ভারতের জিফ গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা সুভাষ চন্দ্রের বিরুদ্ধে স্বীকৃত ২২ হাজার ৬ কোটি ৫৭ লাখ রুপি ঋণের বিপরীতে মাত্র ৬ কোটি ৫০ লাখ রুপি পরিশোধের পরিকল্পনা অনুমোদন করেছে ভারতের ন্যাশনাল কোম্পানি ল অ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনাল (এনসিএলটি)। এতে ঋণদাতাদের প্রায় ৯৯ দশমিক ৯৭ শতাংশ ঋণ ছাড় দিতে হবে।
সহজ হিসাবে, প্রতি ১০০ রুপি পাওনার বিপরীতে ঋণদাতারা পাবেন মাত্র প্রায় ৩ পয়সা।
ভারতের অন্যতম আলোচিত ব্যক্তিগত দেউলিয়াত্বের মামলাগুলোর একটি সুভাষ চন্দ্রের এই মামলা। এনসিএলটির সিদ্ধান্তের পর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
আইনজীবী অভিষেক স্বরূপ বলেন, ৯৯ শতাংশের বেশি ঋণ ছাড়ের এমন একটি রেজল্যুশন পরিকল্পনাকে বাণিজ্যিক প্রজ্ঞা বলা যায় না। তার মতে, বাণিজ্যিক প্রজ্ঞার ভিত্তিতে নেওয়া সিদ্ধান্তের অন্তত কিছুটা বাণিজ্যিক যুক্তি থাকা প্রয়োজন।
কেন ৬.৫ কোটি রুপি পরিশোধের পরিকল্পনা অনুমোদন
এনসিএলটির দুই সদস্যের মধ্যে মতবিরোধের পর মামলাটি তৃতীয় সদস্য নীলেশ শর্মার কাছে যায়। এনসিএলটি প্রেসিডেন্ট তাকে এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়ার দায়িত্ব দেন। পরে শর্মা ইনসলভেন্সি অ্যান্ড ব্যাংকরাপ্সি কোডের (আইবিসি) ১১৪ ধারার আওতায় পরিশোধ পরিকল্পনাটি অনুমোদন করেন।
বেশ কয়েকজন ঋণদাতা এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করেন। তাদের মধ্যে এলআইসি হাউজিং ফাইন্যান্স জানায়, তাদের স্বীকৃত পাওনা প্রায় ১ হাজার ৩২২ কোটি ৩৯ লাখ রুপি হলেও প্রস্তাবিত পরিশোধের পরিমাণ মাত্র প্রায় ৩৮ লাখ রুপি।
তবে পরিকল্পনার বিরোধিতাকারী ঋণদাতাদের সম্মিলিত ভোটিং ক্ষমতা ছিল ২০ শতাংশেরও কম। অন্যদিকে পরিকল্পনাটির পক্ষে থাকা ঋণদাতাদের ভোটিং ক্ষমতা ছিল ৮০ দশমিক ৮১ শতাংশ। এ কারণে ট্রাইব্যুনাল মনে করেছে, সংখ্যাগরিষ্ঠ ঋণদাতাদের বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তের জায়গায় নিজেদের মূল্যায়ন বসিয়ে দেওয়া তাদের কাজ নয়।
বাকি ২২ হাজার কোটি রুপির কী হবে?
