মঞ্চ প্রস্তুত ছিল। প্রস্তুত কুশিলবরা। প্রস্তুত ছিল বাংলাদেশও। রোমাঞ্চ আর শঙ্কা হাত ধরাধরি করে রাত্রি যাপনে গিয়েছিল মঙ্গলবার। বুধবার মিরপুর টেস্টের চতুর্থ দিনে অবশ্য দাপটের সঙ্গে সব শঙ্কাকে উড়িয়ে জয়মাল্য অর্জন করেছে বাংলাদেশই। প্রথমবারের মত অস্ট্রেলিয়াকে হারানোর স্বাদ। ২০ রানের জয়ে দুই টেস্টের সিরিজে এগিয়ে যাওয়া। যে জয়ের পরতে পরতে ছিল রোমাঞ্চের ছড়াছড়ি।
প্রথম দিন:
রোববার। শের-ই-বাংলায় দিনের শুরুটা ছিল মেঘে ঢাকা আকাশ নিয়ে। কন্ডিশন ছিল পেস বোলিংয়ের জন্য উত্তম-সহায়ক। তাতে আগুন ঝরান প্যাট কামিন্স। পুরো সুবিধা তুলে নিয়ে সৌম্য, ইমরুল ও সাব্বিরকে সাজঘরে পাঠান। ৪ ওভারে ১০ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে মহাবিপদে বাংলাদেশ।
ঘুরে দাঁড়ানো শুরু নিজেদের ৫০তম টেস্টে জুটি বাঁধা তামিম-সাকিবে। মন্থর উইকেটে অফস্পিনার লায়নকে চমৎকারভাবে সামলানোর পর একে একে অ্যাগার-হ্যাজেলউডদের হতাশ করে ভয়াবহ অবস্থা থেকে দলকে টেনে তোলেন দুই অভিজ্ঞ সেনানী। ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে ইনিংস গড়ার চেষ্টায় আসে ১৫৫ রানের জুটি। সেপথে টেস্টে মাত্র পঞ্চমবারের মত জুটি বাধার স্বাদ তামিম-সাকিবের।
তামিম থাকলেন আগাগোড়া সতর্ক। আবার চড়াও হয়েছেন জায়গা মত বল পেলেই। লায়নকে স্বাগতম জানিয়েছেন ছয় হাঁকিয়ে। সাকিব নিজের মত, থাকল ঝুঁকিপূর্ণ অনেক শট। মধ্যবিরতির পর প্রথম ওভারেই ছুঁয়ে ফেলেন ফিফটি। সাকিব ২২তম ফিফটিকে ৮৪ রানে থামিয়ে ফেরেন লায়নের হঠাত লাফিয়ে ওঠা এক বলে।
বাংলাদেশের হয়ে ৫০তম টেস্ট খেলতে নেমে ৫০ করা এই অলরাউন্ডারের আগেই সাজঘরে তামিম। ম্যাক্সওয়েলের একটি লাফিয়ে ওঠা বলে, ৭১ রানের অবদান তার। এরপর ছোট একটা ধস। নাসিরের ২৩ আর মিরাজের ১৮-এর পর ২৬০ রানে অলআউট বাংলাদেশ।
বড় স্কোরের সম্ভাবনা জলাঞ্জলি দিয়ে বোলিংয়ে আসে বাংলাদেশ। শেষ বিকেলের ঢলে পড়া আলোয় পাল্টা আঘাতে আবারও ম্যাচে ফেরে স্বাগতিকরা। ১৪ রানে ৩ অজি উইকেট ফেলে দিয়ে স্বস্তিতে থেকে ঘুমাতে যায় লাল-সবুজের দল।
দ্বিতীয় দিন:
