আজ আমরা কথা বলছি বন্ধ্যাত্ব বিষয়ে। যদি কোনো দম্পতি এক বছর বা তার বেশি সময় ধরে সপ্তাহে দুই থেকে তিনবার কোনো জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহার না করে সহবাস করার পরও গর্ভধারণে সক্ষম না হন, তখন সেই অবস্থাকে বন্ধ্যাত্ব বা ইনফার্টিলিটি (Infertility) বলা হয়। কারণ, সন্তান ধারণের চেষ্টা শুরু করার পর প্রায় ৮০ শতাংশ দম্পতি প্রথম বছরেই গর্ভধারণে সক্ষম হন, আরও প্রায় ১০ শতাংশ দ্বিতীয় বছরে গর্ভধারণ করেন। বাকি প্রায় ১০ শতাংশ দম্পতির সন্তান ধারণে কোনো না কোনো ধরনের চিকিৎসার প্রয়োজন হয়।
বর্তমানে অনেক নারীই বিভিন্ন কারণে তুলনামূলক দেরিতে সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন। কারও ক্ষেত্রে চাকরি, কারও ক্ষেত্রে ক্যারিয়ার গঠন, আবার অনেকেই দেরিতে বিয়ে করছেন। সে ক্ষেত্রে নারীর বয়স যদি ৩৫ বছরের বেশি হয়, তাহলে ছয় মাসের বেশি অপেক্ষা না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।
আবার কারও যদি আগে থেকেই স্ত্রীরোগ, মাসিকের অনিয়ম, শারীরিক সম্পর্কের সমস্যা বা অন্য কোনো প্রজনন-সংক্রান্ত জটিলতা থেকে থাকে, তাহলে ছয় মাস বা এক বছর অপেক্ষা না করে সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা করার সঙ্গে সঙ্গেই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
অনেক দম্পতিরই প্রশ্ন থাকে, দীর্ঘদিন চেষ্টা করার পরও কেন গর্ভধারণ হচ্ছে না?
অনেকের ধারণা, বন্ধ্যাত্ব একটি অভিশাপ এবং এর কোনো চিকিৎসা নেই। আবার অনেকেই মনে করেন, বন্ধ্যাত্বের জন্য শুধু নারীরাই দায়ী, পুরুষের কোনো ভূমিকা নেই। কিন্তু গবেষণা ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের তথ্য বলছে, বিষয়টি মোটেও এমন নয়। বন্ধ্যাত্বের ক্ষেত্রে নারীর সমস্যা প্রায় ২০ থেকে ৪০ শতাংশ, পুরুষের সমস্যা প্রায় ৩০ শতাংশ, স্বামী-স্ত্রী উভয়ের সমস্যা প্রায় ১০ শতাংশ এবং ১০ থেকে ৩০ শতাংশ ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ শনাক্ত করা যায় না। এ ধরনের অবস্থাকে ব্যাখ্যাহীন বন্ধ্যাত্ব (Unexplained Infertility) বলা হয়। তবে এ ক্ষেত্রেও সাধারণ পরীক্ষায় ধরা না পড়া সূক্ষ্ম কিছু সমস্যা থাকতে পারে।
বন্ধ্যাত্বের কারণ বুঝতে হলে আগে জানতে হবে, স্বাভাবিকভাবে গর্ভধারণ কীভাবে হয়।
নারীর প্রজননতন্ত্রে একটি জরায়ু, দুটি ডিম্বাশয় এবং দুটি ডিম্বনালী থাকে। প্রতি মাসে সাধারণত একটি ডিম্বাশয় থেকে একটি পরিপক্ব ডিম্বাণু নিঃসৃত হয়। এরপর ডিম্বনালীর শেষ প্রান্তের আঙুলের মতো অংশ ডিম্বাণুটিকে গ্রহণ করে ডিম্বনালীর ভেতরে নিয়ে যায়। এই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সহবাস হলে লক্ষ লক্ষ শুক্রাণু যোনিপথ দিয়ে জরায়ু অতিক্রম করে ডিম্বাণুর দিকে এগিয়ে যায়। যদিও একটি মাত্র শুক্রাণু ডিম্বাণুকে নিষিক্ত করে, তবে সেই একটি শুক্রাণুর সফলভাবে পৌঁছাতে অসংখ্য সুস্থ শুক্রাণুর প্রয়োজন হয়। তাই শুক্রাণুর সংখ্যা পর্যাপ্ত হওয়া, দ্রুতগতিসম্পন্ন হওয়া এবং গঠন স্বাভাবিক হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একটি সুস্থ ডিম্বাণু এবং একটি সুস্থ শুক্রাণুর মিলনের মাধ্যমেই নিষেক সম্পন্ন হয়। ডিম্বনালীর ভেতরে নিষেকের পর একটি ভ্রূণের সৃষ্টি হয়। তিন থেকে চার দিনের মধ্যে সেই ভ্রূণ জরায়ুতে এসে বাসা বাঁধে। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ইমপ্লান্টেশন।
সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) জানিয়েছে, বিশ্বে প্রতি ছয়জনের একজন কোনো না কোনো সময় বন্ধ্যাত্বের সমস্যায় ভোগেন। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রায় ১৭ শতাংশ মানুষ এ সমস্যায় আক্রান্ত। অর্থাৎ, বন্ধ্যাত্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রজননস্বাস্থ্য-সংক্রান্ত রোগ।
নারীদের বন্ধ্যাত্বের অন্যতম কারণ হলো ডিম্বাণুর সমস্যা। অনেক সময় হরমোনজনিত কারণে ডিম্বাণু নিয়মিত নিঃসৃত হয় না, যাকে **ওভুলেশন ডিসঅর্ডার** বলা হয়। আবার বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডিম্বাশয়ে ডিম্বাণুর সংখ্যা এবং গুণগত মান উভয়ই কমতে থাকে। এ ছাড়া এন্ডোমেট্রিওমা (চকলেট সিস্ট), সংক্রমণ বা ডিম্বাশয়ের অন্যান্য রোগের কারণে ডিম্বাণুর স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হতে পারে।
দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো ডিম্বনালীর সমস্যা। ডিম্বনালীর ভেতরে থাকা সূক্ষ্ম সিলিয়া ডিম্বাণুকে নিষেকের স্থানের দিকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করে। সংক্রমণ বা এন্ডোমেট্রিওসিসের কারণে এই সিলিয়াগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলে ডিম্বাণুর স্বাভাবিক চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়। আবার ডিম্বনালী ও ডিম্বাশয়ের স্বাভাবিক অবস্থান পরিবর্তিত হলেও ডিম্বাণু সঠিকভাবে গ্রহণ করা সম্ভব হয় না।
তৃতীয় কারণ জরায়ুর সমস্যা। জরায়ুর ভেতরে এন্ডোমেট্রিয়াল পলিপ, ফাইব্রয়েড, অ্যাডিনোমায়োসিস বা জন্মগত বিভাজক পর্দা থাকলে ভ্রূণের জরায়ুতে স্থাপন (ইমপ্লান্টেশন) বাধাগ্রস্ত হতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে গর্ভপাতের ঝুঁকিও বেড়ে যায়।
চতুর্থ কারণ হলো জরায়ুমুখের (সার্ভিক্স) সমস্যা। পূর্বের কোনো অস্ত্রোপচার, যেমন LEEP, কিংবা টিউমারের কারণে জরায়ুমুখ সংকুচিত বা বন্ধ হয়ে গেলে শুক্রাণু জরায়ুতে প্রবেশ করতে পারে না।
অন্যদিকে পুরুষের বন্ধ্যাত্বেরও বিভিন্ন কারণ রয়েছে। অণ্ডকোষের সমস্যার কারণে পর্যাপ্ত শুক্রাণু তৈরি নাও হতে পারে। আবার গনোরিয়া, সিফিলিস, যক্ষ্মাসহ বিভিন্ন সংক্রমণের কারণে শুক্রাণুবাহী নালী বন্ধ হয়ে যেতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে শুক্রাণুর সংখ্যা কম থাকে, চলাচলের ক্ষমতা কমে যায় অথবা গঠনগত ত্রুটি থাকে। এ ছাড়া বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক সমস্যার কারণে ইরেকটাইল ডিসফাংশন বা সময়ের আগে বীর্যপাতের সমস্যাও সন্তান ধারণে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
দীর্ঘদিনের ডায়াবেটিস, অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি রোগ কিংবা কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াতেও পুরুষের প্রজননক্ষমতা কমে যেতে পারে।
বর্তমানে চিকিৎসাবিজ্ঞানে অনেক ক্ষেত্রেই ‘বন্ধ্যাত্ব’ শব্দটির পরিবর্তে সাব-ফার্টিলিটি (Subfertility) শব্দটি ব্যবহার করা হয়। এর অর্থ এই নয় যে, তাদের সন্তান হবে না। বরং সাধারণ দম্পতির তুলনায় তাদের গর্ভধারণের সম্ভাবনা কিছুটা কম থাকে এবং অনেক সময় চিকিৎসার প্রয়োজন হয়।
পরবর্তী পর্বে থাকছে:
বন্ধ্যাত্বের কারণ নির্ণয়ে কী কী পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয় এবং বয়স, হরমোন ও মানসিক চাপ কীভাবে বন্ধ্যাত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত, সে বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আইয়ের সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