এনসিএলটির অনুমোদনের অর্থ এই নয় যে বাকি প্রায় ২২ হাজার কোটি রুপি পরবর্তী সময়ে একই পরিকল্পনার আওতায় পরিশোধ করা হবে। বরং ইনসলভেন্সি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ঋণদাতারা কতটা অর্থ ফেরত পাবেন, এই পরিকল্পনা কার্যত সেটিই নির্ধারণ করছে।
ট্রাইব্যুনাল জানিয়েছে, সুভাষ চন্দ্রের ব্যক্তিগত সম্পদের মূল্যায়নে দেখা গেছে, তার সম্পদের মূল্য প্রস্তাবিত পরিশোধের অর্থের তুলনাতেও যথেষ্ট কম।
এ ছাড়া পরিকল্পনাটি ব্যর্থ হলে কী হতে পারে, সেটিও বিবেচনায় নিয়েছে এনসিএলটি। চন্দ্রকে দেউলিয়া ঘোষণা করা হলে তার আর্থিক সম্পদ থেকে ঋণদাতারা আরও কম অর্থ পেতে পারেন বলে ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণ।
অর্থাৎ, প্রশ্নটি শুধু ২২ হাজার কোটি রুপির তুলনায় ৬.৫ কোটি রুপি কতটা কম, তা নিয়ে ছিল না। পরিকল্পনাটি বাতিল করলে ঋণদাতারা আদৌ আরও বেশি অর্থ ফেরত পাবেন কি না, সেটিও বিবেচনা করা হয়েছে।
যেভাবে শুরু হয়েছিল মামলা
সুভাষ চন্দ্রের ব্যক্তিগত ইনসলভেন্সি মামলার সূত্রপাত বিবেক ইনফ্রাকনের নেওয়া একটি ঋণ থেকে। প্রতিষ্ঠানটির ১৭০ কোটি রুপির ঋণের ব্যক্তিগত গ্যারান্টার ছিলেন চন্দ্র। ঋণটি অনাদায়ী হওয়ার পর ইন্ডিয়াবুলস হাউজিং ফাইন্যান্স তার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেয়। ২০২২ সালে ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানটি চন্দ্রের বিরুদ্ধে ইনসলভেন্সি মামলা করে। পরে ২০২৪ সালের এপ্রিলে এনসিএলটি তার বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত ইনসলভেন্সি কার্যক্রম গ্রহণ করে।
এদিকে ২০২৪ সালে ইন্ডিয়াবুলস হাউজিং ফাইন্যান্সের নাম পরিবর্তন করে সাম্মান ক্যাপিটাল করা হয়। এর আগে বিষয়টি মীমাংসার একটি উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি।
২০২৩ সালের নভেম্বরে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট আইবিসির সংশ্লিষ্ট বিধানগুলোর বৈধতা বহাল রাখার পর ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইনসলভেন্সি কার্যক্রম আবার শুরু হয়। ঋণদাতাদের স্বীকৃত মোট পাওনা ছিল ২২ হাজার ৬ কোটি ৫৭ লাখ রুপি। বিপরীতে পরিশোধ পরিকল্পনায় রাখা হয় মাত্র ৬.৫ কোটি রুপি।
এলআইসি হাউজিং ফাইন্যান্স এনসিএলটির আদেশ অনুযায়ী প্রস্তাবটিকে ‘অকার্যকর ও বেআইনি’ বলে আপত্তি জানিয়েছিল। তাদের দাবি ছিল, ১ হাজার ৩২২ কোটি রুপির বেশি পাওনার বিপরীতে মাত্র প্রায় ৩৮ লাখ রুপি পাওয়া কার্যত নগণ্য।তবে পরিকল্পনার পক্ষে থাকা ঋণদাতাদের স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় ট্রাইব্যুনাল সেটি অনুমোদন করেছে।
এনসিএলটির সিদ্ধান্তের গুরুত্ব
এই রায়ে এনসিএলটি স্পষ্ট করেছে, ঋণদাতাদের জন্য কোন পরিমাণ অর্থ বাণিজ্যিকভাবে সবচেয়ে ভালো হবে, সেটি নির্ধারণ করা ট্রাইব্যুনালের কাজ নয়। তাদের ভূমিকা মূলত তদারকিমূলক।
আইনি কাঠামোর মধ্যে থেকে ঋণদাতারা সিদ্ধান্ত নিলে এনসিএলটি সাধারণত তাদের বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তের জায়গায় নিজেদের বিচারবুদ্ধি বসাতে পারে না। অনুমোদনের পর পরিকল্পনাটি ইনসলভেন্সি প্রক্রিয়ার আওতাভুক্ত সব ঋণদাতার জন্য প্রযোজ্য হবে, এমনকি যারা এর বিরোধিতা করেছিলেন তাদের ক্ষেত্রেও। এখন মামলাটি মূল দুই সদস্যের বেঞ্চে ফেরত যাবে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে আনুষ্ঠানিক আদেশ জারি করার কথা রয়েছে।
সুভাষ চন্দ্রের জন্য এই অনুমোদন ব্যক্তিগত ইনসলভেন্সি প্রক্রিয়ায় বড় অগ্রগতি হলেও ঋণদাতাদের জন্য চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। ২২ হাজার ৬ কোটি ৫৭ লাখ রুপি পাওনার বিপরীতে তারা পাবেন মাত্র ৬.৫ কোটি রুপি, অর্থাৎ প্রতি ১০০ রুপি পাওনার বিপরীতে প্রায় ৩ পয়সা।









