দেশে আইএস জঙ্গি নাই, তবে দেশীয় জঙ্গি আছে এবং তারা প্রশাসনের কঠোর নজরদারির কারণে নিয়ন্ত্রণে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালের এমন দাবির একদিনের মাথায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক এএফএম রেজাউল করিম সিদ্দিকীর খুনের ঘটনা ঘটল। অধ্যাপক রেজাউল বাসা থেকে বিশ্ববিদ্যালয় যাওয়ার পথে সন্ত্রাসীদের চাপাতির কোপে নিহত হন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শিক্ষক খুনের ঘটনা এবারই প্রথম নয়। এর আগে আরও তিন শিক্ষক খুনের ঘটনাসহ গত এক যুগে চারজন শিক্ষক খুনের ঘটনা ঘটেছে। এর বাইরে সেখানকার অগণন শিক্ষক, রাজনীতিবিদ, পেশাজীবী হত্যার হুমকি পেয়েছেন। গত বছর (২০১৫) সরকারের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এম শাহরিয়ার আলমসহ ৮ জন হুমকি পেয়েছিলেন।
রাবির অধ্যাপক, লেখক হাসান আজিজুল হক একাধিকবার হত্যার হুমকি পেয়েছেন। তাকে মোবাইলে, উড়ো চিঠিতে বিভিন্নভাবে হুমকি দেওয়া হয়েছে। প্রতি হুমকির পর গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে, থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হয়েছে। কিন্তু থানা-পুলিশ জিডি তদন্তপূর্বক কোনো ব্যবস্থা নিয়েছে এমন কোনো সংবাদ গণমাধ্যমে আসেনি।
শনিবার (২৩ এপ্রিল) অধ্যাপক রেজাউল করিমের খুনের ঘটনার পর পরই প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় রাজশাহী মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ শামসুদ্দিন যখন বললেন, সারা দেশে ব্লগার হত্যার আঘাতের ধরনের সঙ্গে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক এ এফ এম রেজাউল করিম সিদ্দিকী হত্যার মিল রয়েছে, পুলিশের ধারণা, ইসলামি চরমপন্থিদের হাতে তিনি খুন হয়েছেন। 
পুলিশের এমন বক্তব্যের সঙ্গে দায় এড়িয়ে যাওয়ার প্রচ্ছন্ন অভিপ্রায় ফুটে ওঠেছে। মনে হচ্ছিল তাদের অনন্ত প্রতীক্ষা ছিল কেউ ‘দায় স্বীকার’ করুক, সেটা। এর কিছুক্ষণ পর ‘দাওলাতুল ইসলাম’ নামে দায় স্বীকারের খবর দেয় আত-তামকিন নামক (at-tamkin.site) একটি ওয়েবসাইট। যেটি নিজেদের আমাক সংবাদ সংস্থা বলে প্রচার করছে।
এই ওয়েবসাইটে ঝোলানো আরবি ও বাংলায় এ হত্যা সম্পর্কিত দুটি পোস্টার ঝুলিয়ে রাখা হয়, যেখানে লেখা হয়েছে বাংলাদেশের রাজশাহী শহরে দাওলাতুল ইসলামের সৈনিকগণ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপককে হত্যা করেন। সে নাস্তিকতাবাদের দিকে লোকদের আহ্বান করত। ‘দাওলাতুল ইসলামের’ পর মধ্যপ্রাচ্য ভিত্তিক জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস) স্বীকার করেছে বলে জানিয়েছে জঙ্গি হুমকি পর্যবেক্ষণকারী ‘সাইট ইন্টেলিজেন্স গ্রুপ’।
নিরীশ্বরবাদে আহ্বান করার জন্য রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের এই শিক্ষককে হত্যা করা হয়েছে বলেও সাইট দাবি করে যদিও তার পরিবারের পক্ষ থেকে ‘নাস্তিকতা’ নিয়ে লেখালেখিকে অস্বীকার করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের পর জানা যায়, অধ্যাপক রেজাউল করিম সেতার বাজাতেন। ‘কোমলগান্ধার’ নামের এক লিটলম্যাগ সম্পাদনা করতেন। ‘সুন্দরম’ নামের একটি সাংস্কৃতিক সংগঠনের উপদেষ্টা ছিলেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পহেলা বৈশাখ সহ অন্যান্য সকল সাংস্কৃতিক উৎসব-অনুষ্ঠান উদযাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতেন।
