সকল জল্পনা-কল্পনার পর অবশেষে বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগ বিধি চূড়ান্ত করেছে শিক্ষামন্ত্রণালয়। সংশোধিত বিধি অনুযায়ী শিক্ষক নিয়োগের একচ্ছত্র ক্ষমতা হারাচ্ছে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটি। এই লক্ষ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ২২ অক্টোবর ২০১৫ তারিখে তাদের নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ‘বেসরকারী শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ আইন, ২০০৫ সংশোধন কল্পে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে যার এস.আর.ও.নং-৩০৯-আইন/২০১৫।
সংশোধিত বিধিমালা অনুযায়ী বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক হওয়ার জন্য একজন প্রার্থীকে তিন ধাপে সম্পন্ন (প্রিলিমিনারি লিখিত ও ভাইভা) পরীক্ষায় যোগ্যতা যাচাই করতে হবে। উত্তীর্ণ প্রার্থীদের মধ্যে মেধাক্রম অনুসারে (উপজেলা জেলা ও জাতীয় ভিত্তিক) প্যানেল করা হবে। শুন্য পদের ভিত্তিতে আগেই তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে এই প্যানেল থেকে শিক্ষক নিয়োগ করতে হবে।
প্রজ্ঞাপনের সংশোধনকৃত বিধি ও শিক্ষা ডট কমকে দেওয়া শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব নজরুল ইসলাম খানের সাক্ষাৎকার মোতাবেক এখন থেকে এমপিওভুক্ত কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আর কোনো শিক্ষক নিয়োগ দিতে পারবেনা। সাক্ষাৎকারের ভাষ্য অনুযায়ী বিগত ২২ অক্টোবর থেকে এই নির্দেশ কার্যকর হবে। অবশ্য ইতিপূর্বে নিবন্ধনকৃতরা আগামী তিন বছরের জন্য বিশেষ সুযোগ পাবেন। এর জন্য তাদেরকে আরো একটি ভাইভা পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হবে।
বলতে দ্বিধা নেই, দারুণ একটি কাজ হয়েছে। অসাধারণ একটি মাইলফলক স্থাপন করেছে শিক্ষামন্ত্রণালয়। আমার বিবেচনায় শিক্ষামন্ত্রণালয়ের অন্যতম গৌরবোজ্জ্বল সিদ্ধান্ত এটি। এমন একটি সাহসী উদ্যেগের অবশ্যম্ভাবী ফল পাওয়া যাবে শীঘ্রই। যারা চান, শিক্ষা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ভালোভাবে চলুক তারা সরকারের এই উদ্যেগের ভূয়সী প্রশংসা করছেন। উপযুক্ত ও মেধাবী শিক্ষকের পদচারণায় আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন উদ্যমে কাজ করে যাবে এই আশায় তারা এখন আশাবাদী। তবে, এ সিদ্ধান্তে একটা পক্ষ চরম অসন্তুষ্ট। এদের কথা-বার্তা কিংবা প্রজ্ঞাপনের প্রতিক্রিয়ায় তাদের হতাশা স্পষ্ট! বিশেষ করে সরকার দলীয় স্থানীয় পর্যায়ের নেতা-কর্মী যারা ক্ষমতাসীন দলের মহা ক্ষমতাধর এমপি সাহেবের ডিও লেটারের মাধ্যমে বিভিন্ন বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে সভাপতি মনোনীত হয়ে নিয়োগ বাণিজ্যে জড়িত।
মূলত এমপি সাহেবরাই তাদের আওতাধীন সকল এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। স্থানীয় এমপির অনুমোদন ও নির্দেশনা ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা কারো নেই। সরকারি নিয়মানুযায়ী একজন এমপি একাধারে চারটি প্রতিষ্ঠানের সভাপতির দায়িত্ব পালন করতে পারেন। দেখা যায়, এমপিরা এই বিধির বাইরে গিয়ে একেকজন ৬/৭ টি প্রতিষ্ঠানের সভাপতির চেয়ার দখল করে আছেন। অন্যগুলো এমপি সাহেবের অনুগত দলীয় নেতাকর্মীদের সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়। শিক্ষকদের বিল-ভাতায় সই করা ছাড়া এসব সভাপতির আর কিছুই করার থাকেনা! শিক্ষক নিয়োগ বা গুরুত্বপূর্ণ যে কোনো সিদ্ধান্ত আসে সংশ্লিষ্ট এমপি সাহেবের প্যাড থেকে। এর বাত্যয় হওয়ার কোনো সুযোগ নেই!
বলাবাহুল্য, সাম্প্রতিককালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমপিদের দৌরাত্ম্যে নিয়োগবাণিজ্য মহামারী আকার ধারণ করেছে। কোনো কোনো এমপির আত্মীয়-স্বজন এই বাণিজ্য করে একেকজন কোটি কোটি টাকার মালিক বনেছেন। ৫/৭ লাখ টাকার বিনিময়ে যেন তেন কাউকে ‘শিক্ষক’ বানিয়ে বাংলাদেশের শিক্ষা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যে ভয়াবহ ক্ষক্তি করা হয়েছে, তার ফল ভোগ করতে হবে কম পক্ষে আরো ত্রিশ বছর। এ প্রেক্ষিতে দেশের সুশীল সমাজ ও শিক্ষাবিদরা দীর্ঘদিন যাবত শিক্ষক নিয়োগের প্রচিলত বিধি সংশোধন করার পক্ষে মত দেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিয়োগগুলো সরকারের নিয়ন্ত্রণে হওয়া উচিত বলে তারা বার বার বলে আসছেন। দুঃখজনকভাবে সরকার এক্ষেত্রে এতদিন রহস্যজনক নীরবতা পালন করে আসছিল!
যাহোক, অবশেষে সরকারের বোধোদয় এবং কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ সমগ্র জাতিকে আশান্বিত করেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ় সমর্থন ও অনুশাসনের পর মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর নেতৃত্বে শিক্ষা সচিব মহোদয় একটি ঐতিহাসিক কার্য সম্পাদন করেছেন। এমপিওভুক্ত বেসরকারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মেধাবী ও উপযুক্ত শিক্ষক নিয়োগের সরকারের উদ্যোগ সর্বান্তকরণে সফল হোক, এই কামনা করি।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)






