ঘূর্ণিঝড় ‘রোয়ানু’ আরও উত্তর-উত্তরপূর্বে বাংলাদেশ উপকূলের দিকে এগিয়ে আসায় সমুদ্রবন্দরগুলোতে বিপদ সংকেত দেখাতে বলেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
শুক্রবার সন্ধ্যায় আবহাওয়ার বিশেষ বুলেটিনে চট্টগ্রাম, পায়রা ও মংলা সমুদ্র বন্দরকে ৭ নম্বর ‘বিপদ সংকেত’ দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। কক্সবাজারকে দেখাতে বলা হয়েছে ৬ নম্বর ‘বিপদ সংকেত’।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক সামছুদ্দিন জানিয়েছন, ৫ থেকে ৭ নম্বর বিপদ সংকেতের মাত্রা একই। ঝড় বন্দরের কোন দিক দিয়ে যাবে তার ভিত্তিতে নাম্বার আলাদা করা হয়।
তিনি বলেন, বিপদ সংকেতের মানে হচ্ছে, বন্দর ছোট বা মাঝারি তীব্রতার এক সামুদ্রিক ঝড়ের কবলে পড়েছে। ঝড়ে সময় বাতাসের সর্বোচ্চ একটানা গতিবেগ ঘণ্টায় ৬২ থেকে ৮৮ কিলোমিটার থাকবে।
আর জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ আবদুল মান্নান জানান, সন্ধ্যা ৬টায় ঘূর্ণিঝড় রোয়ানু চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ৮৬০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিম, কক্সবাজার সমুদ্রবন্দর থেকে ৮৪০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিম, পায়রা সমুদ্রবন্দর থেকে ৭০৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিম এবং মংলা সমুদ্রবন্দর থেকে ৬৭৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থান করছিল।
সে সময় ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের ৫৪ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের একটানা সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ৬২ কিলোমিটার, যা দমকা বা ঝড়ো হাওয়ার আকারে ৮৮ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছিল।
কোন সংকেতের কী মানে জানতে চাইলে মান্নান বলেন, আমরা পর্যবেক্ষণ করে দেখে দেখেছি, ঘূর্ণিঝড়টি এখন ঘণ্টায় ৩০ থেকে ৩৫ কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করছে।
এই ঝড় আরও উত্তর-পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে শনিবার বিকাল থেকে সন্ধ্যার মধ্যে নাগাদ বরিশাল-চট্টগ্রাম অঞ্চলের ওপর দিয়ে উপকূল অতিক্রম করতে পারে বলে ধারণা করছেন আবহাওয়াবিদরা।
গভীর নিম্নচাপ থেকে বুধবার গভীররাতে সৃষ্ট এই ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে সাগর উত্তাল থাকায় উত্তর বঙ্গোপসাগর ও গভীর সাগরে অবস্থানরত সব মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে উপকূলের কাছাকাছি থাকতে বলা হয়েছে, যাতে তারা স্বল্প সময়ের নির্দেশে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে পারে।
এদিকে, রোয়ানুর ক্ষতি মোকাবেলায় শুক্রবার রাত ৮টার মধ্যে উপকূলীয় এলাকার মানুষজনকে সরে যেতে বলেছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর।
এরই মধ্যে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. শাহ কামাল।
এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, রাত ৮টার মধ্যে তাদের সরিয়ে নিতে সারাদেশে নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে ১৮ জেলার সাড়ে ২১ লাখ মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হবে।
জেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলেও জানান সচিব।
শাহ কামাল বলেন, সারাদেশে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খুলে তারা সেটা তদারকি করছেন। শুক্রবার দুপুর থেকেই মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়া শুরু হয়েছে।