অধ্যাপনার পাশাপাশি এগুলো করে তিনি আনন্দ খুঁজতেন। দেশের অন্য সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো রাবিতেও শিক্ষক রাজনীতি, দল-গ্রুপিং আছে, কিন্তু তিনি সেগুলো থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। ফলে ধারণা করা যায়, তার নিজস্ব সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে তিনি ছিলেন সক্রিয়। অধ্যাপক রেজাউলের লেখালেখিতে ধর্ম গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয় ছিল না বলে তিনি আস্তিক, না নাস্তিক সে আলোচনা অর্থহীন। সুতরাং ‘ধর্মের বিরুদ্ধে’ লেখালেখির কারণে খুন হয়েছেন সেটা সাধারণীকরণ।
এ কারণে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার অজুহাতপূর্ণ “দায় নিতে পারব না” এমন মন্তব্য তার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে না। “লেখালেখি খতিয়ে দেখা হবে সেখানে ধর্মের বিরুদ্ধে কিছু লেখা হয়েছে কিনা” অনলাইন এক্টিভিস্ট নাজিমুদ্দিন সামাদের হত্যা পরবর্তী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অর্বাচীন মন্তব্যও এক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। অধ্যাপক রেজাউল করিম হত্যাকাণ্ডের দুই দিনের মাথায় গাজীপুরের হাইসিকিউরিটি কারাগারের অদূরে একজন সাবেক কারারক্ষীকে সন্ত্রাসীরা গুলি করে হত্যা করে। 
এ হত্যাকাণ্ডের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বরাবরের মতো দায়িত্ব না নেওয়ার মতো করে মন্তব্য করেন ‘উন্নত বিশ্বে এরচেয়ে বেশি ঘটনা ঘটে’। তিনি এগুলোকে “বিচ্ছিন্ন ঘটনা” হিসেবে আখ্যা দিয়ে দাবি করে বলেন, “আমরা নিরাপদ”।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল যখন জোর দিয়ে “আমরা নিরাপদ” দাবি করেন, এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সোমবার (২৫ এপ্রিল) বিকালে রাজধানীর কলাবাগানের লেক সার্কাসে পার্সেল দেওয়ার কথা বলে বাসায় ঢুকে কুপিয়ে খুন করা হয় জুলহাজ মান্নান ও তার বন্ধু নাট্যকর্মী মাহবুব রাব্বী তনয়কে।
জুলহাজ মান্নান ছিলেন দেশের সমকামী ও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের অধিকার আদায়ের দাবিতে সোচ্চার থাকা পত্রিকা “রূপবান”-এর সম্পাদক। এ পত্রিকাটি প্রথম প্রকাশ হয় ২০১৪ সালে। এ পরিচয়ের বাইরে তাদের পরিচয় আছে। জুলহাজ মান্নান ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের সাবেক প্রটোকল কর্মকর্তা ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক দীপু মনির খালাত ভাই। আর তনয় ছিলেন লোকনাট্য দলের কর্মী। পিটিএ নামে একটি প্রতিষ্ঠানে ‘শিশু নাট্য প্রশিক্ষক’ হিসেবেও কাজ করতেন তিনি।
দেশে ব্লগার-লেখক, প্রকাশক, ইমাম, মুয়াজ্জিন, সাধু-সন্ন্যাসী, শিক্ষক, মুক্তিযোদ্ধা, বিদেশী নাগরিক সহ সকল শ্রেণি পেশার লোক খুন হলেও মন্ত্রীর চোখে সকল কিছুই “বিচ্ছিন্ন ঘটনা”। প্রতি ঘটনার অব্যবহিত পর তার এমন প্রতিক্রিয়া পরিহাসের মত শোনায়, দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার প্রাণান্ত চেষ্টা বলেই মনে হয়। আশ্চর্যজনকভাবে সত্য যে মন্ত্রীর এমন বক্তব্য সরকার ও দল হিসেবে আওয়ামী লীগও ধারণ করতে শুরু করেছে।