সোমবার। শুরু থেকেই আত্মবিশ্বাসের ঝলক ঠিকরে পড়তে থাকে বাংলাদেশের বোলার-ফিল্ডারদের শরীর বেয়ে। ওয়ার্নার-খাজা আগের দিনই সাজঘরে, উইকেটে বড় বাধা স্মিথ। আগের দিনের সেরা পারফর্মার সাকিব সেটা সংবাদ সম্মেলনেই বলে গেছেন। লিডের লক্ষ্য নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার শেষ ৭ উইকেটে হামলে পড়ার সময়টাতে প্রথম সাফল্য সেই স্মিথকে ফিরিয়েই।
দিনের শুরুতেই বড় বাধা উপড়ে ফেলেন মিরাজ। বোল্ড করেন অধিনায়ক স্মিথকে (৮)। এরপর রেনশ-হ্যান্ডসকম্ব জুটিতে প্রতিরোধ। সাকিবের বলে রিভিউ নিয়ে হ্যান্ডসকম্বকে ফেরানো যায়নি। মিরাজের বলে এলবিডব্লিউ হয়ে রিভিউয়ে পার রেনশও। দুশ্চিন্তা ঘনীভূত হতে থাকে। মোস্তাফিজের বলে শর্ট লেগে রেনশর ক্যাচ ছাড়েন ইমরুল। আরও বড় বিপদের শঙ্কা। কিছুসময় পর সেটি আরও বাড়ে তাইজুলে বলে শর্ট লেগে সেই ইমরুলই রেনশর আরেকটি ক্যাচ ফেললে।
তখনই ত্রাতা তাইজুল। হ্যান্ডসকম্বকে (৩৩) আচমকা নিচু হয়ে যাওয়া বলে এলবিডব্লিউ করেন বাঁহাতি স্পিনার। আক্রমণে ফিরেই রেনশ (৪৫) বাধা সরান সাকিব। স্লিপে প্রথম প্রচেষ্টায় ধরতে না পারলেও সৌম্যর দ্বিতীয় চেষ্টা বিফলে যায়নি।
সেখান থেকে সাকিবের ঘূর্ণিতে সব চোখের পলকেই পাল্টে যায়। প্রথম সেশন ৬ উইকেটে ১২৩ রান তোলা অজিদের ভরসা ম্যাক্সওয়েল এবং ওয়েড। লাঞ্চের পর প্রথম ওভারেই মিরাজের আঘাত, ওয়েড এলবিডব্লিউ। ম্যাক্সওয়েলকে এগোতো দেখে ঝুলিয়ে দেয়া বলে মুশফিককে দিয়ে স্টাম্পিং করান সাকিব। বড় বাধাটির বিদায়।
তখন লেজ মুড়িয়ে দেয়া সময়ের ব্যাপার মনে হচ্ছিল। অ্যাগার-কামিন্স জুটি ক্রিজে। তখন সাকিবের বলে কামিন্সকে ফেরানোর সুযোগ হাতছাড়া করে বাংলাদেশ, সহজ ক্যাচ হাতছাড়া করেন শফিউল। চা-বিরতির সময় ঝিরঝির বৃষ্টি নামে। ঢেকে দেওয়া হয় আউটফিল্ড।
নবম উইকেটে কামিন্স-অ্যাগারের ৪৯ রানের জুটি। বড় লিড হাতছাড়া হচ্ছে। সাকিব আবারও ত্রাতা তখনই। কামিন্সকে (২৫) চতুর্থ শিকার বানান বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার। পরে হ্যাজেলউডকে ফরোয়ার্ড শর্ট লেগে ইমরুলের ক্যাচ বানিয়ে ষোলকলা পূর্ণ করেন সাকিব। অজিরা ২১৭ রানে অলআউট। বাংলাদেশের বিপক্ষে অজিদের সর্বনিম্ন সংগ্রহও। বাংলাদেশের লিড ৪৩ রানের। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে মাত্র দ্বিতীয়বার।
সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম সুযোগই ৫ উইকেট সাকিবের। টেস্ট খেলুড়ে নয় দেশের বিপক্ষে অন্তত একবার ইনিংসে পাঁচ উইকেট পাওয়ার চক্রপূরণ। মুরালিধরন, স্টেইন ও হেরাথের পর মাত্র চতুর্থ জন হিসেবে এই কীর্তিতে নাম লেখান সাকিব। সঙ্গে বোথামের দিকে এগিয়ে যান আরেকধাপ। বোথাম একই টেস্টে ফিফটি ও পাঁচ উইকেটের কীর্তি গড়েছেন ১১বার, সাকিবের হল ৮বার।
দিনের শেষে ব্যাটিংয়ে এসে তামিম-সৌম্য দ্বিতীয় ইনিংসের শুরুতে সতর্কই থাকেন। বাংলাদেশের ২০ ওভার পার করে দেন সাবলীলভাবে। খেলা দুই ওভার বাকি, তখনই পাগলাটে এক শটে সৌম্য (১৫) উইকেট বিলিয়ে দিলে দিনের সমাপ্তি একটু ধাক্কা নিয়ে। ৪৩ রানের উদ্বোধনী জুটি থামার পর তাইজুল নাইটওয়াচম্যান। টাইগাররা লিড ৮৮ রানে নিয়ে ঘুমাতে যায়।
তৃতীয় দিন:
মঙ্গলবার। যেকোনো লক্ষ্য তাড়া করার সামর্থ্য আছে অস্ট্রেলিয়ার। আর যেকোনো লক্ষ্যেই ম্যাচ হাতে পুড়তে সামর্থ্য বাংলাদেশের। এমন লক্ষ্য নিয়েই দিন শুরু বাংলাদেশের। তামিম শুরু থেকেই অভিজ্ঞতার পুরোটা নিংড়ে দিচ্ছিলেন। তাইজুল ফেরার পর প্রথম ইনিংসে শূন্য রানে ফেরা ইমরুল ব্যর্থ দ্বিতীয় ইনিংসেও।
নিজের ৫০তম টেস্টে দ্বিতীয় ইনিংসেও অর্ধশতক তুলে নেন তামিম। ফেরেন ৭৮ রানে। তার আগে মুশফিককে নিয়ে প্রতিরোধ। দ্বিতীয় সেশনের শুরুতে তামিমকে কট বিহাইন্ডের জোরাল আবেদনে সাড়া দেননি আম্পায়ার আলিম দার। রিভিউ নিয়ে সাফল্য পায় অজিরা, ভাঙে ৬৮ রানের জুটি।
পরে অহেতুক ঝুঁকি নিয়ে সাকিব (৫) টাইমিং গড়বড় করে ফেরেন, কাভারে ক্যাচ দিয়ে। তার কিছুপরই সাব্বিরের চারে লিড দুইশ পার। তখন আকাশে ঘন কালো মেঘ। জ্বলে উঠেছে মিরপুরের ফ্লাডলাইট।
কৃত্রিম আলোর মাঝেই সাব্বিরের জোরাল স্ট্রেট ড্রাইভ লায়নের হাত ছুঁয়ে স্টাম্প ভেঙে দিলে সাজঘরে মুশফিক (৪১)। নাসিরও টিকলেন না। রানের খাতাই খুলতে পারেননি। অ্যাগারকে কাট করতে গিয়ে ওয়েডের গ্লাভসে ক্যাচ।
চাপটা নিতে পারলেন না সাব্বিরও। লায়নের বলে শর্ট লেগে হ্যান্ডসকম্বকে ক্যাচ ব্যক্তিগত ২২ রানে। প্রথম ইনিংসে শূন্যের পর এই যৎসামান্য অবদান। দ্রুত তিন উইকেট হারানো বাংলাদেশকে দুইশ রানে নেন অ্যাগারকে তিনবার বাউন্ডারি ছাড়া করা মিরাজ। পরে লায়নের বলে শর্ট ক্যাচ শফিউল, অজি অফস্পিনারের পঞ্চম শিকার।