‘ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানতে পারে এমন ১৮টি জেলার ৩৮৫১টি আশ্রয়কেন্দ্রে এসব মানুষকে আনা হবে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে থাকা, খাওয়া ও চিকিৎসার সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’-বলেন তিনি।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের লোকবলের কথা জানিয়ে সচিব বলেন, ‘উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের ঘুর্ণিঝড় প্রস্তুতি কমিটির (সিপিপি) স্বেচ্ছাসেবক রয়েছে ৫৫ হাজার। এছাড়া রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি, রোভার স্কাউট ও আনসার ভিডিপিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিশাল কর্মীবাহিনী রয়েছে। এক্ষেত্রে তারা সবাই একযোগে কাজ করছে।’
সাধারণ মানুষকে নিরাপদ জায়গা আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘উপকূলীয় এলাকা নৌযান চলাচল বন্ধ রাখা এবং বন্দর এলাকায় জাহাজ নিরাপদে সরিয়ে আনতে বলেছি।’
এবার ১ নম্বর সতর্ক সংকেতের সূচনা থেকে প্রস্তুতি নেওয়ার কারণে ক্ষতি কমিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন শাহ কামাল।
××৮টার মধ্যে ঝুঁকিপ্রবণ এলাকার মানুষজনকে সরে যাওয়ার নির্দেশনা
×× ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে ১৮ জেলার সাড়ে ২১ লাখ মানুষ
×× ১৮টি জেলার ৩৮৫১টি আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়া হবে মানুষজনকে
×× ঘুর্ণিঝড় প্রস্তুতি কমিটির (সিপিপি) স্বেচ্ছাসেবক রয়েছে ৫৫ হাজার
×× মাঠে থাকবেন রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি, রোভার স্কাউট ও আনসার ভিডিপি সদস্যরাও
এদিকে, আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক সামছুদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, চট্টগ্রাম ও তার আশপাশের জেলার উপকূলে সাত নম্বর সতর্ক সংকেত জারি করা হয়েছে। মাঝারি ধরনের ঝড় হওয়ায় আমাদের আশা সতর্ক সংকেত ৭-ই থাকবে।
তবে মংলা ও পায়রাবন্দর এলাকায় সতর্ক সংকেত ৫ থেকে ৭ হতে পারে বলে জানান তিনি।
সংবাদ সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রিয়াজ আহমেদ উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে এক জরুরী সভায় জানানো হয় ঘুর্ণিঝড় ‘রোয়ানু’ মোকাবেলায় সকল প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। নোয়াখালীতেও দুর্যোগ মোকাবেলা কমিটির জরুরী প্রস্তুতি সভায় জানানো হয় ঘুর্ণিঝড় পূর্ববতী এবং পরবর্তী সময়ের জন্য সকল প্রকার প্রস্তুতিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
বাতিল করা হয়েছে সব সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি। প্রস্তুত রাখা হয়েছে সব আশ্রয় কেন্দ্র আর উপকূলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে। এছাড়া ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় রেডক্রিসেন্ট কর্মী, মেডিকেল টিম, উদ্ধারকর্মী প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ একেএম. নাজমুল হক জানান, নিম্নচাপ কেন্দ্রের ৪৪ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের একটানা সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ৪০ কিলোমিটার, যা দমকা ও ঝড়ো হাওয়া আকারে ৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। নিম্নচাপ রোয়ানুর প্রভাবে সাগর প্রচণ্ড উত্তাল হয়ে উঠেছে।
পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত সকল মাছধরা ট্রলার ও সকল নৌযানকে উপকূলের কাছাকাছি নিরাপদ আশ্রয়ে থেকে চলাচল করতে বলা হয়েছে। জেলা তথ্য অফিস শহরে মাইকিং করে এই সতর্কবার্তা প্রচার করছে।
সাগর থেকে এখনো ট্রলারগুলো ফিরে আসছে। তবে যেসব ট্রলার এখনো ফিরেনি তা আজ বিকালের মধ্যে ফিরে আসবে বলে জানিয়েছে জেলা বোট মালিক সমিতি। সব মিলে এ ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় প্রস্তুত কক্সবাজার।
বিপদ সংকেত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বন্দরের পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে বলে জানিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর কর্তৃপক্ষও রোয়ানু মোকাবেলায় প্রাথমিক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে।