মন্ত্রীদের কেউ, এমনকি খোদ প্রধানমন্ত্রীও তার বাস্তবতা বিবর্জিত, দায় এড়ানোর মানসিকতায় বলা বক্তব্যের বিরুদ্ধে কোন মন্তব্য করেন না। দেশের একের পর এক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হলেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদে তিনি আছেন বহাল তবিয়তে। ফলে ক্রমে দায় অস্বীকার তত্ত্বে বেপরোয়া হয়ে ওঠেছেন তিনি। এতে ক্ষতি হচ্ছে যতটা না সরকারের তারচেয়ে কয়েকগুণ বেশি দেশের। কারণ মন্ত্রীর বক্তব্যে যেখানে যেকোনো হত্যাকাণ্ড যেখানে গুরুত্ব পায় না, সেখানে খুনি ও খুনিচক্রের মধ্যে ভীতির সঞ্চার হবে কীভাবে?
প্রতি হত্যাকাণ্ডের বিপরীতে বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন প্রতিক্রিয়া ও নির্লিপ্তভাব পূর্বেকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের মনে করিয়ে দেয়। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুতফুজ্জামান বাবরের মন্ত্রিত্ব দেশবাসীর কাছে এক কাল অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। সন্ত্রাস, খুন আর অরাজকতাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে মদদ দেওয়ার যে বাজে নজির তিনি স্থাপন করেছিলেন সেটা দেশ তত তাড়াতাড়ি ভুলতে পারবে ততই মঙ্গল। এর আগে আলতাফ হোসেন চৌধুরী “আল্লাহর মাল আল্লাহ নিয়ে গেছে” এমন অর্বাচীন মন্তব্য করে সমালোচিত হয়েছিলেন।
মহিউদ্দিন খান আলমগীর, সাহারা খাতুন কিংবা তারও আগের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের কার্যকাল মোটেও সুবিধার ছিল না। এর প্রমাণ ক্ষমতায় থাকাকালীন যে পুলিশ ব্যবহার করে অন্যদের পিটিয়েছিলেন, ধরাকে সরাজ্ঞান করেছিলেন; ক্ষমতা হারানোর পর সে পুলিশ কর্তৃক লাটির বাড়ি খেয়েছিলেন। বর্তমানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রত্যেক হত্যাকাণ্ডের পর পরই যে মন্তব্য করেন তাতে করে পুলিশ প্রশাসনকে নির্ভার করে দিচ্ছে। ফলে অপরাধীদের গ্রেপ্তার উদ্যোগ কিংবা অপরাধের উৎস খুঁজে বের করার প্রত্যাশিত পদক্ষেপ অযাচিতভাবে থমকে যায়।
সরকার যেখানে হত্যাকাণ্ডের মত ঘটনাকে গুরুত্ব দিতে আগ্রহী না, সেখানে পুলিশ প্রশাসন গুরুত্ব দেবে সেটা ভাবার কারণ নেই। আর তার ওপর যদি ধর্মীয় সন্ত্রাসীদের পক্ষ থেকে “দায় স্বীকার”-এর বার্তা আসে সেক্ষেত্রে ঘটনাটিকে পুরো দেশ এবং আন্তর্জাতিক সমস্যা হিসেবে নিরুপণের একটা মানসিকতা গড়ে ওঠেছে। একটা সময়ে আলোচিত যেকোনো হত্যাকাণ্ডে পুলিশ প্রশাসন নিজেদের ব্যর্থতা ভাবত।
সরকার ভাবত বড় সমস্যা হিসেবে। কিন্তু এখন দায় অস্বীকারের প্রবণতা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠেছে। এ সরকারের আমলে প্রথমদিকে ঘটা যেকোনো হত্যা, নাশকতার জন্যে সরকার প্রথম দিকে জামায়াত-শিবিরকে দায়ি করত। যুদ্ধাপরাধী এ সংগঠনটি অনেকক্ষেত্রে সেগুলোতে জড়িত থাকতও। এরপর গ্রেপ্তারি অভিযান চলত, এবং এক সময় সে সব অভিযান স্তিমিত হয়ে যায়। তখন জামায়াত-শিবিরকে দায়ি করা হতো ঠিক, কিন্তু গ্রেপ্তারি অভিযান জোরদার হতো না। ফলে জামায়াত-শিবিরের হাতে খুন হওয়া মানে বিচার না পাওয়ার অবস্থার মতো গিয়ে দাঁড়ায়!