লায়ন ষষ্ঠটি নেন মিরাজকে (২৬) ফিরিয়ে। বাংলাদেশকে দ্বিতীয় ইনিংস থামে ২২১ রানে। অজিদের সামনে ২৬৫ রানের লক্ষ্য দেয় টাইগাররা।
দুই অফস্পিনার মিরাজ ও নাসিরকে দিয়ে আক্রমণ শুরু করেন মুশফিক। বোলিংয়ে এসেই ওয়ার্নারের উইকেট পেতে পারতেন সাকিব। স্লিপে ক্যাচ নিতে পারেননি সৌম্য। উল্টো বাউন্ডারি পেয়ে যান ওয়ার্নার। সে সময়ে ১৪ রানে অজি উদ্বোধনী।
নিজের পঞ্চম ওভারে মিরাজের আঘাতে সাফল্য। এলবিডব্লিউ রেনশ। সেখান থেকে সাকিবকে সুইপ করার চেষ্টায় তাইজুলের দুর্দান্ত ক্যাচ খাজা। দিনের শেষ বেলায় আলো ঝলমলে স্বাগতিক ড্রেসিংরুম।
অধিনায়ক স্মিথ তখন ওয়ার্নারের সঙ্গে। স্মিথের ব্যাটিং প্রদর্শনী থাকল নড়বড়ে। মিরাজকে ফ্লিক করেছিলেন অজি অধিনায়ক, শর্ট লেগে ইমরুল কঠিন সুযোগটা তালুতে জমাতে পারেননি এরপর আর সাফল্য মেলেনি বাংলাদেশের।
ওয়ার্নার ফিফটি পেয়ে যান। ৩০তম ওভার শেষে ১০৯ রান তুলে দিন শেষ করে সফরকারীরা। ওয়ার্নার ৭৫ ও স্মিথ ২৫ রানে কাটা হয়ে নির্ঘুম টাইগারপ্রেমীদের অন্তরে হানতে থাকেন।
চতুর্থ দিন:
বুধবার। আলো ঝলমলে রৌদ্রোজ্জ্বল দিন। অস্ট্রেলিয়ার চাই ১৫৬ রান, বাংলাদেশের ৮ উইকেট। অজিরা সংগ্রহটা ১৫৮ পর্যন্ত টেনে নেয়। উজ্জ্বল মেঘ মনের কোনের ঘনঘটা ছাপিয়ে যেতে পারে না। তখনই ত্রাতা সর্বসময়ের সাকিব। ১১২ রান করা ওয়ার্নার সাজঘরে। স্মিথ তখনও ছিলেন। সেটারও শেষ টানলের সাকিব। ২৭ রান করা প্রতিপক্ষ অধিনায়ক বিশ্বসেরা অলরাউন্ডারের বলে স্বাগতিক অধিনায়ক মুশফিকের গ্লাভসে ধরা।
এরপর আর অজিদের দাঁড়াতেই দেয়নি টাইগার বাহিনী। হ্যান্ডসকম্ব ১৫ ও ম্যাক্সওয়েল ১৪ রান করে যৎসামান্যই চোখ রাঙাতে পারলেন। সাকিব একের পর এক আঘাত হেনে গেলেন। সঙ্গী হলেন তাইজুল। ম্যাক্সওয়েলকে বোল্ড করেই দ্বিতীয় ইনিংসেও পাঁচ উইকেট সাকিবের, টেস্ট ক্যারিয়ারে দ্বিতীয়বার ১০ উইকেট দুই ইনিংস মিলিয়ে।
তখনও কিছুটা রোমাঞ্চ বাকি ছিল। সাকিবের বলে কামিন্সের ক্যাচ ছেড়ে সৌম্য হতাশা ছড়ান। তখন ত্রাতা মিরাজ। ১২ রান করা লায়ন সৌম্যর দুর্দান্ত ক্যাচ। কামিন্স চোখ রাঙিয়ে ৩৩ রানে অপরাজিত থাকলেন। হ্যাজেলউডকে ফিরিয়ে তাইজুল পূর্ণ করলেন জয় রাঙানো।
ছবি: সাকিব উল ইসলাম।







