১৯৭১ সালে বাঙালির জাগরণের কবিতা লিখেছিলেন কবি মেহেরুন্নেসা। সাত কোটি বীর জনতার জেগে ওঠার দৃপ্ত প্রত্যয় ছিলো তাঁর ‘জনতা জেগেছে’ কবিতায়। সপ্ত আকাশে মেলতে চেয়েছিলেন লাল-সবুজের পতাকা।
লিখেই থামেননি বরং পাকিস্তানিদের দোসর আলবদর-অবাঙালি-বিহারী অধ্যুষিত তৎকালীন মিরপুরে বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়েছিলেন সাহসী এই কবি ।
১৯৪০ সালের ২০ অগাস্ট পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন মেহেরুন্নেসা। তাঁর ডাক নাম ছিলো রানু।
দেশকে ভালবাসাই কাল হয়েছিলো তাঁর। নরপশুদের নৃশংসতার শিকার হয়ে ৭১’এর ২৭ মার্চ শহীদ হয়েছিলেন মেহেরুন্নেসা।
নিজের ফেসবুকে স্ট্যাটাসে দেশের জন্য শহীদ এই নারী কবির জন্মদিনে তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে শহীদ বুদ্ধিজীবী সুরকার আলতাফ মাহমুদ-কন্যা শাওন মাহমুদ লিখেছেন,‘ বাবা ক্যান্সারে মারা গেলে পরিবারের অন্ন যোগাতে পত্রিকায় কপি লেখা আর প্রুফ দেখার কাজ শুরু করেছিলেন মেহেরুন্নেসা।
সেসময়ের প্রায় সব পত্রিকাতেই তাঁর কবিতা ছাপা হত। কিন্তু সংসারের অন্ন যোগাতে গিয়ে এক সময় সাহিত্য-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে চির চেনা মুখটির অনুপস্থিতি চলতে থাকে।
ছোটদুটি ভাইকে তো মানুষ করতে হবে। তাই নিজের সম্ভাবনা ভুলে পরিশ্রম করে গেলেন দিনরাত। এরই মাঝে “সাত কোটি জয় বাংলার বীর! ভয় করি নাকো কোন/ বেয়নেট আর বুলেটের ঝড় ঠেলে- চির বিজয়ের পতাকাকে দেবো, সপ্ত আকাশে মেলে/ আনো দেখি আনো সাত কোটি এই দাবীর মৃত্যু তুমি/ চির বিজয়ের অটল শপথ/ জয় এ বাংলায় তুমি….”
এই কবিতাটি জানান দেয় বিপ্লবের কথা। পাকি শাসক গোষ্ঠীর প্রতি ছুড়ে দেয়া এই চ্যালেঞ্জে ক্ষমতার ভীত কেঁপে উঠে।
তাই তো ২৭ মার্চ ১৯৭১ মিরপুরে প্রতিবেশী বিহারীরা তাঁকে ও তাঁর ছোট দুই ভাইকে বৃদ্ধা মায়ের সামনে ছুরি দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে।
লোকমুখে শোনা যায়, শহীদ কবি মেহেরুন্নেসার মাথা কেঁটে কাপড় শুকানোর দঁড়িতে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল।
১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চের ভয়াল কালো রাত্রিতে “অপারেশন সার্চলাইট”-এর নামে পাক বাহিনী বাঙ্গালিদের ওপর চালায় নির্মম গণহত্যা।
তার ঠিক দুইদিন পর, ২৭ মার্চে নির্মমভাবে জবাই করে দেহ থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে হত্যা করা হয় কবি মেহেরুন্নেসা, তাঁর মা ও দুই ভাইকে।
মেহেরুন্নেসার দুই ভাইয়ের মাথা নিয়ে ফুটবলের মতো খেলেছিল সেদিন ঘাতকেরা। মেহেরুন্নেসার কাটা মাথা তাঁরই লম্বা চুল দিয়ে ফ্যানের সাথে বেধে ঘুরানো হয়, আর নিচে পড়ে থাকে জবাই করা মুরগীর মতো রক্তাক্ত মেহেরুন্নেসার দেহটা।
মিরপুরের কসাই কাদের মোল্লার নেতৃত্বে তার দোসরদের সাথে পরিচালিত এই হত্যাকাণ্ড ছিল মানবতার ইতিহাসে অন্যতম এক কালো অধ্যায়।’