এরপর এ দোষারোপ প্রক্রিয়ায় যুক্ত হলো বিএনপির নাম। আর সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াত-শিবির-বিএনপির জায়গায় ওঠে এসেছে উগ্র ধর্মীয় সন্ত্রাসীদের নাম, আর তাদের দায় স্বীকার বার্তা। এখন প্রতি হত্যাকাণ্ডের পর জনগণ থেকে শুরু করে প্রশাসন, সরকার, মিডিয়া সকলেরই অপেক্ষা থাকে কেউ দায় স্বীকার করল কিনা!
এ দায় স্বীকার বার্তাকে সরকার প্রকাশ্যে স্বীকার করছে না ঠিক, কিন্তু তাদের কর্মপদ্ধতি সে বার্তাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হচ্ছে; অন্তত “দায়মুক্তির” নিয়ামক হিসেবে। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ “বিচ্ছিন্ন ঘটনা” আর “সরকার দায় নিতে পারবে না” এমন মন্তব্যের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা পাওয়া অস্বীকারতত্ত্ব!
সরকার দায় নেবে না, বিচ্ছিন্ন ঘটনা- সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন বক্তব্যের পর ধর্মীয় জঙ্গিগোষ্ঠী প্রতি ঘটনার দায় স্বীকার নিজেদের অস্তিত্বের প্রমাণ দিচ্ছে। তবু সরকার মানতে রাজি নয় দেশে জঙ্গি আছে। আর কখনও মানলেও সেটা হয় শর্তসাপেক্ষ- জঙ্গি আছে তবে আমাদের নিয়ন্ত্রণে। প্রশ্ন ওঠাটা তাই স্বাভাবিক- এ কেমন নিয়ন্ত্রণ যে মানুষ খুন করে পালিয়ে যায়, আর পালিয়ে যাওয়ার পর স্বগর্বে ঘোষণা দেয় আমরাই খুন করেছি?
দেশে জঙ্গির অস্তিত্ব অস্বীকার করলেও ধর্মীয় সন্ত্রাসীদের দায় স্বীকার বার্তা সরকারের জন্য পুলিশ প্রশাসনের জন্য দায়মুক্তির কবচ হয়ে দেখা দিয়েছে। ধর্মীয় সন্ত্রাসীদের হাতে সংঘটিত খুনের বিচার হবে না- এমন এক ধারণা বেড়ে ওঠছে সমাজে। এটা সামাজিক, রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলার পরিপন্থি হলেও দুঃখজনকভাবে সত্য যে সরকার একে গুরুত্ব দিতে আগ্রহি নয়। ফলে সমাজবিনাশী এ মত ক্রমে বিষবৃক্ষ হিসেবেই আবির্ভূত হচ্ছে। সমাজের আছে বিষবৃক্ষ হয়ে ওঠা এ মত অনেকটাই দায়মুক্তি দিচ্ছে অপরাধের!
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







