটপার (ছদ্মনাম) শোন’- এই বলে শুরু হলো গল্প৷ ক্যাম্পাসে সেই যে দুষ্টামির সুরে বন্ধুকে ‘বাটপার’ সম্বোধন করতেন, তার রেশ এখনো রয়ে গেছে মনে। পরস্পরকে নানা খোঁচা দিতে দিতে চলল কুশল বিনিময়। অনেকে এসে পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ছেন। পুরানো বন্ধুকে পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন সবুজ ক্যাম্পাসের দিনগুলোতে। ফিরে যাচ্ছেন ক্যাম্পাস দাপিয়ে বেড়ানো সোনালি সময়ে! এভাবেই পুরনোদের মহামিলন ঘটে গেছে আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে৷
শনিবার সকালে ‘শতবছরের দ্বারপ্রান্তে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’ প্রতিপাদ্য ধারণ করে শুরু হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই মিলনমেলা-২০১৯।
দিনব্যাপী মিলনমেলা উদ্বোধন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোঃ আখতারুজ্জামান।
উদ্বোধনী বক্তব্যে সবাইকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বললেন, আজ এই মিলনমেলায় আমি আপ্লুত, আনন্দে উদ্বেলিত। এই আনন্দ দ্বিগুণ হচ্ছে। কেননা প্রায় তিন দশক পর ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আয়োজনের একেবারে চূড়ান্ত পর্যায়ে আছি আমরা৷ ডাকসুর জন্য সহযোগিতা করেছেন আপনারা, সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। সামনের দিনগুলোতেও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি আপনাদের দায়বদ্ধতা অব্যাহত রাখবেন।
অধ্যাপক আখতারুজ্জামান সাবেক শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের গোডউইল অ্যাম্বাসেডর ৷ তারা হলেন একটি প্রতিষ্ঠানের শক্তি। যখন বিশ্ববিদ্যালয় অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো সংকটে আক্রান্ত হয়, তখন প্রাক্তনরা বিশ্ববিদ্যালয়ের পতাকা তুলে ধরেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি সকলের কিছু না কিছু দায়বদ্ধতা রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় যখন আর্থিকভাবে সংকটে পড়ে, তখন প্রাক্তনরা এগিয়ে আসেন। আপনারা এভাবে এগিয়ে আসলে আমরা সকল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারব৷
উপাচার্যের বক্তব্যের মধ্যদিয়ে পুরো দিনের উদ্বোধন হয়ে যায় মিলমেলা৷ এরপর প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন সাবেক অর্থমন্ত্রী ও অ্যালামনাইয়ের সাবেক সভাপতি আবুল মাল আব্দুল।
এসময় তিনি স্মরণ করেন কিছু পুরানো জনকে৷ বলেন, আমাদের প্রতিষ্ঠানের প্রথম সভাপতি বিচারপতি ইব্রাহিমের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করতে চাই৷ আরেকজন সভাপতি যিনি পুনর্মিলনের সুযোগ করে দিয়ে যান অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ। তাদের হাত ধরে আজ এই পর্যায়ে অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন। এরপর সবাইকে স্বাগত জানিয়ে সময়কে উপভোগ করার পরামর্শ দিয়ে শেষ করেন সংক্ষিপ্ত বক্তব্য।
মঞ্চে স্মৃতিচারণ করেছেন সাবেক মন্ত্রী ও ডাকসুর সাবেক ভিপি তোফায়েল আহমদ।
স্মৃতিচারণে বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসলে মনে পড়ে সোনালি সেই দিনগুলোর কথা৷ এখানে আমার অনেক স্মৃতি। আমি মৃত্তিকা বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলাম। ইকবাল হলের ৩১৩ নম্বর রুমে থাকতাম।১৯৬৫ সালে ইকবাল হলের সভাপতি হই। ১৯৬৭-৬৮ আমি ডাকসুর ভিপি নির্বাচিত হই৷ এই দিনগুলো আমার জীবনের স্মরণীয় দিন। সবচেয়ে সোনালি দিন। সেই সোনালি স্মৃতি ভুলে যাওয়া অসম্ভব। আজ এখানে এসে ফিরে যাচ্ছি সেই দিনগুলোতে।
অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি একে আজাদ এর সভাপতিত্বে মিলন মেলার শুরুতে স্বাগত বক্তব্য রাখেনসহ সভাপতি মোল্লা মোহাম্মদ কাউসার, শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন মহাসচিব রঞ্জন কর্মকার, সাবেক সভাপতি রকিবউদ্দীন, মনজুর এলাহি, নির্বাহী সদস্য আনোয়ারুল আজিম পারভেজ।
বর্ণাঢ্য মিলনমেলায় অংশ নিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ হাজারের অধিক প্রাক্তন শিক্ষার্থী, যারা দেশ বিদেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিত্ব করছেন। নেতৃত্ব দিচ্ছেন কোনো না কোনো সমাজে, দেশে বা প্রতিষ্ঠানে।
সকাল থেকে মিলনমেলায় উৎসবে মাতছেন একসময় ক্যাম্পাস মুখরিত রাখা সবুজ প্রাণগুলো। আড্ডা, গল্প, খুনসুটি সেলফি, ফটোসেশন করে কাটাচ্ছেন। বহু বছর আগের স্মৃতিচারণ করছেন। ক্যাম্পাস জীবন শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বন্ধন ছিঁড়ে যাওয়া পুরনো জুটিদের মিলন হয় আজ। অনেকে স্মৃতির আয়নায় বিমর্ষ হয়ে পড়ছেন ভালোবাসার মানুষকে দেখে, যে বা যারা ইতোমধ্যে হয়তো অন্যের ঘর রাঙিয়ে চলেছেন বহু বছর ধরে।
ক্যাম্পাসের স্মৃতিগুলো আজ এই খেলার মাঠে প্রস্ফুটিত হচ্ছে। আজ হারানো গল্পগুলো ফিরে পাওয়ার দিন। আজ বর্ণিল দিন।
এভাবে চলছে সন্ধ্যা অবধি। পরে বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্যদিয়ে এই বছরের মিলনমেলার ইতি ঘটে। তারপর অপেক্ষার প্রহর গুনবেন আগামী বছরের৷ এর মধ্যে কেউ কেউ হারিয়ে যাবেন মহাকালে৷ আর কখনো বন্ধুর দেখা হবে না কারো কারো। অনেক নতুন প্রাণ এসে দখল নিবেন স্থান। চলতে থাকবে কাল থেকে কাল। শতাব্দীর পর শতাব্দী।








